প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০২৩ ১৪:৩৩ পিএম
আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২৩ ২০:১৫ পিএম
চায়না দুয়ারি জালে মাছ শিকার করছেন এক জেলে। ছবি : সংগৃহীত
দেশের মৎস্যসম্পদের জন্য মারাত্মক হুমকি চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার বেড়েই চলেছে। একসময় পদ্মা নদীতে এই জাল ব্যবহার শুরু হলেও এখন বিস্তৃত হয়ে পড়ছে ছোট-বড় সব জলাশয়ে। স্থানীয় প্রশাসন অবৈধ এই জালের বিরুদ্ধে মাঝেমধ্যে অভিযানে নামলেও তা পুরোপুরি বন্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই। এভাবে চলতে থাকলে একসময় বিলুপ্ত হয়ে যাবে দেশীয় মাছ ও অন্যান্য জলজপ্রাণী। চায়না দুয়ারি একবার ব্যবহারে যে পরিমাণ মাছ ধরা যায়, তা অন্য জাল একাধিকবার ব্যবহারেও পাওয়া যায় না। তাই জেলেরা এই জাল ব্যবহারে অনেক খুশি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটিকে জাল বলা হলেও মূলত এটি মাছ ধরা এবং আগামী প্রজন্মের জন্য মৎস্যসম্পদ ধ্বংস করার জন্য একটা বিশেষ ফাঁদ। এই জালের বুননে একটা গিঁট থেকে আরেকটি গিঁটের দূরত্ব খুব কম। যার কারণে এর ভেতরে একবার মাছ ঢুকলে আর বের হতে পারে না। স্থানভেদে এই জালকে চায়না দুয়ারি ও ম্যাজিক জাল বলা হয়।
পাবনা (সাঁথিয়া), গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) ও বাকেরগঞ্জ (বরিশাল) প্রতিবেদকের পাঠানো প্রতিবেদনে :
বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাসির উদ্দীন বলেছেন, এই চায়না দুয়ারি জাল দেশের মৎস্যসম্পদ ধ্বংসের অন্যতম কারণ। নিষিদ্ধ জালের তালিকায় চায়না দুয়ারির নাম না থাকলেও জালের বুননের কারণে এই জাল মারাত্মক হুমকি। তিনি বলেন, বাংলাদেশে মাছ ধরার মেস সাইজ একটা গিঁট থেকে আরেকটি গিঁটের দূরত্ব সাড়ে চার সেন্টিমিটার। এর চেয়ে কম দূরত্ব হলে সেটা দেশের প্রচলিত আইনে অবৈধ বা নিষিদ্ধ। যে কারণে আমাদের দেশে কারেন্ট জালের ব্যবহার নিষিদ্ধ, একই কারণে চায়না দুয়ারিও নিষিদ্ধ।
সাম্প্রতিক বর্ষা মৌসুমে দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলের উন্মুক্ত জলাশয়, বিল ও খালে এই জালের ব্যবহার বেড়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার বন্ধ করা না হলে মাছের বিপন্ন প্রজাতিসহ সব ধরনের জলজপ্রাণী হুমকির মুখে পড়বে। মৎস্যসম্পদ রক্ষায় প্রশাসনসহ সবাইকে এই জাল বন্ধে জোরালো পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন তারা।
এদিকে পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার খাল-বিল, নদী-নালায় বর্ষার নতুন পানিতে ঝাঁকে ঝাঁকে ঘুরে বেড়াচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছের পোনা। কিছুদিনের মধ্যেই এই পোনা বড় হবে। এরই মধ্যে উপজেলাজুড়ে একশ্রেণির অসাধু মৎস্য শিকারি বেড়জাল, চায়না দুয়ারি ও ঠেলাজাল দিয়ে অবাধে ডিমওয়ালা মাছসহ নিধন করছে মাছের পোনা। এভাবে পোনা ও ডিমওয়ালা মাছ নিধনের কারণে সারা দেশেই কমে যাচ্ছে দেশীয় মাছের উৎপাদন। স্থানীয় মৎস্যজীবী ও মৎস্য কর্মকর্তাদের দাবি, চায়না দুয়ারি জাল দিয়ে পাঁচ বছর ধরে অবাধে ডিমসহ পোনা শিকার করায় দেশি মাছ কমে গেছে।

সরেজমিন উপজেলার সোনাতলা, ফেচুয়ান, হাড়িয়া, পাটগাড়ি, খিদিরগ্রাম, ভিটাপাড়া, সাতআনিরচর, গৌরিগামসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, অবাধে পেশাদার ও মৌসুমি জেলেরা নিধন করছেন দেশীয় মাছের পোনা ও ডিমওয়ালা মাছ। সিনিয়র সাংবাদিক এম রুহুল আমিন বলেন, আগে দেশীয় মাছ যেমনÑ চিংড়ি, পুঁটি, শোল, বাইম, টাকি, শিং, মাগুর, ট্যাংরাসহ ভরপুর ছিল আমাদের এলাকার খাল-বিল ও নদ-নদীগুলোতে। বর্তমানে তা আগের মতো নেই। হয়তো দু-চার বছরের ভেতরে এগুলোও বিলুপ্ত হয়ে যাবে। দেশীয় মাছের চাহিদা পূরণে বিভিন্ন হ্যাচারিতে বা প্রজেক্টে এখন এই মাছগুলো চাষ হচ্ছে। কিন্তু সেই স্বাদ আর নেই। আছে নামে শুধু দেশীয় মাছ। ইদানীং দেশীয় মাছ ধ্বংস করতে এসেছে চায়না দুয়ারি জাল।
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলায় পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি, হ্রাস ও মাছের প্রজনন মৌসুমে ডিমওয়ালা চিংড়ি, পুঁটি, ট্যাংরা, কৈ, শিং, বেলে, বোয়াল, শোল, টাকিসহ দেশি প্রজাতির সব মাছ চায়না দুয়ারি দিয়ে নিধন হচ্ছে। এতে ক্রমেই মাছশূন্য হয়ে পড়ছে নদ-নদী ও খাল-বিল। স্থানীয়রা বলছেন, নদীতে চায়না জাল বন্ধে মৎস্য বিভাগ ও নৌপুলিশের কোনো তৎপরতা দেখিনি। প্রকাশ্যেই অনেকে চায়না দুয়ারি দিয়েই মাছ ধরছেন। দৌলতদিয়া নতুনপাড়ার বাসিন্দা হোসেন আলী জানান, দুপুর হলেই ছোট ছোট ডিঙিতে করে এই চায়না দুয়ারি নদীতে ফেলা হয়। সারা রাত নদীতে রাখার পর সকালে তুলে আনা হয় পাড়ে। এ সময় জালে ধরা পড়ে দেশীয় প্রজাতির বিলুপ্তপ্রায় সব মাছ, নদীতে থাকা জলজপ্রাণী এমনকি ছেঁকে ওঠে মাছের ডিমও। এ জাল দিয়ে মাছ ধরলে কিছুদিন পর হয়তো নদীতে আর কোনো মাছ পাওয়াই যাবে না।
করম আলী নামে এক জেলে বলেন, আগে কারেন্ট জাল ব্যবহার করলেও চায়না দুয়ারি আসার পর সেটি বাদ দিয়েছি। কারণ কারেন্ট জাল দিয়ে মাছ ধরলে প্রশাসন উৎপাত করে। এ ছাড়া কারেন্ট জালের চেয়ে চায়না দুয়ারিতে মাছ বেশি পাওয়া যায়। ৫০ হাজার টাকা খরচ করে ৮টি চায়না দুয়ারি কিনেছি। তিনি আরও জানান, পেশায় জেলে নয়, এমন মানুষও চায়না দুয়ারি দিয়ে মাছ ধরছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জেলে বলেন, ‘চায়না দুয়ারি দিয়ে মাছ ধরা ঠিক না, তারপরও জীবিকার তাগিদে মাছ ধরছি।’
গোয়ালন্দ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা রাজবাড়ী সদর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোস্তফা আল রাজীব বলেন, ‘চায়না দুয়ারি বন্ধে মৎস্য আইনে নিয়ম অনুযায়ী যদি কেউ ক্রয়-বিক্রি করে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, অনাদায়ে ৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। চায়না দুয়ারি ব্যবহারের ফলে দেশীয় প্রজাতির মাছ আজ বিলুপ্তির পথে। আমরা যদি সবাই সচেতন না হই, তাহলে চায়না দুয়ারি ব্যবহার বন্ধ হবে না এবং আমাদের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। তিনি বলেন, উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা মৎস্য বিভাগ থেকে চায়না দুয়ারি বন্ধে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে। এ ছাড়া সব ধরনের নিষিদ্ধ জালের বিরুদ্ধেও প্রচারণা চলমান রয়েছে।
পাবনার সাঁথিয়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা খাদেমুল ইসলাম বলেন, বর্ষাকালেই নতুন পানিতে দেশীয় মাছের প্রজনন মৌসুম। এ সময়ে অবৈধ কারেন্ট জাল ও চায়না দুয়ারি জাল দিয়ে পোনাসহ ডিমওয়ালা মাছ ধ্বংস করা হচ্ছে। মাছের পোনা ও ডিমওয়ালা মাছ রক্ষার্থে এবং উৎপাদন বৃদ্ধিতে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে। এখন আমাদের জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ চলছে। এ সপ্তাহ পর থেকে আমাদের অবস্থান আরও কঠোর হবে।