সাতকানিয়া থানায় ‘গায়েবি’ মামলা
এস এম রানা, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ২৬ জুলাই ২০২৩ ১৪:৫৩ পিএম
আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২৩ ১৪:৫৭ পিএম
রিফাত কবির।
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া থানার মধ্যম কাঞ্চনা গ্রামের দফাদার বাড়ির বাসিন্দা রিফাত কবির গত ১৫ মে থেকে কারাগারে রয়েছেন। ঢাকার পল্লবী থানার একটি মামলায় কারাবন্দি রিফাতকে সাতকানিয়ার কাঞ্চনা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সময় মারামারির ঘটনায় দায়ের করা অপর একটি মামলায় ১ জুন গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
১৬ মামলার আসামি রিফাত গত শনিবার রাতে ছিলেন চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে সাঙ্গু ওয়ার্ডে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে গত শনিবার রাতে সাতকানিয়া থানায় এক ছাত্রলীগ নেতার মোটরসাইকেল পোড়ানো এবং ককটেল বিস্ফোরণের মামলা হয়েছে।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, রিফাত কবির সাতকানিয়া থানার চারাবটতল নামক স্থানে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে শনিবার রাতে জামায়াতে ইসলামীর একটি মিছিলে যোগ দিয়েছেন। সেই মিছিল থেকে সরকারবিরোধী স্লোগান দিয়েছেন। এ সময় এক ছাত্রলীগ নেতার মোটরসাইকেল পুড়িয়েছেন এবং ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন।
গত শনিবার রাত ১১টা ৫ মিনিটে রুজু করা এই মামলায় রিফাত কবিরকে ১৫ নম্বর আসামি করা হয়েছে। মামলার এজাহারে রিফাত কবিরের বাবার নাম উল্লেখ করা হয়েছে নুরুল কবির। আসামি রিফাত কবির জামায়াত শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে তথ্য পাওয়া গেছে। ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে সাতকানিয়া থানায় তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ১৬টি। এসব মামলায় তিনি আগে কারাবাস করেছেন। পরে জামিনে মুক্ত হয়ে ঢাকায় গিয়ে ব্যবসা করছেন।
সর্বশেষ গত ২২ জুলাই রাতে দায়ের করা মামলাটিকে ‘গায়েবি’ বলে দাবি করেছেন সাতকানিয়া উপজেলা জামায়াতের আমির মো. কামাল মৌলভী। তিনি বলেন, ‘শনিবার রাতের অন্ধকারে নির্জন স্থানে জামায়াতে ইসলামীর কোনো কর্মসূচি থাকার প্রশ্নই ওঠে না। ঘটনার বিষয়ে আমরা কিছু জানি না। মামলার পর জেনেছি। এটি গায়েবি মামলা। এই মামলায় আমাদেরকে (জামায়াতের নেতাকর্মী) আসামি করা হয়েছে।’
রিফাত কবির ১৫ মে থেকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে হাজতবাসে থাকার তথ্য নিশ্চিত করেছেন তার বড় ভাই কাঞ্চনা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য মোহাম্মদ ফরহাদ। তিনি বলেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সময় কেন্দ্রে মারামারির ঘটনা ঘটেছিল। ওই সময় আমরা আহত হই। এরপরও আমাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। সেই মামলায় রিফাত এখন কারাবন্দি। এখন চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সাঙ্গু ওয়ার্ডে আছে। কিন্তু এখন শুনতে পাচ্ছি, কারাবন্দি রিফাতের বিরুদ্ধে আমাদের বাড়ি থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে ছদাহা এলাকার ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। সেই মামলায় রিফাতকে ১৫ নম্বর আসামি করা হয়েছে। হাজতবাসে থাকা আসামি কীভাবে মামলায় বর্ণিত ঘটনায় জড়িয়েছে, বুঝতে পারছি না। মামলার বাদী ও পুলিশই ভালো বলতে পারবেন।’
শনিবার রাতে করা মামলার বাদী ছদাহা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মোরশেদুল আলম। রাজনৈতিক পদ-পদবি না থাকলেও নিজকে ছাত্রলীগ নেতা বলে পরিচয় দেন তিনি। মামলার এজাহারে তিনি উল্লেখ করেছেন, ওইদিন রাত ৯টায় সাতকানিয়ার ছদাহা ইউনিয়নের চারাবটতল মোড় এলাকার চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে তিনি ব্যক্তিগত কাজে মোটরসাইকেলে মিঠাদীঘি থেকে কেরানীহাট যাচ্ছিলেন। পথে চারাবটতল এলাকায় পৌঁছলে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের একটি মিছিল মহাসড়কে ব্যারিকেট দেয়। এই সময় তারা সরকারবিরোধী স্লোগান দিয়ে সড়কে চলাচলরত গাড়ি ভাঙচুর করছিল। ঘটনাস্থলে বাদীকে চিনতে পেরে মারধর করে এবং পরে তার মোটরসাইকেলটিতে আগুন দেয়। এ সময় সড়কে ককটেল বিস্ফোরণ করে তারা পালিয়ে যায়।
পরে মোরশেদুল আলম নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মোটরসাইকেলের আগুন নেভায়। এ সময় পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে পোড়া মোটরসাইকেল, গাড়ির ভাঙা কাচ ও বিস্ফোরিত ককটেলের অংশবিশেষ আলামত হিসেবে হেফাজতে নেয় এবং মোরশেদুল আলমকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসার জন্য পাঠায়।
হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা গ্রহণ শেষে ঘটনার ২ ঘণ্টার মধ্যেই তিনি ২৬ জন আসামির নাম-ঠিকানা উল্লেখ এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৩০-৪০ জনকে আসামি করে সাতকানিয়া থানায় এজাহার দাখিল করেন। সেই মামলাটি এখন তদন্ত করছেন সাতকানিয়া থানার উপপদির্শক (এসআই) প্রবীণ দেব।
ঘটনার মাত্র ২ ঘণ্টার মধ্যে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে চিকিৎসা গ্রহণ, আসামিদের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ এবং কারাগারে বন্দিকে আসামি করার বিষয়ে জানতে চেয়ে মোরশেদুল আলমকে ফোন করা হয়। প্রশ্ন শুনে তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এরপর থেকে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
এজাহারে উল্লেখিত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চারাবটতল থেকে ২০০ মিটার উত্তরে হাসমতের দোকান নামক এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শনিবার রাত ৯টার সময় হাসমতের দোকানে কোনো মিছিল তারা দেখেননি। তবে সেখান থেকে কিছুটা দূরে চারাবটতল এলাকায় একটি মোটরসাইকেল পুড়ে গেছে বলে তারা শুনেছেন। এই ঘটনায় মামলা হয়েছে উল্লেখ করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘রবিবার ভোরে শুনলাম ছদাহার এক ব্যক্তির কাছ থেকে একটি অতি পুরোনো ও প্রায় অচল মোটরসাইকেল ১৩ হাজার টাকায় কিনে মহাসড়কে এনে পোড়ানো হয়েছে। এরপর নাকি মামলাও হয়েছে। বিষয়টি রাজনৈতিক। তাই নিরাপত্তার কথা ভেবে আপনাকে (প্রতিবেদক) তথ্য দিতে চাই না।’
মামলার এজাহারে বর্ণিত আসামিদের নাম-ঠিকানার বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আসামিরা সবাই জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। প্রধান আসামি মো. কামাল মৌলভী সাতকানিয়া উপজেলা জামায়াতের আমির। পুরো উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ ২৬ জনের নাম এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে আরও ৩০-৪০ জনকে।
মামলার প্রধান আসামি উপজেলা জামায়াতের আমির মো. কামাল মৌলভী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘পুরো সাতকানিয়ার কিছু মানুষকে মামলায় আসামি করা হয়েছে। বিষয়টি শুনেছি মামলার দায়েরের এক দিন পর। মামলার এজাহারে বর্ণিত ঘটনার সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই। ওই রাতে মহাসড়কে মিছিলের প্রশ্নই আসে না। এরপরও বাদী মোরশেদুল আলম কেন গায়েবি মামলা করল, বুঝতে পারছি না। শুনলাম ছদাহা এলাকার এক ব্যক্তির কাছ থেকে মোটরসাইকেলটি অল্প টাকায় কেনা হয়েছিল।’
‘গায়েবি’ মামলার আসামি রিফাত কবিরকে আজ বুধবার চট্টগ্রামের জননিরাপত্তা আদালতে হাজির করার তথ্য রয়েছে উল্লেখ করে রিফাতের আইনজীবী এইচএম সাকিব প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘রিফাত ১৫ মে ঢাকার পল্লবী থানার একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান। পরে অন্য মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। তার বিরুদ্ধে ১৫-১৬টি মামলা আছে। এর মধ্যে বুধবার চট্টগ্রামের জননিরাপত্তা আদালতে রিফাতকে হাজির করার কথা রয়েছে।’ রিফাতের বিরুদ্ধে নতুন একটি মামলা রুজু হওয়ার তথ্য শুনেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘নতুন মামলার তথ্য রিফাত কবিরের বড় ভাইয়ের কাছে শুনেছি।’
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রবীণ দেব প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বাদী আসামিদের নাম-ঠিকানা উল্লেখ করে থানায় মামলা করেছেন। সেই মামলাটি তদন্তের জন্য আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্ত পর্যায়ে যদি দেখি আসামি রিফাত কবির কারাগারে এবং তিনি ঘটনার সঙ্গে যুক্ত নন, তাহলে অভিযোগপত্র থেকে তার নাম বাদ যাবে।’