কুড়িগ্রাম প্রতিবেক
প্রকাশ : ২৪ জুলাই ২০২৩ ২২:০২ পিএম
আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৩ ২২:১৭ পিএম
কুড়িগ্রামে পানি কমলেও অনেক চরে এখনও পানিবন্দি মানুষ। প্রবা ফটো
কুড়িগ্রামে তৃতীয় দফা বন্যার পর ছড়িয়ে পড়েছে পানিবাহিত রোগব্যাধি। মানুষের পাশাপাশি আক্রান্ত হচ্ছে গবাদিপশু। বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না উঠতে রোগব্যাধি নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছে বন্যাকবলিত এলাকার মানুষজন। বিশেষ করে, জেলার চার শতাধিক চরাঞ্চলে কাদাপানির কারণে দুর্ভোগের মাত্রা বেড়েছে কয়েকগুণ। কুড়িগ্রাম সিভিল সার্জনের কার্যালয় থেকে আপদকালীন সময়ে ৮৩টি মেডিকেল টিম মাঠ পর্যায়ে থাকার কথা থাকলেও চরাঞ্চলের স্বাস্থ্য বিভাগের কোনো কর্মীরা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ্ আল মামুন বলেন, ’গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্রের পানি নুন খাওয়া পয়েন্টে ১২৭ সেন্টিমিটার, ধরলা পানি সেতু পয়েন্টে ১৭১ সেন্টিমিটার, দুধকুমার নদের পানি পাটেশ্বরী পয়েন্টে ১৬৪ সেন্টিমিটার ও তিস্তা নদীর পানি কাউনিয়া পয়েন্ট বিপদসীমার ৮৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে তিস্তার চরাঞ্চল ছাড়া অন্যান্য নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা নেই।’
সোমবার (২৪ জুলাই) সরেজমিনে দেখা গেছে, ব্রহ্মপুত্রের মুসার চর, মশালের চর, বতুয়াতলি, কালির আলগা ও পোরার চরে পানি নামলেও ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে বন্যাকবলিত এলাকায় দেখা দিয়েছে ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব।
কুড়িগ্রাম স্বাস্থ্য বিভাগ জানায়, এক সপ্তাহে কুড়িগ্রামের ৯টি উপজেলায় ৪০৪ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। এ ছাড়া দুই শতাধিক চর্ম ও অন্য রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। বন্যাকবলিত মানুষের জন্য ৮৩টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ওষুধ বিতরণ করা হচ্ছে। খাবার, শিশু ও গো-খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির চরম সংকটে ভুগছেন বানভাসি লোকজন।
জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় থেকে চরাঞ্চলগুলোতে কৃমিনাশক ওষুধ ও ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে। সরকারের যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ত্রাণ বিতরণের অব্যবস্থাপনার চিত্র কুড়িগ্রামজুড়ে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইদুল আরীফ জানান, অব্যবস্থাপনা দূর করতে জনপ্রতিনিধিদের ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে নজরদারি করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কুড়িগ্রাম স্বাস্থ্য বিভাগের লোকজন এসব গ্রামে চিকিৎসা দিতে আসেননি। খোঁজখবরও নেননি। তবে কুড়িগ্রাম সিভিল সার্জন অফিস এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলেছেন।
কালির আলগার বাসিন্দা রমিচা বেগম বলেন, ’এক মাস পানিবন্দি থাকার কারণে হাত-পায়ে ফোসকা পড়েছে। সব সময় কাদাপানিতে থাকার কারণে এমন অবস্থার তৈরি হয়েছে মনে হচ্ছে।’
উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের মশালের চর গ্রামের সুফিয়া বেগম বলেন, ’গত এক মাস নৌকাতে রান্না, খাওয়া সবই করতে হচ্ছে। প্রয়োজনীয় কাজগুলো কাদা ও ময়লাপানিতে নেমে করতে হচ্ছে। ফলে হাত-পা সাদা হয়ে গেছে এবং চুলকায়।’
মুসার চর গ্রামের মতিয়ার রহমান বলেন, ’গ্রামের প্রতিটি টিউবওয়েল তলিয়ে আছে। বিশুদ্ধ পানি বহুদূর থেকে আনতে হয়। তবে সারা দিন বাচ্চারা পানিতে থাকার কারণে ডায়রিয়া দেখা দিয়েছে।‘
উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের ইউপি সদস্য মোন্নাফ আলী বলেন, ’পানিবন্দি চরগুলোতে স্বাস্থ্য বিভাগের কোনো কর্মী যায় না। আমার ৯ নং ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকায় ডায়রিয়া রোগ দেখা দেওয়ায় নিজের পকেটের টাকা খরচ করে স্যালাইন ও ওষুধ কিনে দিয়েছি।’
এ ব্যাপারে জেলা সিভিল সার্জন মঞ্জুর এ মোর্শেদ বলেন, ‘বন্যা শুরু হওয়ার পর থেকে ৮৩টি মেডিকেল টিম বানভাসিদের চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে। প্রতিটি টিমে তিনজন করে স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন। চলতি বন্যায় ৫০ হাজার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ও ১০ হাজার খাবার স্যালাইন বিতরণের জন্য ইউনিয়ন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। চরের মানুষের অভিযোগ একটু বেশি। পানিবন্দি এলাকার লোকজন চাইলে সপ্তাহে তিন দিন ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে পারেন। তা ছাড়া ডায়রিয়ার প্রার্দুভাব দেখছি না।‘