× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সাংবাদিক নাদিম খুন

অস্ত্রধারী রিফাতের আশ্রয়দাতা কারা

নাঈম ইসলাম, শেরপুর

প্রকাশ : ২০ জুলাই ২০২৩ ১১:৪০ এএম

আপডেট : ২০ জুলাই ২০২৩ ১১:৪৩ এএম

ফাহিম ফয়সাল রিফাত।

ফাহিম ফয়সাল রিফাত।

জামালপুরের সাংবাদিক নাদিম হত্যাকাণ্ডের এক মাস পেরিয়ে গেছে। এখনও অধরা হত্যা মামলার অন্যতম আসামি বকশীগঞ্জ উপজেলার সাধুরপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) বহিষ্কৃত চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল আলম বাবুর ছেলে ফাহিম ফয়সাল রিফাত। রিফাত কোনো হদিস নেই।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া তার সেই বহুল আলোচিত অস্ত্রটিরও খোঁজ মেলেনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখনও তাকে গ্রেপ্তার করতে না পারায় ক্ষোভ নিহত সাংবাদিকের পরিবারের। নাদিম হত্যা মামলার ২ নম্বর আসামি রিফাত। 

এ ছাড়া মামলার প্রধান আসামি বহিষ্কৃত ইউপি চেয়ারম্যান মাহমুদুল আলম বাবু গ্রেপ্তার হলেও ধরা পড়েননি মামলার এজাহারভুক্ত আরও ১৭ আসামি। এসব কারণে প্রশ্ন উঠেছে তাদের আশ্রয় ও প্রশ্রয়দাতা কারা? আর কোথায়ই বা তাদের শক্তির উৎস!

১৮ জুলাই বিকালে অস্ত্রধারী রিফাতের আশ্রয়দাতাদের ব্যাপারে প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে কথা বলেন সাংবাদিক নাদিমের অনার্সপড়ুয়া মেয়ে রাব্বিলাতুল জান্নাত।

তিনি বলেন, ‘আমার বাবার হত্যাকাণ্ডে সাধুরপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা মাহমুদুল আলম বাবু ও তার ছেলে রিফাত সরাসরি জড়িত ছিল। তাদের নেতৃত্বেই আমার বাবা খুন হন। এ ঘটনার পেছনে আরও মাস্টারমাইন্ড রয়েছে। বাবার মাথায় সন্ত্রাসী রিফাত ইট দিয়ে আঘাত করে। সে বন্দুক নিয়ে চলাফেরা করত, যার ছবি ফেসবুকে ছড়িয়েছে।’

রিফাতের আশ্রয়দাতা কারা- এ প্রসঙ্গে জান্নাত বলেন, ‘আমার আব্বুর হত্যাকারী বাবু চেয়ারম্যান (বহিষ্কৃত) পুলিশের সাবেক আইজিপি মোখলেছুর রহমান পান্নার চাচাতো ভাই এবং এএসপি দিপু হলো খুনি বাবুর ভাগিনা। পুলিশের বড় কর্মকর্তা হওয়ায় বাবুর ছেলে ফাহিম ফয়সাল রিফাতকে মামলা থেকে বাঁচানোর জন্য তারা আপ্রাণ চেষ্টা করছে। তাদের ছত্রছায়ায় আছে ফাহিম এবং তারাই যাবতীয় সাহায্য করছে। আইনের লোক হয়ে এ রকম বেআইনি কাজ কীভাবে করতেছে, প্রশ্ন আমার।’

উদ্বেগ প্রকাশ করে জান্নাত বলেন, ‘তাদের (ফাহিমদের) বড় বড় আত্মীয় আছে, সে কারণে তারা পার পেয়ে যাবে- এটা যেন না হয়। ফাহিমকে যারাই আশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই।’ রিফাতের সেই অস্ত্রের কোনো তথ্য উদঘাটন না হওয়ায় হতাশা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সে গ্রেপ্তার না হওয়ায় আমরা আতঙ্কে আছি।’

আশ্রয়দাতাদের ব্যাপারে জান্নাত সামাজিক যোযোগমাধ্যম ফেসবুকে ১৬ জুলাই একটি পোস্ট দেন নিজের টাইমলাইনে। 

চেয়ারম্যান মাহমুদুল আলম বাবুর চাচাতো ভাই মোখলেছুর রহমান পান্না অতিরিক্ত আইজিপি ছিলেন। এ ছাড়া বাবুর বড় বোনের ছেলে রেজুয়ান দিপু সহকারী পুলিশ সুপার। বাবু চেয়ারম্যানের ছেলে পলাতক আসামি রিফাতের সঙ্গে তার একাধিক ছবিও রয়েছে।

 সাংবাদিক নাদিম হত্যা মামলার প্রধান আসামি বহিষ্কৃত ইউপি চেয়ারম্যান বাবুর ছেলে ফাহিমসহ এখনও অধরা এজাহারভুক্ত ১৭ আসামি। এক মাস পেরিয়ে গেলেও এজাহারভুক্ত ১৭ আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন নানা মহলে। এদিকে চেয়ারম্যান বাবুর ছেলে ফাহিম ফয়সাল রিফাতের সেই অস্ত্রের কোনো হদিস বের না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে নাদিমের পরিবার ও বিভিন্ন সচেতন মহল। অথচ অস্ত্রের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়।

১৭ জুন সাংবাদিক নাদিম হত্যার ঘটনায় ২২ জনের নামে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করে মামলা করেন তার স্ত্রী মনিরা বেগম। নাদিমের ওপর হামলার ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ দেখে পুলিশ প্রথমে ৯ জনকে আটক করে। মামলা হওয়ার আগেই পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ থেকে প্রধান আসামি মাহমুদুল আলম বাবু চেয়ারম্যানসহ তিনজনকে আটক করে র‌্যাব। ওই দিন বিকালে বগুড়া থেকে আরও একজনকে র‌্যাব আটক করে। এ পর্যন্ত সব মিলিয়ে প্রধান আসামিসহ ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের সবাইকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ড শেষে আসামিদের জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার কথা স্বীকার করে প্রধান আসামি মাহমুদুল আলম বাবু চেয়ারম্যান, রেজাউল করিম ও মো. মনিরুজ্জামান ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

হত্যাকাণ্ডের এক মাস পার হলেও এজাহারভুক্ত ১৭ আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় ক্ষুব্ধ নিহত নাদিমের পরিবার, সাংবাদিক সমাজ ও সচেতন মহল।

সাংবাদিক নাদিম হত্যা মামলায় এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে প্রধান আসামি বাবুর ছেলে রিফাত, সহযোগী শামিম খন্দকার, রুবেল মিয়া, রাকিবিল্লাহ্, লিপন মিয়াসহ এজাহারভুক্ত আরও ১৭ আসামি। এজাহারভুক্ত প্রধান আসামি বাবুসহ ৪ জনকে র‌্যাব গ্রেপ্তার করেছে, মাত্র ১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। 

যা বলছেন নাদিমের স্ত্রী ও শ্বশুর

নিহত সাংবাদিক নাদিমের স্ত্রী মনিরা বেগম বলেন ‘পুলিশের ভুমিকা রহস্যজনক। পুলিশ এজাহারভুক্ত আর কোনো আসামিকে ধরছে না। এদিকে মামলার প্রধান আসামি জামিনের জন্য বারবার আবেদন করছেন। তিনি যদি জামিনে মুক্ত হন, তাহলে আর আমাদের রক্ষা নেই। আমরা খুব আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। র‌্যাব পঞ্চগড় থেকে কয়েকজন আসামিকে ধরেছে, এরপর আর কোনো আসামিকে ধরতে পারে নাই পুলিশ। পুলিশ বলছে, তারা নাকি চেষ্টা করছে। তাদের এই চেষ্টা নিয়েও প্রশ্ন আছে। মামলা হওয়ার এক মাস অতিবাহিত হলেও নতুন করে এজাহারভুক্ত একজন আসামিকেও ধরতে পারেনি পুলিশ। বিষয়টি সন্দেহজনক। বাকি আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হোক। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে এটা আমার অনুরোধ।’

এদিকে ঘটনাস্থলের কাছেই নাদিম হত্যা মামলার তৃতীয় আসামি রাকিবিল্লাহ রাকিবের বাড়ি। হামলায় রাকিবিল্লাহর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল- দাবি নাদিমের স্বজনদের। রাকিবিল্লাহ একজন যুদ্ধাপরাধীর ছেলে, তার হাতে সাংবাদিক খুনের ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধারা। পলাতক রাকিবিল্লাহকে দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি তাদের। এ ব্যাপারে সাংবাদিক নাদিমের শ্বশুর বীর মুক্তিযোদ্ধা মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, “আসামি রাকিবিল্লাহ রাকিব একজন যুদ্ধাপরাধীর ছেলে। তার বাবা ‘ননী’ আলবদর ছিলেন। একজন আলবদরের ছেলে সাংবাদিককে মারার সাহস পায় কীভাবে। এখনও তারা ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাদের ধরা হচ্ছে না। আমি বাবুর ছেলে ফয়সাল, সহকারী রাকিবসহ দোষী ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের দাবি জানাচ্ছি।”

যা বলছেন সাংবাদিক নেতারা

বকশীগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সভাপতি শাহিন আল আমিন বলেন, ‘এজাহারভুক্ত ১৭ আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় আমরা অনশন কর্মসূচি পালন করেছি। এজাহারে নাম আছে এমন মাত্র ৫ জন আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে। এতে আমরা হতাশ। দ্রুত সব আসামির গ্রেপ্তারের দাবি জানাচ্ছি। অন্যথায় কঠোর আন্দোলনে যাব আমরা।’

জামালপুর অনলাইন জার্নালিস্ট নেটওয়ার্কের সভাপতি জাহাঙ্গীর সেলিম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, পুলিশের প্রতি দাবি, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে হলেও বাকি আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করুন। হত্যাকাণ্ডের এক মাস পেরিয়ে গেলেও ১৭ আসামি অধরা- এটা স্মার্টযুগের কথা হতে পারে না। 

যা বলছেন মানবাধিকারকর্মীরা

মানবাধিকার সংস্থা সৃষ্টি হিউম্যান রাইটস সোসাইটির চেয়ারম্যান আনোয়ার-ই-তাসলিমা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘মুদি দোকানি থেকে সাধুরপাড়ার ডন হয়ে ওঠা বাবু রাজনীতিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কোটিপতি বনে গেছেন। তার ছেলের অস্ত্রসহ একটি ছবি আলোচনায় এসেছে। বাবু চেয়ারম্যানের উচ্চপর্যায়ের শেল্টারদাতা রয়েছে। গণমাধ্যমে উঠে আসা পুলিশের দুজন কর্মকর্তা ও বকশীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির ব্যাপারে তদন্ত করার দাবি জানাচ্ছি। পাশাপাশি রিফাতের সেই অস্ত্র কোথা থেকে, কীভাবে এলো, এটা উদঘাটন করার দাবিও জানাচ্ছি। আর বাকি আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করার জোর দাবি জানাচ্ছি।’ 

এসব বিষয়ে জামালপুর ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরমান আলী বলেন ‘আসামিদের গ্রেপ্তারে কয়েকটি টিম কাজ করছে। আমরা রাতদিন কাজ করে যাচ্ছি। অতি অল্প সময়ের মধ্যে আমরা আসামিদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে পারব বলে আশা করছি।’

যা বলেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য

জামালপুর-১ (দেওয়ানগঞ্জ-বকশীগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ বলেন, সাংবাদিক নাদিম হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে সম্পৃক্তদের বিচারের দাবিতে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে। যেন অন্যরাও দেখে যে এ ধরনের কাজ করে পার পাওয়া যায় না। সে জন্য সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।

গত ১৪ জুন রাতে কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে বকশীগঞ্জের পাটহাটি এলাকায় হামলার শিকার হন বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের জামালপুর জেলা প্রতিনিধি ও একাত্তর টিভির বকশীগঞ্জ উপজেলা প্রতিনিধি। হামলার শিকার নাদিমকে প্রথমে বকশীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পরে জামালপুর জেনারেল হাসপাতাল এবং ১৫ জুন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সাংবাদিক নাদিম। ১৬ জুন বকশীগঞ্জ উপজেলার নিলক্ষিয়ায় তাকে দাফন করা হয়।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা