কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা
প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০২৩ ১২:২৯ পিএম
হাতপাখা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরের নারীরা
রান্না করার পাশাপাশি চলছে হাতপাখা তৈরির কাজ। আঙিনায় বিশ্রামের সময় গল্প করতে করতেও চলছে পাখা তৈরির কাজ। অলস সময় না কাটিয়ে যখনই সময় পাচ্ছেন, বসে পড়ছেন পাখা তৈরির কাজে। ১০ বছরের শিশু থেকে ৮০ বছরের বৃদ্ধা পর্যন্ত করছেন এ কাজ। চৈত্রের সকালে গৃহস্থালির এক দফা কাজ শেষ করে আঙিনায় বসে যায় ঘরকন্নারা। রঙিন সুতায় পাখা বোনে। রঙিন পাখায় এ যেন স্বপ্নবুনন।
গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলা সদর থেকে ১২ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে জামালপুর ইউনিয়নের বুজরুক রসুলপুর গ্রামের খামারপাড়া এবং রসুলপুর ইউনিয়নের আরাজি ছান্দিয়াপুর গ্রাম। এ দুই গ্রামের দেড় শরও বেশি পরিবার বাঁশের চাকের ভেতরে নানা রঙের সুতা দিয়ে তৈরি করে হাতপাখা। এ দুই গ্রাম এখন মানুষের মুখে মুখে পাখার গ্রাম হিসেবে পরিচিত।
গ্রামের পুরুষরা কৃষি বা অন্য পেশায় যুক্ত থাকলেও পাখার হাতল, ডাঁটি, চাক তৈরিসহ বাঁশের কাজ তারাই করেন। আর পাখা তৈরির মূল কাজটি করেন নারীরা। গ্রামে ঢুকলেই চোখে পড়বে পাখা তৈরির দৃশ্য। এখানে-সেখানে, গাছের নিচে, পুকুরপাড়ে দু-তিনজন একসঙ্গে বসে গেছেন সুঁই-সুতা আর চাক নিয়ে। সোমেনা বেগম, মরিয়ম বিবি, হাসিনা বেগম, মাজেদা খাতুনের মতো অনেকেই পাখা বোনে অবিরাম। কোনো প্রশিক্ষণ নেই, স্রেফ নিজে নিজে শেখা। বড়দের দেখে দেখে স্কুলপড়ুয়া মেয়েরাও হাত পাকায় এ কাজে।

পাখা কারিগর সোমেনা বেগম বলেন, চৈত্র থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত পাখার বেচাকেনা চলে। দুই গ্রামের প্রায় ৪শ পরিবারের মধ্যে দেড় শতাধিক পরিবার জড়িয়ে আছে পাখা বুননের সঙ্গে। এসব পরিবারের নারীরা প্রতিদিন প্রায় এক থেকে দেড় হাজার পাখা তৈরি করছেন। পাখা তৈরির পর কেউ কেউ গ্রামে গ্রামে বিক্রি করেন, আবার কেউ পাইকারের হাতে তুলে দেন। এ দুই গ্রামের পাখা গাইবান্ধা ছাড়িয়ে চলে যায় জামালপুর, ময়মনসিংহ, রংপুর, বগুড়া, রাজশাহী, ঢাকাসহ দেশের নানা প্রান্তে।
কথা হয় গৃহবধূ মাজেদা খাতুনের সঙ্গে। তিনি বলেন, তার স্বামী মাহে আলম কৃষিশ্রমিকের কাজ করতেন। তিনি ঝিয়ের কাজ করে সংসার চালাতেন। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হতো। ১০ বছর আগে তিনি হাতপাখা তৈরি শুরু করেন। এখান থেকে উপার্জিত অর্থ দিয়ে এক ছেলেকে বগুড়া শহরে রেখে লেখাপড়া শেখাচ্ছেন। মেয়ের বিয়ের প্রস্তুতি হিসেবে গয়না গড়ছেন, কিছু আবাদী জমি নিয়েছেন আর বাড়িতে তুলেছেন দুটি টিনের ঘর। মাহে আলম অন্যের জমিতে শ্রম বিক্রি ছেড়ে এখন পাখা বিক্রির ব্যবসা করেন। স্বামী আর দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে ভালোই আছেন তিনি।
পাখার কারিগর হাসিনা বেগম জানান, সংসারে সচ্ছলতা আনতে গৃহস্থালি কাজের পাশাপাশি পাখা বোনেন তিনি। পাশের উপজেলা গোবিন্দগঞ্জ থেকে ৩শ টাকা কেজিতে আনতে হয় সুতা। এখন অবশ্য মোবাইল ফোনে চাহিদা জানালে সুতা বাড়িতেই পৌঁছে দেয় দোকানি। এক কেজি সুতা দিয়ে ২৫ থেকে ৩০টি পাখা বানানো যায়।
প্রতিটি পাখা তৈরি করতে ১০ টাকার সুতা, দুই টাকার বাঁশের হাতল, তিন টাকার বাঁশের চাক, তিন টাকার সুতা মোড়ানোর কাপড় এবং পারিশ্রমিকসহ প্রায় ২৫ টাকা খরচ করতে হয়। এর মধ্যে ৩০-৩৫ টাকার এক চাকার পাখা যেমন আছে, তেমনি আছে ৭০-৭৫ টাকার দুই চাকার পাখাও। একেকজন দিনে সাত থেকে দশটা করে পাখা বুনতে পারেন। পাইকাররা এসে বাড়ি থেকেই পাখা কিনে নিয়ে যান। বছরের সাত-আট মাস চলে পাখা তৈরির কাজ। তবে ফাল্গুন থেকে জ্যৈষ্ঠ পর্যন্ত চাহিদা থাকে বেশি।

খামারপাড়া গ্রামে পাখা তৈরির পথিকৃৎ মরিয়ম বিবি জানান, শীতকালে তিন মাস পাখা তৈরির কাজ বন্ধ থাকে। ওই তিন মাস সুতা, বাঁশ, কাপড় ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে মজুদ রাখা হয়। বছরের প্রায় বাকি নয় মাসই চলে পাখা তৈরির কাজ। বিশেষ করে গরমের সময়টায় পাখার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কাজের চাপও বাড়ে। তিনি বলেন, পাখা তৈরির উপকরণের দাম বেড়ে গেছে। ঋণ নিয়ে কাজ করতে হয়। তারপর পাখা বিক্রি হলে সেই ঋণ সুদে-আসলে শোধ করতে হয়।
পাখার কারিগরদের দাবি, বিনাশর্তে ঋণ কিংবা শিল্পগ্রাম হিসেবে চিহ্নিত করে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া গেলে এই হাতপাখা তৈরি শিল্পটির ব্যাপ্তি আরও বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করছেন জেলার বিশিষ্টজনরা।