রংপুর অফিস
প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০২৩ ১৭:০১ পিএম
আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২৩ ১৭:৫০ পিএম
উজানের পাহাড়ি ঢলে তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন মানুষ। শুক্রবার গঙ্গাচড়া উপজেলার গজঘণ্টা ইউনিয়নের চর ছালাপাক থেকে তোলা। প্রবা ফটো
উজানের পাহাড়ি ঢলে ভাসছে উত্তরের নদীর তীরবর্তী মানুষ। নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় তিস্তা ব্যারাজের সবকটি জলকপাট খুলে দেওয়া হয়েছে।
এতে করে রংপুর, লালমনিরহাট ও নীলফামারী জেলার তিস্তা নদীর তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল, চর ও দ্বীপ চরে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। গবাদিপশু নিয়ে পানিবন্দি মানুষেরা বিপাকে পড়েছেন। অনেক স্থানে বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় পানিবন্দি পরিবারের মাঝে শুকনা খাবার বিতরণ করেছে প্রশাসন।
রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে জানা গেছে, ভারতের ভারী ও অতি ভারী বৃষ্টির কারণে উজানের পাহাড়ি ঢলে তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, দুধকুমারসহ রংপুর বিভাগের সব নদ-নদীর পানি বেড়েছে।
শুক্রবার (১৪ জুলাই) সকাল ৬টায় তিস্তা নদীর পানি ডালিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ৪০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। কাউনিয়া পয়েন্টে ওই সময় তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার ২৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এ ছাড়া ব্রহ্মপুত্র নদী নুনখাওয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ৩৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে, চিলমারী পয়েন্টে ৪৯ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে, ধরলা নদী কুড়িগ্রাম পয়েন্টে বিপদসীমার ১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে, তালুক শিমুলবাড়ী পয়েন্টে বিপদসীমার ২২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে, দুধকুমার নদী পাটেশ্বরী পয়েন্টে বিপদসীমার ৪৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে এবং ঘাঘট নদী গাইবান্ধা পয়েন্টে বিপদসীমার ১ দশমিক ৪ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।
তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধিতে গঙ্গাচড়া উপজেলার নোহালী ইউনিয়নের চর বাগডোহরা, মিনার বাজার, কোলকোন্দ ইউনিয়নের বিনবিনার চর, মটুকপুর, চিলাখাল, লহ্মীটারী ইউনিয়নের ইচলী, শংকরদহ, বাগেরহাট, জয়রামওঝা, গজঘণ্টা ইউনিয়নের রাজবল্লভ, চর ছালাপাক, মর্ণেয়া ইউনিয়নের নরসিংহ, চর মর্ণেয়া, কাউনিয়া উপজেলার বালাপাড়া ও টেপামধুপুর ইউনিয়নের হরিচরণ শর্মা, আজমখাঁ, হয়বত খাঁ, বিশ্বনাথের চর, চরগনাই, ঢুষমারা, চর রাজিব, গোপিঙ্গা, গদাই, পাঞ্জরভাঙ্গা, তালুক শাহবাজপুর, পীরগাছা উপজেলার ছাওলা ইউনিয়নের গাবুড়া, শিবদেব, রামসিং, জুয়ান, হাগুরিয়া হাশিম এলাকায় মানুষের পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
শুক্রবার বিকালে গঙ্গাচড়া উপজেলার লহ্মীটারী ইউনিয়নের চর শংকরদহ, ইচলী, গজঘণ্টা ইউনিয়নের চর ছালাপাক সরেজমিনে দেখা যায়, তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নদীর তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল, চর ও দ্বীপচরে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কোথাও গলা সমান, কোথাও কোমড়, কোথাও-বা হাঁটুপানি হয়েছে। বন্যার কারণে কৃষকদের পাট, মরিচ, বাদামের ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। রাস্তাগুলো পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় স্থানীয়রা ঝুঁকি নিয়ে কলা গাছের ভেলা ও ডিঙ্গি নৌকায় করে যাতায়াত করছেন।
চর ছালাপাকের কৃষক সুজা মিয়া বলেন, ‘নদীর পানি কয়েক দিন ধরি বাড়তোছে, আবার কমতোছে। কাইল আইত (রাত) থ্যাকি তিস্তা নদীর পানি বেশি বাড়ছে। রাইতোত ক্ষেতগুলা পানিত ডুবি গেইছে। আইজ আস্তাসুদ্দা ডুবি গেইছে। হামরা এ্যালা পানির মাঝোত গরু-ছাগল নিয়া আটকা পড়ি আছি। শুনতোছি পানি নাকি আরও বাড়বে। পানি আরও বাড়লে বাড়ি থাকা যাবার ন্যায়।’
একই এলাকার কৃষক শাহিন আলম বলেন, ‘প্রত্যেকবারে পানি বাড়লে হামার ম্যালা কষ্ট হয়। ঘর-দুয়ার সউগ ডুবি যায়। আবাদি জমি, গরু-ছাগল নদী ভাসি যায়। এইবারও পানির জোর তেমন দেখতোছি। এই সমস্যা থ্যাকি হামরা কবে মুক্তি পামো জানি না।’
শংকরদহের মোসলেমা বেগম বলেন, ‘পানিত থ্যাকি ছোট ছোট ছাওয়া নিয়া আন্দাবাড়ি করা নাগে। এর মাঝোত ছোট ছাওয়াগুলা খালি পানিত নামবার চায়, সাপেরও ভয় থাকে। মহিলা মানুষের ম্যালা কষ্ট।’
গঙ্গাচড়া লহ্মীটারী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী বলেন, ‘আমার ইউনিয়নে ১ হাজার ৫০০ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। তিস্তার তীব্র স্রোতে ২০টি ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে। ক্ষতিগ্রস্তরা বাঁধে এসে আশ্রয় নিয়েছে। উপজেলা প্রশাসন পানিবন্দি কিছু পরিবারের মাঝে শুকনো খাবার বিতরণ করেছে।’
গঙ্গাচড়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা নাহিদ তামান্না বলেন, ‘লহ্মীটারী ইউনিয়নের বাগেরহাট আশ্রয়ণ, চর শংকরদহ ও ইচলী এলাকার পানিবন্দি মানুষদের উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে চাহিদামতো অন্য এলাকায় সরকারি ত্রাণ পৌঁছানো হবে। আমাদের পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ রয়েছে। এ ছাড়া বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রয়েছে। বন্যার স্থায়ীত্ব বেশি হলে মানুষদের ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের দেওয়া বোটের মাধ্যমে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে আনা হবে।’
রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, ‘তিস্তা নদীর পানি কিছুটা কমতে শুরু করলেও ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। সকাল ৯টায় তিস্তা নদীর ডালিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ৩২ সেন্টিমিটার, দুধকুমার নদী পাটেশ্বরী পয়েন্টে বিপদসীমার ৫০ সেন্টিমিটার, ধরলা নদী কুড়িগ্রাম পয়েন্টে বিপদসীমার ৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। তিস্তা নদীর পানি মধ্যরাত নাগাদ আরও বাড়তে পারে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় দুধকুমার ও ধরলা নদীর পানি কিছুটা কমবে। তবে বৃষ্টির কারণে এ নদী দুটির পানি সময় বিশেষে বাড়তে পারে।’