মৌলভীবাজার প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০২৩ ০৯:০৮ এএম
লাউয়াছড়া বনে এখনও দাঁড়িয়ে আছে দেশের একমাত্র ‘আফ্রিকান টিকওক’ বৃক্ষ। প্রবা ফটো
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। এখানের চিরসবুজ প্রকৃতি আর নির্জনতা টেনে আনে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের। লাউয়াছড়া বনে ভ্রমণপিপাসু প্রধান আকর্ষণ বিরল প্রজাতির বৃক্ষ আর বন্য প্রাণী। পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ‘আফ্রিকার টিকওক’ নামের বিরল বৃক্ষ। সেটিও এখন আর জীবিত নেই। বৃক্ষটি কেবল লাউয়াছড়া উদ্যানেই ছিল, তাও মাত্র একটি-ই।
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ছাড়া দেশের আর কোথাও অস্তিত্ব নেই ‘আফ্রিকার টিকওক’ বৃক্ষের। এই বনে ১৬৭ প্রজাতির বৃক্ষের মধ্যে দুটি আফ্রিকান টিকওক বৃক্ষ ছিল। এর একটি ২০০৬ সালের ৭ জুলাই ঝড়ে উপড়ে যায়। এর গুঁড়ির অংশ এখনও জাতীয় উদ্যানে স্মৃতি হয়ে পড়ে রয়েছে। অপরটি উদ্যানের মূল ফটক থেকে ভেতরে ঢোকার পথের দুই পাশে সারি সারি নানা প্রজাতির বৃক্ষের মধ্যে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল এতদিন। গত বছরের বর্ষায় সেটিও মারা যাওয়ায় এখন দেশে এ প্রজাতির কোনো বৃক্ষ আর নেই। বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনিস্টিউট (বিএফআরআই) টিস্যু কালচারের মাধ্যমে এটি সংরক্ষণের চেষ্টা চালিয়েছিল। কিন্তু তা পুরোপুরি ব্যর্থ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেশ থেকে প্রজাতিটি বিলুপ্ত হয়ে যায়।
গত ৬ জুলাই সরেজমিন লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ১০০ ফুট উচ্চতা ও ১২ ফুট গোলাকার বিরল প্রজাতির ‘আফ্রিকান টিকওক’ গাছটি এখনও দাঁড়িয়ে আছে। তবে পাতা ঝরে গেছে, গুঁড়িতেও পচন। বন বিভাগের সিলভিকালচার টিচার্স বিভাগ সূত্রে জানা যায়, অনেক চেষ্টা করেও গাছটির কোনো বংশবিস্তার করা সম্ভব হয়নি। ‘আফ্রিকান টিকওক’ বৃক্ষটির কোনো বিচি ছিল না। ফুল ধরলেও ঝরে পড়ে যেত। কয়েক বছর আগে গাছ থেকে কাটিং সংগ্রহ করা হয়েছিল। তবে কোনো লাভ হয়নি।
এ ব্যাপারে বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. শহীদুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘দেশে একমাত্র লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে দুটি বিরল প্রজাতির আফ্রিকান টিকওক বৃক্ষ ছিল। এর একটি ২০০৬ সালে ঝরে যায়। আরেকটি গত বছরের বর্ষায় গোড়া পচে গিয়ে মারা গেছে। এখন দাঁড়িয়ে আছে মৃত বৃক্ষটি। গত বছর বিএফআরআই টিস্যু কালচারের মাধ্যমে বংশবিস্তারের চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়। ফলে এটি হারিয়ে গেল আমাদের পরিবশে-প্রতিবেশ থেকে।’
মৃত ‘আফ্রিকান টিকওক’ বৃক্ষটির বয়স সম্পর্কে কোনো তথ্য-উপাত্ত নেই বন বিভাগের কাছে। তবে সংশ্লিষ্ট অনেকের অভিমত, ১৯৩০ সালের দিকে এক ব্রিটিশ কর্মকর্তা লাউয়াছড়ায় আসেন। তখন এখানে ছিল প্রাকৃতিক বন। ওই কর্মকর্তার বিস্তারিত পরিচয় জানা না গেলেও, তখন প্রাকৃতিক বনের বেশিরভাগ গাছ কেটে চাপালিশ, সেগুন, গর্জন, লোহাকাঠ, রক্তনসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা রোপণ করা হয়। ধারণা করা হয় লাউয়াছড়ায় রোপণকৃত বৃক্ষের মধ্যে ছিল ‘আফ্রিকান টিকওক’ বৃক্ষের দুটি চারা। সে হিসেবে বিরল প্রজাতির বৃক্ষটির বয়স শত বছরের কিছু কম। লাউয়াছড়া বনের আফ্রিকান টিকওক বৃক্ষ স্থানীয়দের অনেকের কাছে ‘অজ্ঞান গাছ’ বা ‘ক্লোরোফর্ম’ গাছ হিসেবেও পরিচিত ছিল। জনশ্রুতি আছে, এই গাছের পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে বা দাঁড়ালে মানুষ অজ্ঞান হয়ে পড়ত। যদিও এর কোনো সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেনি কেউ।
তবে বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনিস্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, এই গাছে কার্বলিক অ্যাসিড ও ক্লোরোফর্মের উপস্থিতি রয়েছে। এ কারণে গাছটির পাশে বেশিক্ষণ দাঁড়ালে অনেকেরই একটু ঘুম ঘুম ভাব হতে পারে। এর প্রতিক্রিয়ায় নাক ও গলা জ্বালা করা এবং শ্বাসকষ্টের সম্ভাবনাও ছিল।
তথ্যানুন্ধানে জানা যায়, আফ্রিকান টিকওক প্রজাতির ক্লোফোরা এক্সেলসা (সাধারণত আফ্রিকান টাক, মভিলে বা ইরোকো নামে পরিচিত) ক্রান্তীয় আফ্রিকার একটি বৃক্ষ। এটির উচ্চতা হয় ১৬০ ফুট পর্যন্ত। এ জাতীয় বৃক্ষ আফ্রিকা মহাদেশের অ্যাঙ্গোলা, বেনিন, বুরুন্ডি, ক্যামেরুন, মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, গিনি, ইথিওপিয়া, গ্যাবন, ঘানা, আইভরি কোস্ট, কেনিয়া, মালাউই, মোজাম্বিক, নাইজেরিয়া, রুয়ান্ডাসহ বিভিন্ন দেশে রয়েছে। এর প্রাকৃতিক অবস্থান রেইন ফরেস্ট চিরহরিৎ বনে। বর্তমানে প্রজাতিটি আফ্রিকাতেই চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
আফ্রিকা মহাদেশের বিভিন্ন দেশে স্থানীয়ভাবে ‘আফ্রিকান টিকওক’ বৃক্ষকে আফ্রিকান ওক, আবেং, আলা, বঙ্গ, বাঙ্গি, বাঙ্গু, ডেইডি, ইরোকো, কাম্বালা, মুরিতুলুল্ডা, মুউলে, মউউল, নোংন্ড, ওডুম, টুলে, উলোকো, লোকো, এমএসুল, মালালা, অজিজ, রোক, সিঙ্গা নামে ডাকা হয়। আফ্রিকা মহাদেশে ঐতিহ্যগতভাবে ‘আফ্রিকান টিকওক’ বৃক্ষটিকে পবিত্র বৃক্ষ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। এটির নিচে আফ্রিকায় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করা হয়। সেখানে অনেকে এ বৃক্ষের নিচে উপহারসামগ্রী রেখে আসেন। এর কাঠ অনেক সময় মৃত ব্যক্তির কফিনে এবং বাদ্যযন্ত্র ড্রামসে ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া এর কাঠ দিয়ে ঘরের আসবাব, মেঝে এবং নৌকা তৈরি করা হয়। অন্যদিকে আফ্রিকায় এ বৃক্ষের পাতা ও ছাল কাশি, হার্টের সমস্যা এবং দুর্বলতার ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।