স্বরূপকাঠি (পিরোজপুর) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০২৩ ০৯:৩৮ এএম
আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২৩ ০৯:৪০ এএম
পিরোজপুরের স্বরূপকাঠির সরকারি পাইলট মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন খালে ভাসমান কাঠবাজার। প্রবা ফটো
পিরোজপুরের স্বরূপকাঠির ভাসমান কাঠবাজারের ইতিহাস ১০০ বছরেরও বেশি সময়ের। একসময় এই ব্যবসা ছিল স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবিকার অন্যতম বড় অবলম্বন। কিন্তু গত কয়েক দশক ধরে কাঠ ব্যবসায়ী ও বাজারসংশ্লিষ্টরা ভালো নেই। পরিবহন সংকট, রাজনৈতিক প্রভাব ও পাইকারি ক্রেতার অভাবসহ নানা সংকটে আজ হুমকির মুখে দক্ষিণাঞ্চল তথা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কাঠের বাজার।
স্বরূপকাঠি থানাসংলগ্ন সন্ধ্যা নদী এলাকার সরকারি পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামনের খালের চর, ইন্দেরহাট খালের মোহনা, মিয়ারহাট বাজারের খাল ও বয়াসহ আরও কিছু স্থানে গড়ে ওঠা ভাসমান বাজারগুলোই উপজেলার সব থেকে বড় কাঠ ব্যবসাকেন্দ্র। এখনও অন্তত ১০ হাজার ব্যবসায়ী ও শ্রমিক এই বাজারকে কেন্দ্র করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
স্বরূপকাঠির কাঠের বাজারে রয়েছে নানা সম্ভাবনা, পাশাপাশি আছে প্রতিকূলতাও। ব্যবসাসংশ্লিষ্টদের বলছেন, তারা ঐতিহ্যবাহী এই ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন, কিন্তু সরকারের কাছ থেকে কোনো পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছেন না। তা ছাড়া কাঠের বাজারে রাজনৈতিক প্রভাব, সহজ ঋণ না পাওয়া, দালাল চক্রের উৎপাত, নদীপথে জলদস্যুদের আক্রমণসহ প্রতিনিয়ত নানাভাবে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছেন তারা। প্রাকৃতিক দুর্যোগে বৃক্ষ নষ্ট হওয়ার কারণেও অনেক সময় তারা ক্ষতিগ্রস্ত হন। কিন্তু কারও কাছে কোনো সহযোগিতা পান না।
জানা যায়, আনুমানিক ১৯১৭ সালের প্রথম দিকে পিরোজপুর এলাকার তৎকালীন বাকেরগঞ্জের আওতাধীন বর্তমান স্বরূপকাঠি উপজেলায় সুন্দরবনের সুন্দরী গাছকে কেন্দ্র করে কাঠ ব্যবসার যাত্রা শুরু হয়। ১৯১৮ সালের শেষ দিকে স্বরূপকাঠি সন্ধ্যা নদীর তীর ঘেঁষে একাধিক শাখা খালে গাছ বেচাকেনার উদ্দেশ্যে ভাসমান কাঠের হাট গড়ে ওঠে।
সুন্দরী কাঠ ব্যবসায় সরকারের বাধা-নিষেধের পর থেকেই স্বরূপকাঠি গড়ে ওঠে মেহগনি, চাম্বল ও রেইনট্রিসহ নানা দেশীয় কাঠের বৃহত্তম বাজার। প্রতিনিয়ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা এসে দেড় থেকে দুই কোটি টাকার কাঠ কেনেন উপজেলার কাঠ মোকামগুলো থেকে। আর কেনা মালামাল ট্রাক, লঞ্চ ও কার্গোসহ বিভিন্ন পরিবহনে ব্যবসায়ীরা নিয়ে যান নিজেদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে।
ব্যবসায়ীদের আরও অভিযোগ, পরিবহন সংকট ও পাইকারি ক্রেতার অভাবে সরবরাহ করা কাঠ নিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন স্বরূপকাঠির কাঠ ব্যবসায়ীরা। সময়মতো পরিবহন করতে না পারায় অনেক সময় বন্ধ থাকে গাছ বিক্রি। ফলে তাদের ঋণের বোঝা দিন দিন ভারী হয়ে যাচ্ছে।
নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও বরিশাল, খুলনা, চাঁদপুর, মুলাদী, মুন্সীগঞ্জ, যশোর, ঝিনাইদহ, নোয়াখালী, ফরিদপুর, বাগেরহাট ও হবিগঞ্জসহ দেশের অনেক জেলার কয়েক কোটি মানুষ এখনও স্বরূপকাঠির এই ভাসমান কাঠের হাটে ব্যবসায় জড়িত থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কাঠের মোকাম গড়ে তুলছেন। নদীপথে দূর থেকে আসা কাঠ ব্যবসায়ীরা জলদস্যুদের ভয়ে ২৫-৩০টি নৌকার বহরে একই সঙ্গে স্বরূপকাঠির মোকামে আসেন।
যে যার মতো বেচাকেনা শেষে, আবার সারিবদ্ধ নৌকাগুলো নিয়ে নদীপথে চলে যান। স্বরূপকাঠির কাঠ ব্যবসায়ী মতিউর রহমান মৃধা বলেন, একটি গাছ চূড়ান্তভাবে ব্যবহারের আগে ৫-৬ বার বেচাকেনা হয়। দাঁড়ানো গাছ কাটা থেকে ব্যবহারের পর্যায় পর্যন্ত আট ধরনের শ্রমিক রয়েছে।
স্বরূপকাঠি কাঠ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতির কাছে এই কাঠ ব্যবসা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, বর্তমানে ব্যবসাবাণিজ্য করতে খুব কষ্ট হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে এই ব্যবসা ছেড়ে অন্য কোনো কাজকর্মে চলে যেতে হবে। বর্তমানে কাঠের দাম অনুযায়ী ব্যবসা করা যাচ্ছে না।
উপজেলার কাঠ ব্যবসার দেশব্যাপী বিশেষ পরিচিতি থাকায় কয়েক বছর আগেও কিছু শিক্ষিত বেকার যুবক এই পেশার সঙ্গে জড়িয়েছেন। তারা বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে চাকরির আশা ছেড়ে দিয়ে ব্যাংক ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে এ ব্যবসা শুরু করেছিলেন। পরিবার নিয়ে অনেকটা স্বাচ্ছন্দ্যেও ছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি নানা প্রতিকূলতায় তাদের সেই স্বপ্নে ভাটা পড়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েক যুবক ব্যবসায়ী জানান, ঋণ নিয়ে ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। দেনার চাপে রাতে বাসায় থাকতে পারছেন না। ক্রমান্বয়ে ভারী হয়ে উঠেছে তাদের ঋণের বোঝা। সরকার যদি স্বল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা করে দিত, তাহলে ঋণের বোঝা কাটিয়ে ব্যবসার পরিধি বাড়াতে পারতেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুব উল্লাহ মজুমদার জানান, নেছারাবাদের নানাবিধ ঐতিহ্য ও ব্যবসা-বাণিজ্যের মধ্যে কাঠের ব্যবসা অন্যতম। ব্যবসার পরিধি বাড়ানো ও সরকারি সুযোগ-সুবিধাসহ ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তায় উপজেলা প্রশাসন সবসময় নজর রাখছে।