× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

এই দই বগুড়ার দই...

মোহন আখন্দ, বগুড়া

প্রকাশ : ০৬ জুলাই ২০২৩ ১২:১৬ পিএম

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২৩ ১২:২১ পিএম

জিআই পণ্য বগুড়ার দই। ছবি : রেজা করিম

জিআই পণ্য বগুড়ার দই। ছবি : রেজা করিম

প্রায় ১৫০ বছর আগের কথা। বগুড়ার শেরপুরের ঘোষ পরিবারের ভেটু ঘোষ আর যজ্ঞেশ্বর ঘোষের মাথায় চিন্তা এলো দই বানাবেন। আগে থেকেই এই পরিবার ঘি, মাখন ও মিষ্টি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল। তাই দই উৎপাদনে যেতে তেমন কোনো সমস্যা হলো না তাদের। খুব বেশি সময় লাগল না, তাড়াতাড়িই তাদের সুনাম ছড়িয়ে পড়ল ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে।

প্রবীণ সাংবাদিক আব্দুর রহিম বগ্রা জানান, ১৯৩৮ সালের দিকে বগুড়ার দইয়ের খ্যাতি ইংল্যান্ডেও ছড়িয়ে পড়ে। ওই বছরের শুরুর দিকে বগুড়া নওয়াববাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন তৎকালীন বাংলার ব্রিটিশ গভর্নর স্যার জন এন্ডারসন। আপ্যায়নের রীতি অনুযায়ী, খাওয়ার পর কাচের পাত্রে দই দেওয়া হয় তাকে। আর জীবনের প্রথম সেই দই খেয়ে এন্ডারসন এতই অভিভূত হন যে, বগুড়ার দই ইংল্যান্ডে নেওয়ার পরিকল্পনা করেন তিনি।

শেরপুরের ঘোষ পরিবারের অন্যতম সদস্য নিমাই ঘোষ জানান, বংশ পরম্পরায় দই উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত তারা। তাদের সংস্পর্শে এসে বগুড়ায় অনেক মুসলিম কারিগরও এখন দই উৎপাদনে পারদর্শী হয়ে উঠেছেন। 

বগুড়ার এই দই সম্প্রতি জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। যার মধ্য দিয়ে এর অনন্যতা সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

উৎপাদন সম্প্রসারিত হলো যেভাবে

ঘোষ পরিবারের এই দই উৎপাদন কার্যক্রম একসময় শেরপুর ছাড়িয়ে বগুড়া শহরেও সম্প্রসারিত হয়। কেননা শহরের মানুষ দইয়ের স্বাদ পাওয়া থেকে যাতে বঞ্চিত না হন সেজন্যে নওয়াব আলতাফ আলী চৌধুরী শেরপুরের গৌর গোপালকে কারখানা নির্মাণের জন্য নওয়াববাড়ী সংলগ্ন এলাকায় এক খণ্ড জায়গা ছেড়ে দেন। নওয়াব আলতাফ হলেন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলীর পিতা। তার পৃষ্ঠপোষকতায় গৌর গোলাপ দই উৎপাদন শুরুর পর আরও অনেকেই উৎসাহিত হয়ে ওঠেন। পরে শহরের চেলোপাড়া এলাকার ঘোষ পরিবারের দুই সহোদর সুরেন ঘোষ এবং গোপাল ঘোষও দই উৎপাদন শুরু করেন।

শেরপুরের পাশাপাশি এখন বগুড়া জেলার সোনাতলার চরপাড়া, সারিয়াকান্দির কামালপুর ও ধুনটের হাসোখালি গ্রামেও প্রচুর দই উৎপাদন হয়। এখনও গ্রাম এলাকায় বড় বড় মজলিসে হাসোখালির দই খাওয়ানো হয়। প্রথম দিকে উৎপাদিত দই ছিল সাদা অর্থাৎ মিষ্টিবিহীন। হালে সাদা দইয়ের চেয়ে মিষ্টি দইয়ের উৎপাদন বেড়েছে। তবে স্বাস্থ্য সচেতনদের পছন্দের কথা মাথায় রেখে দু-একটি প্রতিষ্ঠান স্বল্প মিষ্টির দইও উৎপাদন করে থাকে। 

প্রতিদিন উৎপাদিত হয় তিন হাজার মণ দই

উৎপাদকরা জানান, বগুড়া জেলায় ছোট-বড় দেড় শতাধিক কারখানায় প্রতিদিন তিন হাজার মণ দই উৎপাদিত হয়। এর একটি বড় অংশ রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতে চলে যায়।

বগুড়া শহরে দই উৎপাদনকারী প্রাচীনতম দুটি প্রতিষ্ঠান হলোÑ ‘গৌরগোপাল দধি ভাণ্ডার’ ও ‘রুচিতা দই ঘর’। পরে ‘মহররম আলী দই ঘর’, ‘রফাতের দই ঘর’, ‘আকবরিয়া দই’, ‘এশিয়া সুইটস্’ এবং ‘চিনিপাতা দই’ নামের প্রতিষ্ঠানও বেশ সুনাম কুড়িয়েছে। দইয়ের আদি স্থান শেরপুরে উৎপাদিত ‘শম্পা দই’ এবং ‘সাউদিয়া দই’ও অনেকের পছন্দ। সাধারণত ৪০ কেজি দুধ থেকে গড়ে ১৬ কেজি দই পাওয়া যায়। দুধ থেকে দই উৎপন্ন হতে গড়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা সময় লাগে। চুলার আগুনে এক দেড় ঘণ্টা তাপ দিয়ে দুধ ঘন করার পর ঠান্ডা করে সাইজ অনুযায়ী পাত্রে রেখে তাতে বীজ (পুরোনো দইয়ের অংশ) মেশানোর পর ঢাকনা দিয়ে ঢেকে ৮-৯ ঘণ্টা রেখে দিলেই দই পাওয়া যায়। 

প্রায় ১৮ বছর আগে বগুড়ায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে দইয়ের উৎপাদন শুরু করে বাংলাদেশের গ্রামীণ ব্যাংক ও ফ্রান্সের ডানোন ফুডস্-এর যৌথ মালিকানাধীন কোম্পানি গ্রামীণ-ডানোন ফুডস্ লিমিটেড। এই কোম্পানি অবশ্য উৎপাদন করে থাকে শিশুদের উপযোগী ‘শক্তি দই’। এই দইয়ের স্বাদ, বর্ণ অন্যসব দই থেকে কিছুটা আলাদা। কারণ এটি উৎপাদনের অন্যতম কারণ শিশুদের পুষ্টি চাহিদা পূরণ। 

যেভাবে জিআই পণ্যের স্বীকৃতি এলো

বগুড়ার উৎপাদিত দইয়ের (সরার দই) ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতির জন্য বগুড়া জেলা হোটেল ও রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি ২০১৭ সালে শিল্প মন্ত্রণালয়ের পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেড মার্কস অধিদপ্তরে (ডিপিডিটি) আবেদন করা হয়। তারপর থেকে বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে চলতি বছরের ২৫ জুন ডিপিডিটির সভায় এটি অনুমোদন দেওয়া হয়।

বগুড়ার জেলা হোটেল রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সভাপতি রেজাউল করিম সরকার রবিন জানান, দই বাংলাদেশের অন্য সব জেলায়ও উৎপাদন হয়। কিন্তু আমরা অনেকদিন থেকেই বলে আসছিলাম, অন্য জেলায় উৎপাদিত দইয়ের সঙ্গে বগুড়ায় উৎপাদিত দইয়ের গুণগত পার্থক্য রয়েছে। জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য আবেদন করার পর সরকারের পেটেন্ট, ডিজাইন এবং ট্রেড মার্কস অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে বগুড়ার দই পরীক্ষা করা হয় এবং এর অনন্যতা চিহ্নিত হয়। এই মূল্যায়নের ভিত্তিতে বগুড়ার দইকে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তিনি বলেন, এই স্বীকৃতির ফলে শুধু বাংলাদেশেই নয় সারা বিশ্বেও বগুড়ার দইয়ের সুনাম ছড়িয়ে পড়বে। এখন থেকে অন্য জেলার কেউই আর নিজেদের দইকে বগুড়ার দই বলে চালিয়ে দিতে পারবে না। এতে ভোক্তা এবং উৎপাদক উভয়েই উপকৃত হবেন।

স্বীকৃতি পাচ্ছে আরও তিন পণ্য 

বগুড়ার দইয়ের সঙ্গে জিআই স্বীকৃতি পাচ্ছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ল্যাংড়া ও আশ্বিনা আম এবং শেরপুরের তুলসীমালা ধান। গত ২৫ জুন পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেড মার্কস অধিদপ্তরের (ডিপিডিটি) সভায় চারটি পণ্যে জিআই স্বীকৃতি প্রদানের অনুমোদন দেওয়া হয়।

ডিপিডিটির ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. জিল্লুর রহমান গতকাল বুধবার সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, গত ২৫ জুন চারটি পণ্যের জিআই সনদ ইস্যুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। দ্রুতই অনুষ্ঠান করে পণ্যগুলোর জিআই স্বীকৃতি ঘোষণা করা হবে। 

এখন পর্যন্ত দেশের ১৫টি পণ্য ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই সনদ পেল। আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ববিষয়ক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল প্রপার্টি রাইটস অর্গানাইজেশনের নিয়ম মেনে শিল্প মন্ত্রণালয়ের ডিপিডিটি জিআই পণ্যের স্বীকৃতি ও সনদ দিয়ে থাকে। ২০১৩ সালে ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) আইন হয়। ২০১৫ সালে আইনের বিধিমালা তৈরির পর জিআই পণ্যের নিবন্ধন নিতে আহ্বান জানায় ডিপিডিটি।

২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে সর্বপ্রথম জামদানি শাড়িকে জিআই সনদ দেওয়া হয়। এরপর একে একে স্বীকৃতি পেয়েছে ইলিশ, ক্ষীরশাপাতি আম, মসলিন, বাগদা চিংড়ি, কালিজিরা চাল, বিজয়পুরের সাদা মাটি, রাজশাহী সিল্ক, রংপুরের শতরঞ্জি, দিনাজপুরের কাটারিভোগ চাল, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ফজলি আম। এখন থেকে পণ্যগুলো বাংলাদেশের নিজস্ব পণ্য হিসেবে বিশ্বে পরিচিতি পাবে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা