করতোয়ায় নৌকাডুবি
পঞ্চগড় সংবাদদাতা
প্রকাশ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১৭:৩৩ পিএম
বাবার মরদেহ পেতে করতোয়ার পাড়ে অপেক্ষায় তপন চন্দ্র বর্মন। প্রবা ফটো
শুক্রবার সকালে পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার মাড়েয়া ইউনিয়নের আওলিয়ার ঘাটে বসে কথা বলছিলে তপন চন্দ্র বর্মন। নৌকা ডুবির ঘটনার ষষ্ঠ দিনেও তার বাবার খোঁজ পাননি।
তপন বলেন, ‘অনেক মানুষের প্রাণহানী হল, অনেক মানুষের মরদেহ পাওয়া গেল। আমার পরিবার থেকে আত্বীয়-স্বজনসহ ছয়জন মানুষ নিখোঁজ ছিল। একএক করে পাঁচ জনের মরদেহ পেলাম। এখন পর্যন্ত আমার বাবাকেই পেলাম না। আশায় আশায় ঘুরতেছি, ছয়দিন ধরে ভোরে উঠে যেখানেই মরদেহ উদ্ধারের খোঁজ পাচ্ছি, দৌড়াচ্ছি, গিয়ে দেখি আমার বাবা নাই। অন্যের মরদেহ। পঞ্চগড় থেকে দিনাজপুরের খানসামা পর্যন্ত নদী এলাকায় যেখানেই শুনেছি, খোঁজ করেছি। কিন্তু আমার বাবাকে কোথাও পাইনি।’
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তপন বলেন, ‘এখন আমার বাবাকে জীবিত পাওয়া আর আশা নেই। ছয় দিন পর সঠিকভাবে মরদেহ পাওয়ারও আশা নাই। কিন্তু আমি যে তার একজন ছেলে, আমি চাই, যেভাবেই আছে, যে অবস্থাতেই হোক বাবার কোনো কিছু পেলেই আমরা সৎকার সম্পন্ন করতে পারবো। ছেলে হিসেবে এই আশা নিয়েই ঘুরতেছি, বলতেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।’
তপন চন্দ্র বর্মনের মত স্বজনহারা অনেকেই ভোর হতে না হতেই আওলিয়ার ঘাটে মর্মান্তিক নৌকাডুবির ঘটনাস্থলে ঘুরছেন। প্রতিদিন সকাল হতে না হতেই ঘাটে বিমর্ষ বসে থাকেন সনাতন ধর্মালম্বী স্থানীয় মানুষজন। তাকিয়ে থাকেন নৌকাডুবির মরনস্থল করতোয়া দিকে।
বোদা উপজেলার সাকোয়া কলেজপাড়া এলাকার তপন চন্দ্র বর্মনের বাবা সরেন্দ্র নাথ বর্মন (৬৩) সনাতন ধর্মলিম্বীদের দূগাপুজার শুরু মহালয়া পুজা উৎসব পালনে বদ্বেশ্বরী মন্দির যেতে আওলিয়ার ঘাটে দূঘটনাকবলিত নৌকায় চড়েছিলেন। মর্মান্তিক এই দূর্ঘনায় ৬৯ জনের মরদেহ উদ্ধার কার হয়।
এখনও তপনের বাবা সরেন্দ্র নাথ বর্মনসহ তিন জনের খোঁজ পাওয়া যায়নি। অন্য নিখোঁজ দুইজন হলেন, পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ শালডাঙ্গা ইউনিয়নের হাতিডুবা শিকারপুর গ্রামের মদনের ছেলে ভূপেন (৪০) এবং একই উপজেলার ঘাটিয়ার পাড়া গ্রামের ধীরেন্দ্র নাথের শিশুকন্যা শ্রীমতি জয়া রানী (৪)।
এদিকে ২৫ সেপ্টম্বর নৌকাডুবির ঘটনার ছয়দিন পরের স্বজন হারানোদের বাসায় চলছে শোকের মাতম। তবে উদ্ধার কাজ অব্রাহত রেখেছেন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। দূর্ঘটনার ষষ্ঠ দিন শুক্রবারও সকাল সাড়ে পাঁচটা থেকে ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিট এবং ১২ জনের ডুবুরি দল উদ্ধার কাজ শুরু করেন। তবে ষষ্ঠ দিন বুধবারও কোনো মরদেহ উদ্ধার করা যায়নি। এর আগে বুধবার একজনসহ মোট ৬৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পঞ্চগড় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ সহকারি পরিচালক শেখ মো. মাহবুবুল ইসলাম বলেন, ষষ্ঠ দিনের মত শুক্রবারও সকাল সাড়ে পাঁচটা থেকে আমাদের ১২টি ইউনিট এবং ১২ জনের ডুবুরি দল নিয়ে উদ্ধার কাজ শুরু করা হয়। মোট ৭০ জন উদ্ধারকর্মী পঞ্চগড় থেকে দিনাজপুরের খানসামা পর্যন্ত করতোয়া নদী এলাকায় উদ্ধার কাজ পরিচালিত হচ্ছে। একজন নিখোঁজ থাকলেও উদ্ধার কাজ চালিয়ে যাওয়া হবে।
গত রবিবার (২৫ সেপ্টম্বর) শারদীয় দুর্গোৎসবের মহালয়া উপলক্ষে দুপুরে বোদা উপজেলার আউলিয়ার ঘাট থেকে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকায় বড়শশী ইউনিয়নের বোদেশ্বরী মন্দিরের দিকে যাচ্ছিলেন যাত্রীরা। ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রীর কারণে নদীর মাঝপথে আওলিয়ার ঘাটেই যাত্রীসহ নৌকাটি ডুবে যায়।
প্রবা/রাই