বাগেরহাট প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৮ জুন ২০২৩ ২০:৪৪ পিএম
আপডেট : ২৯ জুন ২০২৩ ০৯:০৬ এএম
বাগেরহাট শহরের সাধনার মোড়ে চুইঝাল বিক্রি করেন আবুল কালাম। বুধবার (২৮ জুন) দুপুরে তোলা। প্রবা ফটো
কোরবানি উপলক্ষে চুইঝালের দাম কেজিপ্রতি দুই থেকে তিন শ টাকা বৃদ্ধি পেলেও চাহিদা ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। বাগেরহাট অঞ্চলের মানুষের গরুর মাংস রান্নায় চুইঝালের অনুপস্থিতিতে যেন তৃপ্তিই মেটে না। গরুর মাংসের সাদ বাড়াতে চুইঝাল অন্যতম মসলা হিসেবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের কাছে প্রিয়। ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে বাগেরহাটে চুইঝালের চাহিদা আরও বেড়েছে। কোরবানি ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে চুইঝালের দোকানগুলোতে ভিড় বাড়ছে।
বাগেরহাটে বছরজুড়ে চুইঝালের চাষ হয় ও হাট-বাজারে পাওয়া যায়। তবে কোরবানির সময় চুইঝাল বিক্রির প্রধান মৌসুম বলা যেতে পারে। সাধারণ সময়ে চুইঝাল কেজিপ্রতি ৪০০ থেকে ৮০০ টাকা দরে বিক্রি হলেও বর্তমানে চুইঝালের আকারভেদে দাম বেড়ে ৮০০ থেকে দেড় হাজার টাকা হয়েছে।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা বাগেরহাট, খুলনা, নড়াইল, যশোর, সাতক্ষীরা এলাকায় জনপ্রিয় একটি মসলা চুইঝাল। বর্তমানে দেশের অন্য জেলাতেও এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে। চুই লতা জাতীয় গাছ। এর কাণ্ড ধূসর এবং পাতা পান পাতার মতো, দেখতে সবুজ। চুইঝাল খেতে ঝাল হলেও এর রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ঔষধি গুণ। চুই লতার শিকড়, কাণ্ড, পাতা, ফুল-ফল; সবই ভেষজ গুণসম্পন্ন। এটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় হাঁস ও গরুর মাংস রান্না করতে। রান্নার জন্যে চুইঝালের কাণ্ড ব্যবহার করা হয়। চুইঝালে দশমিক ৭ শতাংশ সুগন্ধি তেল থাকে। এ ছাড়া রয়েছে আইসোফ্লাভোন, অ্যালকালয়েড, পিপালারিটিন, পোপিরন, পোলার্টিন, গ্লাইকোসাইডস, মিউসিলেজ, গ্লুকোজ, ফ্রুকটোজ, সিজামিন ও পিপলাস্টেরল।
বাগেরহাট শহরের সাধনার মোড়ে চুইঝাল বিক্রি করেন আবুল কালাম। বুধবার (২৮ জুন) দুপুরে তিনি বলেন, সকাল থেকে মুষলধারে বৃষ্টি। তারপরও কোরবানি উপলক্ষে মোটমুটি বিক্রি হচ্ছে। চুইঝাল সারা বছর ভালোই বিক্রি হয়। বাগেরহাটসহ খুলনাঞ্চলের অন্যতম বিখ্যাত মসলা চুইঝাল। বছরের প্রায় সব সময় আমরা চুইঝাল বিক্রি করি। কোরবানির সময় মাংস রান্না বাড়ে। মাংসের সাদ বাড়াতে মানুষ চুইঝাল বেশি কেনে। ফলে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় চুইঝালের দাম কিছুটা বেড়েছে।
আবুল কালাম জানান, আগে যে চুইঝাল চিকন (আকারে ছোট) ৪০০ থেকে ৬০০ টাকায় ও কিছুটা বড় ৮০০ টাকা কেজি বিক্রি করতেন, কোরবানি উপলক্ষে বাজারে চাহিদা বাড়ায় এখন পাইকারী দামই তার থেকে বেশি। তাই চুইঝালের আকারভেদে কেজিপ্রতি ৮০০ থেকে দেড় হাজার টাকায় বিক্রি করছেন। স্বাভাবিকভাবে এক কেজি মাংসে ১০০ গ্রাম চুইঝাল দেওয়া হয়। অনেকে ১৫০ গ্রামও ব্যবহার করেন।
সদর উপজেলার যাত্রাপুর এলাকার চুইঝাল চাষি নজরুল ইসলাম বলেন, পরিণত চুইঝাল সংগ্রহ করতে হলে গাছ কেটে সংগ্রহ করতে হয়। একটি গাছ বড় হতে ছয় মাস থেকে বছরখানিক সময় লাগে। সেজন্য চুইঝালের দাম কিছুটা বেশি। কোরবানি উপলক্ষে চুইঝালের চাহিদা বেড়েছে, পরিণত গাছের পরিমাণ কম থাকায় দাম কিছুটা বেড়েছে।
ব্যবসায়ী নাজমুল হাসান জানান, সাধারণত দৈনিক ৫ থেকে ১০ কেজি চুইঝাল বিক্রি হয়। কিন্ত ঈদের সময় দৈনিক প্রায় ২০ থেকে ৩০ কেজি বিক্রি হয়। চাষি ও গৃহস্থদের কাছ থেকে তারা চুইঝাল কেনেন। চাহিদা বাড়লে অপরিপক্ক গাছ কেটে দাম কিছুটা বাড়িয়ে দেন পাইকাররা। তার প্রভাবেই ঈদের সময় চুইঝালের দাম সামান্য বৃদ্ধি পায়।
চুইঝাল ক্রেতা ইমন শেখ বলেন, চুইঝাল ছাড়া গরুর মাংস পূর্ণতা পায় না। তাই ঈদের দিন গরুর মাংস রান্নার জন্য ৩৬০ টাকায় ৩০০ গ্রাম চুইঝাল কিনেছেন।
সাগর আহমেদ নামের এক ক্রেতা বলেন, ‘আমরা শুধু গরুর মাংস না, সব ধরনের মাংস ও মজাদার খাবারে সাথেই চুইঝাল খাই। কোরবানি উপলক্ষে দাম কিছুটা বেড়েছে। ভিড় এড়াতে আগেভাগেই চুইঝাল কিনতে এসেছি।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, কোরবানির সময় চুইঝালের কদর বেড়ে যায়। গত বছরের চেয়ে এবার ৫ হেক্টর বেড়ে জেলায় ২০ হেক্টর জমিতে চুইঝাল চাষ হয়েছে। উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৪০ টন, যার বাজারমূল্য দুই কোটি টাকার বেশি। ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিকভাবে বাগেরহাটে দিনদিন চুইঝালের চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে।