ঠাকুরগাঁও সংবাদদাতা
প্রকাশ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১৭:৩০ পিএম
আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২ ২১:১২ পিএম
পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় ভয়াবহ নৌকাডুবিতে ৬৯ জনের মৃত্যুতে হিন্দুপল্লিগুলোতে চলছে শোকের মাতম। কিছুতেই থামছে না মৃতের স্বজনদের আহাজারি। ছবি: প্রবা
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজার বাকি আর মাত্র এক দিন। ইতোমধ্যে সারা দেশে প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। উৎসবে মেতে উঠতে এখন শুধু অপেক্ষা মাত্র। পূজার আনন্দে মাততে দেশবাসী যখন অপেক্ষা করছে; তখন বিষাদ ভর করেছে পঞ্চগড়ের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে।
জেলার বোদা উপজেলায় ভয়াবহ নৌকাডুবিতে ৬৯ জনের মৃত্যুতে স্থানীয় হিন্দুপল্লিগুলোতে চলছে শোকের মাতম। মণ্ডপের আঙিনায় আল্পনা আঁকার পরিবর্তে মৃতের স্বজনদের কপালে আঁকতে হচ্ছে চন্দনের ফোঁটা।
দেবী দুর্গাকে আমন্ত্রণ জানাতে মহালয়ার দিন বড়শশী ইউনিয়নের বোদেশ্বরী মন্দিরে দুর্গার আবাহন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়ে এ নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। নৌকায় ওঠে দেড় শতাধিক মানুষ। এতেই ঘটে বিপত্তি। ৬৯ জনের মৃত্যুর পাশাপাশি নিখোঁজ রয়েছে আরও তিনজন।
ভয়াবহ এ দুর্ঘটনায় বড়শশী ইউনিয়নের মণ্ডপগুলোতে নেই ঢাকের বাড়ি, শাঁখের আওয়াজ। নেই গৃহিণীর উলুধ্বনি। আছে কেবল শোকস্তব্ধ স্বজনের গুমরে ওঠা আর কান্নার শব্দ। কেউ কেউ এখনও ছুটে বেড়াচ্ছেন স্বজনের খোঁজে। স্বজন ও প্রতিবেশীদের এমন করুণ বিদায়ে বিষাদে মলিন সবার মুখ। তাই ঝলমলে মণ্ডপগুলোতে ফিকে হয়ে গেছে উৎসবের রঙ।
বাবা আর ছোট দুই বোনসহ মোট ৫ স্বজন হারিয়ে নির্বাক বিমলা রাণী। চোখে-মুখে আতঙ্ক। হারান স্বজনদের; এখনও খুঁজে ফিরছেন তিনি। চোখ বন্ধ করলেই বাবা আর ছোট দুই বোনের চেহারা ভেসে ওঠে, বলেন তিনি। মহালয়ার দিন ভয়াবহ নৌকাডুবিতে সবাই ডুবে গেছে। ভগ্নিপতি আর বেয়াইয়ের একই পরিণতি হয়েছে। এদের মধ্যে চারজনের মরদেহ উদ্ধার হলেও এখনও বাবাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাকে খুঁজতে করতোয়া তীরে এ ঘাট থেকে ও ঘাট ছুটছি। পরিবারের বাকি সদস্যরাও বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করছেন।

সাকোয়া কলেজপাড়ার বাসিন্দা অশেষ বলেন, হিন্দুগ্রামগুলোতে এমন কোনো পরিবার পাওয়া যাবে না, যাদের আপনজন এ দুর্ঘটনায় মারা যায়নি। স্বজনদের মরদেহ দাহ করার পর মনে কি আর কোনো আনন্দ থাকে? দেবীর আরতির ধূপের বদলে আমরা এখন স্বজন ও প্রতিবেশীদের চিতা জ্বালাচ্ছি। কোনো কোনো পরিবার ৩-৪ জনকে হারিয়েছে। পাঁচ দিন ধরে নিহতদের বাড়িতে চুলো জ্বলছে না।
স্থানীয় বাসিন্দা অনুকুল বলেন, এইটা আমাদের সব থেকে বড় উৎসব। এ উৎসবে আমাদের আনন্দের সীমা থাকে না। কিন্তু এত মানুষকে হারিয়ে এই উৎসবে কীভাবে আনন্দ করব।’
ডুবে যাওয়া নৌকার যাত্রী ছিলেন বোদা উপজেলার ময়দানদিঘি এলাকার হিমালয় ও তার স্ত্রী। স্ত্রী কোনোমতে বেঁচে ফিরলেও গতকাল মরদেহ পাওয়া যায় হিমালয়ের। তাকে খুঁজতে নদীপাড়ে বোন নীতি রানীর চোখের জল কাঁদিয়েছে সবাইকে। তিনি বলেন, আমি আজ ভাইকে না নিয়ে যাব না, আমার ভাই কই, তাকে ছাড়া আমি আজ যাব না।
পরে অবশ্য ভাইকে পেয়েছিন তিনি, তবে জীবিত নয়, মৃত।
এর আগে কয়েকবার ঘটনাস্থলে আসেন রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন। তিনি বলেন, নৌকাডুবির ঘটনা পঞ্চগড়ের মানুষ কখনও দেখেনি। এখানে প্রশাসনের গাফিলতি ছিল। আমাদের লোকও দেখেনি, ঘাটের লোকও দেখেনি। এটা একটা অবহেলার কারণ হিসেবে আমি দেখছি। ঘাটে যারা দায়িত্বে ছিল, তারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেনি।
প্রবা/আরএম/ এমআই