নুপা আলম, কক্সবাজার
প্রকাশ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১০:৫৩ এএম
আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১৩:১০ পিএম
রামু ট্র্যাজেডির ১০ বছর আজ। ছবি : সংগৃহীত
১০ বছরেও বিচার হয়নি কক্সবাজারের রামু ট্র্যাজেডির। তদন্তে নানা অনিয়ম-গাফিলতির কারণে বিচার হচ্ছে না বলে মনে করেন সেখানকার বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজন। বিচার নিয়ে হতাশ হলেও তারা চান এলাকায় শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় থাকুক। রামু কেন্দ্রীয় বিহারের আবাসিক ভিক্ষু প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু বলেছেন, বিচারের নামে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করা জরুরি। এটা করতে গিয়ে নিরপরাধ কেউ হয়রানির শিকার হোক তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। অপর দিকে সরকারপক্ষের আইনজীবী ফরিদুল আলম মনে করেন, সাক্ষীরা সময়মতো সাক্ষ্য দিলে বিচারে দেরি হতো না।
২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি গুজবকে কেন্দ্র করে রামুতে সংঘটিত হয় ভয়াবহ ঘটনা। রাতের অন্ধকারে রামুতে ১২টি বৌদ্ধবিহার, ৩০টি বসতঘরে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও আগুন ধরিয়ে দেয় দুষ্কৃতকারীরা। পরের দিন ৩০ সেপ্টেম্বর রাতে একইভাবে উখিয়া ও টেকনাফে আরও সাতটি বৌদ্ধবিহার, ১১টি বসতঘরে হামলা ও আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। সেই আগুনে ছাই হয়ে যায় রামুর হাজার বছরের পুরাতাত্ত্বিক মন্দিরের নিদর্শন। ধর্মীয় উগ্রবাদীদের দেওয়া আগুনের ভেতর থেকে ভারী হয়ে উঠেছিল বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষের আর্তনাদ।
ওই ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে ৩৭৫ জনের নামে এবং অজ্ঞাত আরও ১৫-১৬ হাজার জনকে আসামি করে ১৮টি মামলা করে। তদন্ত শেষে এসব মামলায় এক হাজারের বেশি মানুষকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেয় পুলিশ। কিন্তু ১০ বছর পার হলেও এখন পর্যন্ত একটি মামলারও বিচারকাজ শেষ হয়নি। এ অবস্থায় বিচার নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতারা। তারা বলেছেন, এখন বিচারের নামে নিরপরাধ কোনো ব্যক্তি হয়রানি হোক তা চান না তারা। তারা চান শান্তি ও সম্প্রীতি।
বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতা কেতন বড়ুয়া জানান, ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা থেকে রামুতে মিছিল, মিটিং হয়েছে। অনেককেই চেনা গেছে। কিন্তু মামলার পরবর্তী যে প্রক্রিয়া তাতে অনেক চিহ্নিত ব্যক্তি যেমন বাদ পড়েছে, তেমনি নিরপরাধ অনেকেই হয়রানির শিকার হয়েছে। বৌদ্ধ ধর্ম শান্তির ধর্ম। এখন সকলেই শান্তি চায়। যে সম্প্রীতিতে রামুবাসী বসবাস করছে, তা যেন রক্ষা হয়।
বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতা বিপুল বড়ুয়াও বলেছেন একই কথা। তিনি বলেন, ‘ঘটনার ১০ বছরে এসে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষ ভুলতে বসেছে ভয়াবহ সেই ঘটনা। পুড়িয়ে দেওয়া বিহার নান্দনিকভাবে নির্মাণ করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এখন শান্তিতে আছি, সম্প্রীতিতে আছি। এর চেয়ে বেশি পাওয়ার নেই।’
কক্সবাজার জেলা বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি ও রামু কেন্দ্রীয় সীমাবিহারের আবাসিক ভিক্ষু প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু জানান, আলোচিত এ হামলার ঘটনায় এলাকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে যে সংকট তৈরি হয়েছিল তা অনেকটা কেটে গেছে। এর ধারাবাহিকতা রক্ষা করা জরুরি। একই সঙ্গে বিচারের নামে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করা জরুরি। এটা করতে গিয়ে নিরপরাধ কেউ হয়রানির শিকার হোক তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। মামলা প্রসঙ্গে কক্সবাজার জেলা দায়রা ও জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ফরিদুল আলম জানান, ওই ঘটনায় মামলা হয়েছিল ১৯টি। এর মধ্যে পুলিশ বাদী হয়ে ১৮টি মামলা করে। অপর মামলাটি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তি করলেও পরবর্তী সময়ে বিবাদীদের সঙ্গে আপস করে মামলা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। বিচারাধীন ১৮টি মামলায় সাক্ষী না পাওয়ায় বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে দীর্ঘসূত্রতা।
রাষ্ট্রপক্ষের এই আইন কর্মকর্তা বলেন, মামলায় কোনোভাবেই সাক্ষীরা আদালতে এসে সাক্ষ্য দিতে রাজি হচ্ছেন না। ফলে মামলা নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রকট হচ্ছে। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতারাও সাক্ষ্য দিতে বা হাজির হওয়ার ক্ষেত্রে আগ্রহী হচ্ছেন না।
এদিকে যার ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে ঘটনার সূত্রপাত, সেই উত্তম বড়ুয়ার আজও কোনো খোঁজ জানেন না তার বাবা-মা। এমনকি উত্তম বড়ুয়ার স্ত্রী-সন্তান কোথায় আছেন, তার তথ্যও দিতে পারেননি স্থানীয় কেউ। উত্তম বড়ুয়ার বাবা সুদত্ত বড়ুয়া বলেন, পরিবারের উপার্জনক্ষম একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে অর্থকষ্টে চরম দুরবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন তারা। ছেলের সঙ্গে কোনোভাবেই এ পর্যন্ত তাদের কোনো যোগাযোগ হয়নি। তবে বিভিন্ন মাধ্যমে জেনেছেন উত্তম বেঁচে আছে। তিনি আরও বলেন, ছেলে দেশে কি বিদেশ আছে তা জানি না। মৃত্যুর আগে অন্তত ছেলের মুখটি দেখতে চাই।
উত্তমের মা মাধু বড়ুয়া বলেন, ১০ বছর আগে সংঘটিত ঘটনাটিতে উত্তম কোনোভাবেই জড়িত না। উত্তমকে ফিরিয়ে আনা হলে প্রকৃত সত্য জানা যাবে। ছেলেকে ফিরিয়ে আনার দাবি মায়ের।
রামুর হাইটুপীপাড়ায় উত্তমের বাবা ও মায়ের সঙ্গে আলাপ হলেও ওখানে পাওয়া যায়নি উত্তমের স্ত্রী রিতা বড়ুয়া ও ১৪ বছরের সন্তান আধিত্র বড়ুয়াকে। সুদত্ত বড়ুয়া ও মাধু বড়ুয়া জানান, তাদের পুত্রবধূ নাতিকে নিয়ে সীমাবিহার-সংলগ্ন ভাড়া বাসায় থাকে। তবে ওখানে গিয়ে পাওয়া যায়নি রীতা বড়ুয়াকে। তিনি কোথায় সে তথ্যও দিতে রাজি নন কেউ।
প্রবা/এনএস/এমজে