সিলেট অফিস
প্রকাশ : ২৩ জুন ২০২৩ ২১:২১ পিএম
আপডেট : ২৩ জুন ২০২৩ ২১:৫২ পিএম
সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনের স্বতন্ত্র মেয়রপ্রার্থী মো. শাহ জাহান মিয়া। প্রবা ফটো
সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) নির্বাচন শেষ হলেও তার আমেজ এখনও রয়ে গেছে। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়রপ্রার্থী বড় ব্যবধানে জয়ী হলেও আলোচনায় রয়েছেন স্বতন্ত্র মেয়রপ্রার্থী মো. শাহ জাহান মিয়া। আট মেয়রপ্রার্থীর মধ্যে যেখানে পাঁচজন জামানত হারিয়েছেন, সেখানে তিনি তৃতীয় হয়ে চমক সৃষ্টি করেছেন। তারচেয়েও বড় কথা, আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জাকের পার্টির প্রার্থীদের ভিড়ে তিনি ২৯ হাজার ৬৮৮ ভোট পেয়ে সবাইকে বিস্মিত করেছেন। কোনো পোস্টার-ব্যানার ছাড়া একা সাইকেল চালিয়ে লিফলেট বিলি করে শাহ জাহানের বিপুল ভোট পাওয়ার গল্প এখন নগরবাসীর মুখে মুখে।
নগরীর ঘাসিটুলা মজুমদারপাড়া এলাকায় সাড়ে তিন হাজার টাকা ভাড়ায় বস্তি সদৃশ্য দুই কক্ষের আধাপাকা ঘরে শাহ জাহান মিয়ার তিন সদস্যের পরিবারের বাস। সব দিকে দারিদ্র্যের চিহ্ন বহন করা ঘরে আসবাবপত্র বলতে একখানা বিছানা, জীর্ণ আলনা, ভাঙা সোফা আর সেলাই মেশিন। বুধবার (২১ জুন) সিসিক নির্বাচনে অভাবনীয় সাফল্যের পর মেয়রপ্রার্থী শাহ জাহানের ঘরে নানা শ্রেণির মানুষের ভিড় লেগে আছে। এত দিন প্রতিবেশীদের কাছে ‘শাহজাহান মাস্টার’ হিসেবে পরিচিত শাহ জাহান এখন পুরো নগরবাসীর কাছে অন্যতম আলোচিত চরিত্র। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে তাকে এক নজর দেখার জন্য তার বাসায় উৎসাহী মানুষের ভিড় লেগে ছিল।
২০০২ সালে অভাবের তাড়নায় ময়মনসিংহ থেকে সিলেটে আসেন কিশোর শাহ জাহান। প্রথমে নগরীর কানিশাইল এলাকার একটি ছাপড়া রেস্টুরেন্টে ‘গ্লাস বয়ের’ কাজ নেন। রেস্টুরেন্টের গ্লাস ধোঁয়া-মোছার কাজ করতেন। এরপর নগরীর প্রায় ৮০টির মতো রেস্টুরেন্টে কাজ করেছেন বলে জানান শাহ জাহান। কিছু দিন মোমবাতির কারখানায়ও কাজ করেছেন তিনি।
রেস্টুরেন্ট ও কারখানায় কাজের সুবাদে বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে তার পরিচয় ও সখ্যতা হয়—এ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘শ্রমিক শ্রেণির মানুষের সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক রয়েছে, তারাও আমাকে পছন্দ করে।’ সদ্যসমাপ্ত সিসিক নির্বাচনে শ্রমজীবী মানুষেরাই তাকে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করেছেন বলে জানান তিনি।
জীবিকার প্রয়োজনে কিশোর বেলা থেকে রেস্টুরেন্টে কাজ করলেও পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ ছিল শাহ জাহানের। তাই কাজের পাশাপাশি নগরীর চৌহাট্টায় সিসিক পরিচালিত ভোলানন্দ নৈশ উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন তিনি। দিনে কাজ ও রাতে পড়াশোনা করতে থাকেন। এরই ধারাবাহিকতায় ময়মনসিংহ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেন। ২০১৮ সালে নগরীর ঐতিহ্যবাহী মদন মোহন কলেজ থেকে স্নাতক পাস করেন অদম্য এই তরুণ। পড়াশোনা করে জীবনে বড় কিছুর স্বপ্ন দেখেছিলেন।
নগরবাসী ও গণমাধ্যম যখন সিসিক নির্বাচনের ‘হেভিওয়েট’ প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত, তখন মেয়রপ্রার্থী শাহ জাহান সকাল হলেই বেরিয়ে পড়তেন নিজের বাইসাইকেল নিয়ে। আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় তার পক্ষে মাইকিং করা, পোস্টার-ব্যানার সাঁটানোর সুযোগ ছিল না। প্রতিদিন ‘শ্রমিক বন্ধুদের’ টাকায় ছাপানো লিফলেট বিতরণ করতেন। জনগণের সেবা করার ইচ্ছে থেকে নিঃসঙ্গ প্রচারে ছুটে যেতেন শ্রমজীবী মানুষের কাছেই।
নির্বাচনী প্রচারের বিষয়ে শাহ জাহান বলেন, ’সকালে সাইকেল নিয়ে বের হয়ে সন্ধ্যায় ফিরতাম। প্রায় সব রেস্টুরেন্টের শ্রমিক ভাইয়েরাই পরিচিত, তারা খাওয়াতেনও।’
শাহ জাহান বলেন, ’নির্বাচনে আমার পকেট থেকে সবমিলিয়ে ২-৩ হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছে। বাকি টাকা মানুষজন দিয়েছেন।’ বর্তমানে স্থায়ী কোনো পেশায় নেই উল্লেখ করে তিনি জানান, যখন যা পান তাই করেন। বিভিন্ন কোম্পানির ওষুধ সাপ্লাই করেন। একসময় নিজের ছোট্ট ফার্মেসি থাকলেও এখন নেই।
নিজের পরিবার চালাতে গলদঘর্ম হলেও মানুষের সেবায় সব সময় নিবেদিত শাহ জাহান। নগরীর কানিশাইল এলাকায় সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে ফ্রি চিকিৎসাকেন্দ্র খুলে গরিব-শ্রমজীবীদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েছেন। করোনার সময় ২০০ মানুষকে খাদ্য সহায়তা দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
‘শাহ জাহান মাস্টার’ পরিচয় প্রসঙ্গে তিনি জানান, সীমান্তবর্তী গোয়াইনঘাট উপজেলার একটি আধা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কিছু দিন শিক্ষকতা করেছেন। এ ছাড়া কানিশাইল এলাকায় গরিব শিশুদের ফ্রি পড়িয়েছেন। তাই সবাই শাহ জাহান মাস্টার ডাকে।
বিপুল ভোট পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মানুষ মায়া থেকে ভালোবেসে ভোট দিয়েছেন। তারা আমাকে পছন্দ করেছেন। এই ঋণ শোধ হওয়ার নয়। একা মানুষ। সবার কাছে যেতে পারিনি। না হলে আরও বেশি ভোট পেতাম।’
গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-১ (সদর) আসনে সংসদ সদস্য পদে মনোনয়নপত্র কিনেছিলেন শাহ জাহান। তিনি বলেন, ’সেবার মনোনয়নপত্র জমা দিইনি। স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে হলে নির্বাচন কমিশনে মনোনয়পত্রের সঙ্গে এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর জমা দিতে হয়। কিন্তু তখন তা জোগাড় করতে পারিনি।’
শাহ জাহান বলেন, ’ছোটবেলায় স্বপ্ন ছিল জনপ্রতিনিধি হওয়ার। ছোটবেলায় পড়ালেখার খাতা কলম কিনতে পারিনি। তাই মানুষের সেবা করার ইচ্ছা আমার সব সময়ের। এ কারণে নির্বাচনে প্রার্থী হই।’ জনসমর্থন থাকলে আগামীতেও নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ রয়েছে বলে জানান শাহ জাহান মিয়া।