অভয়নগর (যশোর) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২২ জুন ২০২৩ ০৮:৫০ এএম
আপডেট : ২২ জুন ২০২৩ ০৮:৫১ এএম
যশোরের অভয়নগরে ৯টি কিশোর-কিশোরী ক্লাবের বরাদ্দ নিয়ে রয়েছে নানা অনিয়মের অভিযোগ। প্রবা ফটো
কিশোর-কিশোরীদের সাংস্কৃতিক বিকাশ, বাল্যবিবাহ রোধ, গান-আবৃত্তি ও কারাতে শেখানোর জন্য ২০১৮ সালে মহিলা অধিদপ্তর একটি প্রকল্প নেয়। সে অনুযায়ী যশোরের অভয়নগর উপজেলার ৮টি ইউনিয়নে একটি করে এবং পৌরসভায় একটিসহ ৯টি ক্লাব স্থাপন করা হয়।
সম্প্রতি পাঁচটি ক্লাব ঘুরে নানা অনিয়মের চিত্র পাওয়া গেছে। উপজেলার ২৭০ জন কিশোর-কিশোরীর জন্য বরাদ্দ নাশতা তারা পুরোপুরি পায় না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিটি ইউনিয়ন ও পৌরসভার একটি স্কুলে সপ্তাহে শুক্র ও শনিবার ৩০ জন কিশোর-কিশোরীকে এই ক্লাবে সাংস্কৃতিক নানা বিষয় শেখানোর কথা। প্রতিটি ক্লাবের জন্য একটি হারমোনিয়াম, তবলা, ক্যারম, লুডু, দাবাসহ ৫ হাজার টাকার বই ও সাময়িকী দেওয়া হয়। গান-আবৃত্তি শেখানোর জন্য আছে দৈনিক ভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক।
উপজেলার দায়িত্বে রয়েছেন একজন ফিল্ড সুপারভাইজার। ক্লাব পরিচালনার জন্য রয়েছে ১৩ সদস্যের ক্লাব ব্যবস্থাপনা কমিটি (সিএমসি)। তাদের সম্মানী এবং কমিউনিটি সভার জন্য রয়েছে আলাদা বরাদ্দ। কিন্তু উপজেলার পাঁচটি ক্লাব ঘুরে কোথাও সদস্যদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি চোখে পড়েনি।
কিশোর-কিশোরীদের দেওয়া নাশতাও স্বাস্থ্যকর নয়। তাদের দেওয়া হয় না স্যানেটারি টাওয়েল। ক্লাব ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যরা তাদের সম্মানী নিলেও কমিউনিটি সভা হয় না। ক্লাব সমন্বয়কারী হিসেবে নারী ইউপি সদস্য বা পৌরসভার কাউন্সিলরদের রাখা হয়েছে। তবে তারা ক্লাবে কখনও আসেন না। শুধু স্বাক্ষর দিয়ে ২ হাজার টাকা সম্মানী তুলে নিয়ে যান। এখন সম্মানী বন্ধ থাকায় তারা আর আসেন না।
প্রতিটি ক্লাবে ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সি ২০ কিশোরী, ১০ কিশোরসহ মোট ৩০ জনকে সদস্য করা হয়। প্রতিটি ক্লাবে একজন গানের শিক্ষক, একজন আবৃত্তির শিক্ষক থাকবেন। এ ছাড়া প্রতি উপজেলায় দুজন জেন্ডার প্রমোটার, একজন কারাতে প্রশিক্ষক থাকবেন। তদারকির জন্য থাকবেন একজন ফিল্ড সুপারভাইজার। প্রতি ক্লাবে ৩৫ জনের জনপ্রতি ৩০ টাকা করে ১ হাজার ৫০ টাকার নাশতা বরাদ্দ হয়।
প্রকল্প কার্যক্রম অনুসারে, পুষ্টির চাহিদা বিবেচনায় নাশতায় সেদ্ধ ডিমের সঙ্গে কেক, বাটার বন, মৌসুমি ফল, মিষ্টি, দইসহ যেকোনো একটা কিছু থাকার কথা। সম্প্রতি বাঘুটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, আবৃত্তির ক্লাসে ১২ জন কিশোর-কিশোরী উপস্থিত। নাশতা রয়েছে একটি ড্রাইকেক, একটি জুস ও একটি বিস্কুট। বরাদ্দ দেওয়া নাশতার সঙ্গে এর কোনো মিলই নেই। আরও দেখা গেছে, যারা অনুপস্থিত তাদের নাশতা রেখে দেওয়া হয়েছে, পরের ক্লাসে দেওয়ার জন্য।
কিশোরী পূজা পাল বলে, ‘নাশতায় কোনোদিন ডিম বা ফল পাইনি। ক্লাসের বিষয়ে সে বলে, এ পর্যন্ত মাত্র এক দিন কারাতে ক্লাস হয়েছে। জেন্ডার ক্লাস দুই-তিন দিন হয়েছে। তবে গান ও আবৃত্তির ক্লাস নিয়মিত হয়। নাশতার বিষয়ে আবৃত্তির শিক্ষক রহিমা খাতুন বলেন, ‘মাসে একবার উপজেলায় গিয়ে আমাদের এক মাসের নাশতা আনতে হয়। প্রতি ক্লাসে কী পরিমাণ নাশতা থেকে গেল, তা জেন্ডার প্রমোটারকে জানাতে হয়। পরের মাসে সেটা তিনি সমন্বয় করেন।
গত ১৪ এপ্রিল সুন্দলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে জানা যায়, চার মাসে ওই ক্লাবেও কারাতে প্রশিক্ষক এক দিন এসেছেন। জেন্ডার প্রমোটার এক দিন এসেছেন। ক্লাবের সদস্যরা তাকে চেনে না। বিদ্যালয়ে উপস্থিত আটজন কিশোর-কিশোরীর মধ্যে দুজন দুটি নুডলস দেখিয়ে বলে, ৯ জনকে এই নুডলস দেওয়া হয়েছে। এর মেয়াদ গত ফেব্রুয়ারি মাসে শেষ হয়েছে। এজন্য তারা নুডলস খায়নি।
এ বিষয়ে ক্লাবে উপস্থিত আবৃত্তির শিক্ষক লিজু ইয়াসমিন বলেন, এপ্রিল মাসে নাশতার তালিকায় নুডলস ছিল না। কীভাবে মেয়াদোত্তীর্ণ এই নুডলস কিশোর-কিশোরীদের কাছে গেল তা তিনি বুঝতে পারছেন না। জেন্ডার প্রমোটার ইমা রায় বলেন, ‘উপজেলা অফিস আমাকে যেভাবে বলে সেভাবে আমি নাশতা সরবরাহ করি। তবে আমি ঠিকমতো ক্লাস করি।’ক্লাবের কারাতে প্রশিক্ষক মো. হায়দার আলী বলেন, তিনি নিয়মিত শেখান। গত এপ্রিল মাসে তিনি ক্লাবে গিয়েছেন। পরে তাকে প্রশিক্ষণ বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে, এজন্য তিনি আর ক্লাবে যাচ্ছেন না।
ক্লাব সমন্বয়কারী সুন্দলী ইউনিয়ন পরিষদের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্যা সুবর্ণা বিশ্বাস বলেন, ‘আমি ইউপি সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর একবার ক্লাব ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় উপস্থিত ছিলাম। পরে উপজেলা মহিলাবিষয়ক অফিস থেকে যেতে নিষেধ করা হয়। তাই আমি আর যাই না।’
অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা ফিল্ড সুপারভাইজার মিতা মণ্ডল বলেন, ‘আমার যানবাহন নেই, জ্বালানি নেই। এজন্য সব সময় ফিল্ড ভিজিটে যাওয়া সম্ভব হয় না। তবে আমি নিয়মিত ই-ভিজিট করে থাকি।’
প্রতিটি ক্লাব এলাকায় বছরে দুটি সিএমসির সভা হওয়ার কথা। প্রতিটি ক্লাবে সিএমসি সদস্যদের সম্মানী ও সভার ব্যয় হিসেবে ৩ হাজার ৬০০ টাকা বরাদ্দ আছে। সভা না হলেও এই বরাদ্দ কোথায় যায়- এমন প্রশ্নে উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা রাজকুমার পাল বলেন, এখন বরাদ্দ ৩০ টাকা। কিশোর-কিশোরীদের ২২ টাকার নাশতা দেওয়া হয়। বাকি টাকা কী করা হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, কিছু খরচ আছে। বাকি টাকা দিয়ে সেগুলো মেটানো হয়।
যশোর জেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ের উপপরিচালক আনিছুর রহমান বলেন, এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।