নাঈম ইসলাম, শেরপুর
প্রকাশ : ২১ জুন ২০২৩ ১৬:২৪ পিএম
আপডেট : ২২ জুন ২০২৩ ০০:৩২ এএম
বকশীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শাহিনা বেগম।
জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলায় সাংবাদিক গোলাম রাব্বানী নাদিম হত্যাকাণ্ড নিয়ে বেরিয়ে আসছে একের পর চাঞ্চল্যকর তথ্য। ঘুরে ফিরে আলোচনায় আসছে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সম্পৃক্ততার বিষয়। এ ঘটনায় ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও উপজেলার সাধুরপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান (সাময়িক বরখাস্ত) মাহমুদুল আলম বাবু। বাবুকে গ্রেপ্তারের পর র্যাব দাবি করেছে, তার পরিকল্পনাতে নাদিমকে হত্যা করা হয়। এরপরই আলোচনায় এসেছে হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড কে? নাদিমের মেয়ে রাব্বিলাতুল জান্নাত অভিযোগ করেছেন, বকশীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শাহিনা বেগমের নির্দেশে তার বাবাকে হত্যা করা হয়েছে।
যদিও বিষয়টিকে প্রতিহিংসা হিসেবে দাবি করেছেন শাহিনা বেগম। তবে নাদিম হত্যাকাণ্ডে বিচারের জন্য আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সোচ্চার হতে নির্দেশ দিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ।
সম্প্রতি শাহিনা বেগমকে দায়ী করে মানববন্ধনে একটি বক্তব্য দিয়েছেন নাদিমের মেয়ে রাব্বিলাতুল জান্নাত। বক্তব্যের একটি ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘বকশীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি (শাহিনা বেগম) রাজাকারের সন্তান। রাজাকারের কন্যা শিরোনামে তাকে নিয়ে আমার বাবা একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। এর কিছু দিন পরেই আমার বাবার ওপর হামলা হয়। সে হামলার পরও আমার পরিবার নিরাপত্তা পায়নি। আমার বাবা তখন একটি জিডি (সাধারণ ডায়েরি) করেছিলেন। তার জের ধরেই শাহিনা বেগমের নির্দেশে বাবু চেয়ারম্যান ও তার লোকজন আমার বাবাকে হত্যা করেছে।’
ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে নানা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। প্রতিবাদ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে নাদিমের স্বজন ও স্থানীয়দের মাঝে। আওয়ামী লীগের একাধিক নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা হলে তারা এই হত্যার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছেন। তবে কেউই বিষয়টি নিয়ে নিজের পরিচয় প্রকাশ করে কথা বলতে চাচ্ছেন না।
নাদিমের মেয়ের বক্তব্যের বিষয়ে জানতে শাহিনা বেগমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে আমাকে এ ঘটনার সঙ্গে জড়ানো হচ্ছে। একটা শ্রেণি ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছে। আমার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।’
নাদিমের ছেলে আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘শুরু থেকেই আমরা বলে যাচ্ছি, হত্যাকাণ্ডে একজন মাস্টারমাইন্ড আছে। তাকে আইনের আওতায় আনা দরকার। নিরাপত্তাহীনতার কারণে আমরা তার নাম বলতে পারছি না। পুলিশের এসব অনুসন্ধান করা দরকার।’
নাদিমের স্ত্রী মনিরা বেগম বলেন, ‘কয়েকজন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের ভালোভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করলে মাস্টারমাইন্ডের তথ্য পাওয়া যাবে। অন্তরালে যারা আছে, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।’
শাহিনা বেগমের নাম আলোচনায় আসার পর বকশীগঞ্জ উপজেলা ও জেলা ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের কেউ কেউ কথা বললেও নাম প্রকাশ করতে অপারগতা জানান। তা ছাড়া জেলা পর্যায়ের অন্তত ১০ জন নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তারা কেউই বিষয়টি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
উপজেলা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক রাজন মিয়া বলেন, ‘নাদিমকে থামাতে যত কিছু করা দরকার, তারা সব করেছে। সফল হয়নি। অবশেষে তাকে সরিয়ে (হত্যা) দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং সেটিই তারা করেছে।’
আওয়ামী লীগের রাজনীতির সম্পৃক্ত মজিবুর রহমান বলেন, ‘বকশীগঞ্জ শহর থেকে সাধুরপাড়া ইউনিয়ন অনেক দূরে। এত দূর থেকে এসে নাদিমকে হত্যা করা হলো। তাও বাড়ির কাছে! শেল্টার না থাকলে এটা সম্ভব নয়। বাবু চেয়ারম্যানকে শাহিনা বেগম শেল্টার দিয়েছেন। তার শেল্টার ছাড়া বাবু চেয়ারম্যান এ সাহস পাবে বলে মনে হয় না।’
হত্যাকাণ্ড নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মুহাম্মদ বাকী বিল্লাহ ও সাধারণ সম্পাদক বাবু বিজন কুমার চন্দ।
জানতে চাইলে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বাকী বিল্লাহ বলেন, ‘এ রকম কোনো ভিডিও দেখিনি, এমন কিছু শুনিনি। এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারব না। তবে যারাই সম্পৃক্ত থাকুক, তাদের আইনের আওতায় আনা হোক।’
বাবু বিজন কুমার চন্দ বলেন, ‘বকশীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের দুটা পার্ট (গ্রুপিং) আছে। জেলা কমিটি থেকে আমাদের সিদ্ধান্ত হলো, যার নামই বেরিয়ে আসুক তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। কাউকে যেন ছাড় দেওয়া না হয়।’
জামালপুর-১ (দেওয়ানগঞ্জ-বকশীগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদও নাদিম হত্যার সঠিক বিচার দাবি করেছেন। এজন্য স্থানীয় নেতাকর্মীদের সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। সংসদ সদস্য আজাদ বলেছেন, নাদিম হত্যার বিচারের জন্য সবাইকে সোচ্চার হতে হবে। অন্যরা দেখে যেন শিক্ষা নেয়, এ ধরনের কাজ করে রেহাই পাওয়া যাবে না। সেজন্য সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, নাদিম হত্যা করে যে অন্যায় করা হয়েছে, এর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হতে হবে। তাহলে এমন কিছু কেউ করতে গেলে অন্তত দশবার ভেবেচিন্তে করবে। সাংবাদিক আঘাত করার কেউ যেন সাহস না পায়। এমন কিছু করার আগে যেকোনো প্রভাবশালী ব্যক্তিকে যেন ভাবতে হয়, আমি কি রেহাই পাব?
সার্বিক বিষয়ে জামালপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও তদন্ত) সীমা রানী সরকার বলেন, ‘ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার হওয়া ১৩ জনকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। পাশাপাশি পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। হত্যায় জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’
মোটরসাইকেলে বাসায় ফেরার পথে ১৪ জুন (বুধবার) রাত ১০টার দিকে বকশীগঞ্জ পৌর শহরের পাটহাটি মোড় এলাকায় সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হন নাদিম। ঘটনাস্থলের সিসিটিভির ফুটেজেও দেখা যায়, চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে পেটাতে পেটাতে সিসিটিভির আওতার বাইরে নিয়ে যায় একদল সন্ত্রাসী। এরপর তাকে বেধড়ক মারধর করে ফেলে রেখে যায়।
তাকে প্রথমে বকশীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখান থেকে রাতেই জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়। পরদিন সকালে উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুপুরে মারা যান নাদিম।