চয়ন চৌধুরী, সিলেট
প্রকাশ : ২০ জুন ২০২৩ ১৯:৫৮ পিএম
আপডেট : ২১ জুন ২০২৩ ০০:৫০ এএম
সিলেট সিটি করপোরেশন। ফাইল ছবি
বর্ষা ও পাহাড়ি ঢলে বন্যা-জলাবদ্ধতার চোখ রাঙানির মধ্যে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) নির্বাচনের বুধবার (২১ জুন) ভোটগ্রহণ। এজন্য সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন। সোমবার (১৯ জুন) মধ্যরাতে শেষ হয়েছে প্রার্থীদের প্রচার। মঙ্গলবার ভোটকেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে ইভিএমসহ নির্বাচনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী।
২০০২ সালে তৎকালীন সিলেট পৌরসভা থেকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত হওয়ার পর এটি পঞ্চম নির্বাচন। এ নির্বাচনের মাধ্যমে এবার মেয়রের আসনে নগরবাসী পাবে নতুন মুখ। আগের চারটি নির্বাচনে দুবার করে মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন আওয়ামী লীগের প্রয়াত বদর উদ্দিন আহমদ কামরান ও বিএনপির আরিফুল হক চৌধুরী। প্রথম দুটি নির্বাচনে বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সদস্য বদর উদ্দিন আহমদ কামরান। শেষ দুটি নির্বাচনে জয়লাভ করেন বিএনপির জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য আরিফুল হক চৌধুরী।
বর্তমান সরকারের অধীনে সব ধরনের নির্বাচন বর্জনের ধারাবাহিকতায় এবার প্রার্থী হননি বর্তমান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। ২০১৩ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতা আরিফ ১ লাখ ৭ হাজার ৩৩০ ভোট পেয়ে প্রথমবারের মতো মেয়র হন। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বদর উদ্দিন আহমদ কামরান পেয়েছিলেন ৭২ হাজার ১৭৩ ভোট। ২০১৮ সালের নির্বাচনে জয়ের ধারা অব্যাহত রেখে আরিফ ৯২ হাজার ৫৮৮ ভোট পেয়ে দ্বিতীয়বার মেয়র হন। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কামরান পেয়েছিলেন ৮৬ হাজার ৩৯২ ভোট।
তৎকালীন সিলেট পৌরসভা থেকে বর্তমান সিটি করপোরেশনের ১৪৫ বছরের ইতিহাসে টানা তিনবার কেউ চেয়ারম্যান বা মেয়রের পদে দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। আরিফের নির্বাচন বর্জনের মাধ্যমে ইতিহাসের সেই ধারা অব্যাহত নিশ্চিত হলো, নতুন একজন নগরপিতা পাচ্ছে নগরবাসী।
এবার সিসিক নির্বাচনে মেয়র পদে ৮ জন, ৪২টি সাধারণ ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে ২৭২ জন ও ১৪টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে ৮৭ নারী প্রার্থী হয়েছেন। মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আওয়ামী লীগের আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী (নৌকা), জাতীয় পার্টির নজরুল ইসলাম বাবুল (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাফেজ মাওলানা মাহমুদুল হাসান (হাতপাখা), জাকের পার্টির মো. জহিরুল আলম (গোলাপ ফুল), স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. শাহ জাহান মিয়া (বাস), মো. ছালাহ উদ্দিন রিমন (ক্রিকেট ব্যাট) ও মোশতাক আহমেদ রউফ মোস্তফা (হরিণ)। তবে বরিশাল সিটি নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর ওপর হামলার প্রতিবাদে নির্বাচন বর্জন করে মাঠ ছাড়েন ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মাহমুদুল হাসান। কিন্তু প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময় শেষ হয়ে যাওয়ায় ভোটে তার প্রতীক হাতপাখা থাকবে। এবার ছালাহ উদ্দিন রিমন ছাড়া বাকি সবাই প্রথমবারের মতো মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
এই সিটিতে এবার নির্বাচনী কার্যক্রম শুরুর পর থেকে মেয়র পদে তিনজন প্রার্থী আলোচনায় ছিলেন। তাদের মধ্যে একজন নির্বাচন বর্জন করা মাহমুদুল হাসান। তিনি সরে দাঁড়ানোর পর নৌকার মেয়রপ্রার্থী আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী ও লাঙ্গলের প্রার্থী নজরুল ইসলাম বাবুল আলোচনায় রয়েছেন।
নির্বাচনে জয়ের আশাবাদ ব্যক্ত করে আনোয়ারুজ্জামান বলেন, নগরবাসী ঝড়-বৃষ্টি বা যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগেও ভোটকেন্দ্রে যাবেন এবং নৌকা প্রতীকে ভোট দিয়ে তাকে বিজয়ী করবেন। এদিকে সোমবার রাতে প্রশাসন তার শেষ নির্বাচনী পথসভায় বাঁধা দিয়েছে বলে অভিযোগ করেন লাঙ্গলের প্রার্থী নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘লাঙ্গলের গণজোয়ার উঠেছে। যতই ষড়যন্ত্র করুক না কেন তারা, এই গণজোয়ারকে থামাতে পারবে না ইনশাআল্লাহ।’ লাখো ভোটের ব্যবধানে তিনি নির্বাচিত হবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এদিকে বুধবার সকাল ৮টায় নগরীর পাঠানটুলা শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে আনোয়ারুজ্জামান সপরিবারে ভোট দেবেন বলে জানা গেছে। সকাল ৯টায় নগরীর আনন্দ নিকেতন কেন্দ্রে ভোট দেবেন নজরুল ইসলাম।
সাধারণ ওয়ার্ডের চূড়ান্ত প্রার্থীর তালিকায় ২৭৩ জন থাকলেও শেষ সময়ে নগরীর ৭ নং ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর আফতাব হোসেন খানের প্রার্থিতা বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বাসার সামনে অস্ত্র নিয়ে মহড়ার ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে। এরপর জামিন পেলেও উচ্চ আদালতে গিয়েও তিনি প্রার্থিতা ফিরে পাননি। ফলে সাধারণ কাউন্সিল প্রার্থীর সংখ্যা ২৭২ জনে নেমে আসে। এদের মধ্যে সংরক্ষিত ৯ নং ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর রোকসানা বেগম শাহনাজ সিসিকের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সাধারণ ওয়ার্ডে পুরুষদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নগরীর ২৫ নং ওয়ার্ডে তিনি কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করছেন। সংরক্ষিত ওয়ার্ডের ৮৭ জনসহ সিসিক নির্বাচনে ৮৮ জন নারী নির্বাচন করছেন।
প্রথম চার দফায় তৎকালীন সিলেট পৌরসভার ২৬ দশমিক ৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এবারের নির্বাচনের আগে নগরীর পরিধি বেড়ে হয়েছে ৭৯ দশমিক ৫ বর্গকিলোমিটার। ফলে পূর্বে ২৭টি সাধারণ ও সংরক্ষিত ৯টি ওয়ার্ড থাকলেও এবারে তা বেড়েছে। সদর উপজেলা ও দক্ষিণ সুরমা উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়ন নগরীতে অর্ন্তভুক্ত হওয়ার ফলে ভোটারের সংখ্যাও স্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এবারের নির্বাচনে মোট ভোটারের সংখ্যা ৪ লাখ ৮৭ হাজার ৭৫৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৫৪ হাজার ৩৬৩ ও নারী ২ লাখ ৩৩ হাজার ৩৮৪ জন। এ ছাড়া প্রথমবারের মতো ভোটার তালিকায় রয়েছেন তৃতীয় লিঙ্গের ৬ জন। সিসিক নির্বাচনে ১৯০টি কেন্দ্রের সবকটিতে প্রথমবারের মতো ইভিএমে ভোটগ্রহণ হবে। এসব কেন্দ্রে ১ হাজার ৩৬৭টি ভোটকক্ষ রয়েছে। ঢাকায় বসে নির্বাচন কমিশনারসহ কর্মকর্তারা সরাসরি ভোটগ্রহণ পর্যবেক্ষণের জন্য প্রতিটি কেন্দ্রে দুটি ও ভোটকক্ষে একটি করে মোট ১ হাজার ৭৪৭টি সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।
এদিকে সিসিকের ১৯০টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৩২টি কেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাষ্যমতে অতি গুরুত্বপূর্ণ। বাকি ৫৮টি কেন্দ্র সাধারণ (ঝুঁকিমুক্ত) বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে নগরীর পুলিশ লাইনসে সংবাদ সম্মেলন করে মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. ইলিয়াছ শরীফ বলেন, ’নির্বাচনে বিশৃঙ্খলা হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে একজন পুলিশ পরিদর্শক, একজন উপপরিদর্শক ও পাঁচজন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। সাধারণ কেন্দ্রে একজন পুলিশ পরিদর্শক, একজন উপপরিদর্শক ও চারজন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া প্রতিটি কেন্দ্রে সাতজন করে নারীসহ মোট ১৪ জন আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন।’
পুলিশ কমিশনার মো. ইলিয়াছ শরীফ জানান, প্রতিটি সাধারণ ওয়ার্ডে একটি করে পুলিশের মোট ৪২টি মোবাইল টিম, প্রতি তিনটি ওয়ার্ডে একটি করে ১৪টি স্ট্রাইকিং টিম ও নগরীর প্রতিটি থানায় একটি করে মোট ৬টি রিজার্ভ স্ট্রাইকিং টিম থাকবে। পাশাপাশি দুটি ওয়ার্ডে র্যাবের একটি করে মোট ২২টি এবং প্রতি ৫টি ওয়ার্ডে এক প্লাটুন করে মোট ১০ প্লাটুন বিজিবির টহল টিম থাকবে।
সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ইমরুল হাসান জানান, সোমবার রাত ১২টার পর থেকে সিসিকের ৪২টি ওয়ার্ডে জেলা প্রশাসনের ৪২ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাঠে রয়েছেন। বৃহস্পতিবার (২২ জুন) পর্যন্ত তারা মাঠে থাকবেন।
সিসিক নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ফয়সল কাদের জানান, নির্বাচনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন। শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণের জন্য তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীসহ সবার সহযোগিতা কামনা করেন।