রাজশাহী সিটি নির্বাচন
রাজশাহী অফিস
প্রকাশ : ২০ জুন ২০২৩ ১৭:১০ পিএম
আপডেট : ২১ জুন ২০২৩ ০০:৫১ এএম
মঙ্গলবার রাজশাহী নগরীর নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজ থেকে কেন্দ্রে কেন্দ্রে ইভিএমসহ নির্বাচনী সরঞ্জাম পাঠানো হচ্ছে। প্রবা ফটো
রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক) নির্বাচনে প্রার্থীদের সব ধরনের প্রচার শেষ হয়েছে সোমবার (১৯ জুন) মধ্যরাতে। মঙ্গলবার (২০ জুন) কেন্দ্রে কেন্দ্রে পাঠানো হচ্ছে ইভিএমসহ নির্বাচনী সরঞ্জাম। রাত পোহালেই বুধবার ভোটগ্রহণ। এবারই প্রথম এই সিটির সবগুলো কেন্দ্রে ইভিএমে ভোটগ্রহণ হবে।
এবার রাসিকে ১৫৫টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্রের ভোটকক্ষের সংখ্যা ১ হাজার ১৫৩টি। প্রতিটি কেন্দ্রের পাশাপাশি প্রতিটি ভোটকক্ষে থাকবে সিসি ক্যামেরা। যার মাধ্যমে ঢাকা থেকে নির্বাচন কমিশনাররা ভোট পর্যবেক্ষণ করবেন। নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য অতিরিক্ত পুলিশের পাশাপাশি স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে নগরীতে মোতায়েন করা হয়েছে র্যাব ও বিজিবি। এ ছাড়া মাঠে থাকবেন ৩০ জন ম্যাজিস্ট্রেট। নির্বাচন কমিশন সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ করেছে। এখন অপেক্ষা শুধু ভোটের।
কেন্দ্রে যাচ্ছে ইভিএম
ভোটের জন্য কেন্দ্রে কেন্দ্রে পাঠানো হচ্ছে ইভিএমসহ নির্বাচনী সরঞ্জাম। নগরীর নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজ থেকে বেলা ১১টায় এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন বিভাগীয় কমিশনার জিএসএম জাফরউল্লাহ। প্রিজাইডিং কর্মকর্তা ও ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা পুলিশ ও আনসার সদস্যরা এসব সরঞ্জাম কেন্দ্রে নিয়ে যাচ্ছেন। এদিকে নির্বাচন ঘিরে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে প্রশাসন। মাঠে নেমেছে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি।
ভোটকেন্দ্র
রাসিক নির্বাচনে এবার মোট কেন্দ্রের সংখ্যা ১৫৫টি। কেন্দ্রগুলোতে ভোটকক্ষের সংখ্যা ১ হাজার ১৫৩টি এবং অস্থায়ী কেন্দ্রে ভোটকক্ষের সংখ্যা ১৬২টি। একজন রিটার্নিং কর্মকর্তার পাশাপাশি ১০ জন সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা কাজ করছেন। ভোটকেন্দ্রে থাকবে ৩ হাজার ৬১৪ জন কর্মকর্তা। ১৫৫টি কেন্দ্রের প্রতিটির বাইরে সিসি ক্যামেরা থাকবে তিন থেকে পাঁচটি। এ ছাড়া ১ হাজার ১৫৩টি কেন্দ্রের প্রতিটিতে থাকবে একটি করে সিসি ক্যামেরা। রিটার্নিং কর্মকর্তার দেওয়া তথ্যমতে, ভোটগ্রহণের জন্য ১ হাজার ৮০০টি ইভিএম প্রস্তুত রয়েছে। প্রতিটি কেন্দ্রে একজন করে ইভিএম টেকনিশিয়ান থাকবেন।
ভোটার
নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্যমতে, ৯৬ দশমিক ৭২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ সিটিতে মোট জনসংখ্যা ৫ লাখ ৫২ হাজার ৭৯১ জন। মোট ওয়ার্ডের সংখ্যা ৩০টি এবং সংরক্ষিত ওয়ার্ডের সংখ্যা ১০টি। এ নির্বাচনে মোট ভোটারের সংখ্যা ৩ লাখ ৫১ হাজার ৯৮২ জন। এদের মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৭১ হাজার ১৬৭, নারী ১ লাখ ৮০ হাজার ৮০৯ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ৬ জন।
প্রার্থী
রাসিক নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন চারজন মেয়রপ্রার্থী, ১১২ জন সাধারণ কাউন্সিলর প্রার্থী ও ৪৬ জন সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলর প্রার্থী। সাধারণ ওয়ার্ডের কাউন্সিলদের মধ্যে ২০ নং ওয়ার্ডে একজন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।
এবার নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন, জাতীয় পার্টির সাইফুল ইসলাম স্বপন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মুরশিদ আলম ফারুকী ও জাকের পার্টির অ্যাডভোকেট লতিফ আনোয়ার সুপ্ত।
বরিশালে ভোটের দিন দলীয় প্রার্থীর ওপর হামলার ঘটনাসহ ইভিএম পদ্ধতির ওপর অনাস্থা এনে নির্বাচন বয়কট করেছেন ইসলামী আন্দোলনের মেয়রপ্রার্থী মুরশিদ আলম ফারুকী। তবে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময় শেষ হয়ে যাওয়ায় তার প্রতীক হাতপাখা ভোটে থাকবে।
মেয়রপ্রার্থীরা কে কোথায় ভোট দেবেন
আগামীকাল আওয়ামী লীগের মেয়রপ্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন নগরীর উপশহর টাউন স্কুলে ভোট দেবেন। নগরীর মথুরডাঙার কোনো এক কেন্দ্রে ভোট দেবেন জাতীয় পার্টির প্রার্থী সাইফুল ইসলাম স্বপন এবং মুসলিম স্কুলে ভোট দেবেন জাকের পার্টির লতিফ আনোয়ার সুপ্ত। ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মুরশিদ আলম ফারুকী নির্বাচন বয়কট করায় তিনি ভোট দিতে যাবেন না বলে সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ড ও কেন্দ্র
রাসিক নির্বাচনে ৩০টি ওয়ার্ডের ১৫৫টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৪৮টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ (গুরুত্বপূর্ণ) হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। এসব কেন্দ্রে অতিরিক্ত পুলিশের পাশাপাশি স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে বিজিবি ও র্যাব মোতায়েন থাকবে। ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে ১, ৩, ৭, ৯, ১৪, ১৫, ১৬, ১৯, ২১, ২২, ২৩, ২৬, ২৮,২৯ ও ৩০ নং। এদিকে ২ জুন প্রতীক বরাদ্দের পর ৭, ১৪, ২৩, ১৯ ও ৩০ নং ওয়ার্ডে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ বিষয়ে উভয় পক্ষ থানা ও রিটার্নিং কর্মকর্তা বরাবর অভিযোগ করেছেন। তবে মেয়রপ্রার্থীদের বিরুদ্ধে কিছু আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকলেও সংঘর্ষের মতো ঘটনা ঘটেনি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও প্রশাসনের প্রস্তুতি
বুধবার সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলবে ভোটগ্রহণ। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হবে জেলা শিল্পকলা একাডেমি অডিটোরিয়ামে। নগরীতে টহল দিচ্ছে ২৫০ জন র্যাব সদস্য এবং ১২ প্লাটুন বিজিবি। নির্বাচনের নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করবেন ৩ হাজার ৫১৪ জন পুলিশ ও ১ হাজার ৯০০ আনসার সদস্য। থাকবেন ৩০ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ১০ জন জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট। প্রতিটি কেন্দ্রে ১২ জন আনসার সদস্য ও ৫ জন পুলিশ সদস্য সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবেন।
রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ লাইনে আজ সকাল সাড়ে ৮টায় নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের ব্রিফিং করেন পুলিশ কমিশনার আনিসুর রহমান। পরে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় তিনি বলেন, ’নির্বাচনে নিরাপত্তা দিতে ৩ হাজার ৫৪১ জন পুলিশ সদস্য প্রস্তুত রয়েছে। ১৫৫টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৪৮টি কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ। এই কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ ও মোবাইল টিম কাজ করবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি কেন্দ্রে স্ট্রাইকিং ফোর্স মজুদ থাকবে। কোনো কেন্দ্রে কেউ অনিয়ম বা বিশৃঙ্খলা করে কেউ পার পাবে না।’
সকাল ৯টায় র্যাব কার্যালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন র্যাব-৫-এর অধিনায়ক রিয়াজ শাহরিয়ার। তিনি বলেন, ’নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে র্যাব বদ্ধপরিকর। বুধবার ভোর ৬টা থেকে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি উপস্থিত থাকবে র্যাব। র্যাবের ডিএডি অফিসারসহ প্রায় ৩০০ জন সদস্য মোবাইল স্ট্রাইকিং ফোর্স, সাদা পোশাকের গোয়েন্দা এবং বোমা নিষ্ক্রিয়কারী হিসেবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অংশগ্রহণ করবেন। র্যাব-৫-এর ১৫টি মোবাইল স্ট্রাইকিং প্যাট্রোল, স্ট্রাইকিং ফোর্স কমান্ডারসহ সুপার মোবাইল মোটরসাইকেল টিম এবং অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত থাকবে। এ ছাড়া র্যাব সদর দপ্তরে স্পেশাল ফোর্স হেলিকপ্টারে প্রস্তুত থাকবে।’
তিনি আরও বলেন, ’১০ জুন থেকে র্যাব মাঠে কাজ করছে। নির্দেশনা অনুসারে ২২ জুন রাত পর্যন্ত র্যাবের এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।’
রাসিক নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন নির্বাচনে দায়িত্বরতদের উদ্দেশে বলেন, ’আগে তিনটি ব্যালটের মধ্যে যেকোনোটা না দিয়ে ভোটার চলে যেত, তবে এবার সবগুলো ব্যালট ইউনিটে ভোট না দিলে বিড়ম্বনা সৃষ্টি হবে। এ বিষয়ে আইশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশেষ করে আনসার সদস্যরা যেন সজাগ থাকে।’
রিটার্নিং কর্মকর্তা জানান, নির্বাচনে সাত স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকবে। অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। কেন্দ্রে কেন্দ্রে ইভিএমসহ প্রয়োজনীয় নির্বাচনী সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট দিতে যাতে কারও ভুল না হয়, সেজন্য প্রতিটি ওয়ার্ডে ভোটারদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।