সিলেট সিটি নির্বাচন
চয়ন চৌধুরী, সিলেট
প্রকাশ : ২০ জুন ২০২৩ ১৪:৫৪ পিএম
আপডেট : ২১ জুন ২০২৩ ০০:৫২ এএম
সিলেট নগরীর চালিবন্দর এলাকায় সোমবার দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে গণসংযোগ করেন আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়রপ্রার্থী আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী। প্রবা ফটো
সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) বর্তমান মেয়র ও বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আরিফুল হক চৌধুরী দলের চাপে ‘হ্যাটট্রিক মিশন’ থেকে সরে দাঁড়ানোর পর সিটি নির্বাচনের উত্তেজনায় অনেকখানি ভাটা পড়ে। এক দশক পর নৌকার প্রার্থী আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর সামনে নগর ভবন আওয়ামী লীগের দখলে আনার সুবর্ণ সুযোগ আসে।
মেয়র পদে আরও সাতজন প্রার্থী থাকলেও জাতীয় পার্টির নজরুল ইসলাম বাবুল ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাহমুদুল হাসান প্রচারের মাঠে আলোচনায় চলে আসেন। বরিশালকাণ্ডের পর মাহমুদুল নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিলেও নজরুল শেষ পর্যন্ত লড়বেন বলে জানিয়েছেন। তবে শক্ত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় জয় অনেকটাই নিশ্চিত আওয়ামী লীগের মেয়রপ্রার্থীর। তবে দলীয় বিভেদ কিছুটা অস্বস্তি বাড়াচ্ছে।
২০১৮ সালে সর্বশেষ নির্বাচনে মেয়র পদে বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের পরাজয়ের পর সিলেটে দলীয় বিভেদের বিষয়টি সামনে এসেছিল। সাবেক মেয়র (প্রয়াত) কামরানের পরাজয়ের পর দলের স্থানীয় পাঁচ শীর্ষ নেতাকে শোকজ করা হয়। একপর্যায়ে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটিও পুনর্গঠন করা হয়। এবার স্থানীয় ১০ নেতা মনোনয়নপ্রত্যাশী হলেও সবাইকে পাশ কাটিয়ে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামানকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়। এ নিয়ে প্রাথমিক বিস্ময়, ক্ষোভ, হতাশা দূরে ঠেলে নৌকার হয়ে স্থানীয় সব পর্যায়ের নেতাকর্মী প্রকাশ্যে মাঠে নামেন। দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত সব নেতাকেও প্রচারে কমবেশি তৎপরতা চালাতে দেখা গেছে। এরপরও ১০ বছর পর মেয়রের চেয়ার পুনরুদ্ধারের মিশনে আওয়ামী লীগের ভেতরে একধরনের চাপা ‘অস্বস্তি’ রয়ে গেছে।
আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে ৫ বছর আগের সেই ঘটনার ক্ষত এবারের নির্বাচনের প্রচারের শুরু থেকেই আলোচনায় রয়েছে। গত ৪ মে নগরীর একটি অভিজাত কনভেনশন সেন্টারে মতবিনিময় সভায় আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক বিগত নির্বাচনে কামরানের পরাজয়ের জন্য ‘বর্তমান সময়ের মোশতাকদের’ দায়ী করেন। আসন্ন নির্বাচনেও ‘মোশতাকের প্রেতাত্মাদের’ বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান নানক। এমনকি প্রথম দিকে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হওয়ার গুঞ্জনও ছিল। শেষ পর্যন্ত সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মো. আব্দুল হানিফ কুটু মেয়র পদে প্রার্থী হলেও প্রকাশ্যে দলের কাউকে দেখা যায়নি। সিলেট সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের সর্বশেষ ভিপি আব্দুল হানিফ নৌকা ও লাঙ্গলের মেয়রপ্রার্থীর পাশাপাশি আনুষ্ঠানিকভাবে ইশতেহার ঘোষণা করলেও প্রচারে নজর কাড়তে ব্যর্থ হন।
ইসলামী আন্দোলনের মেয়রপ্রার্থী সরে দাঁড়ানোর পর লাঙ্গলের মেয়রপ্রর্থী নজরুল সরকারবিরোধী সব পক্ষের ভোট পক্ষে টানার আশায় আছেন। একসময় হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সিলেটকে ‘দ্বিতীয় বাড়ি’ বলে উল্লেখ করলেও সিলেটে দলটির সাংগঠনিক অবস্থা এখন তেমন ভালো নয়। বিএনপি ভোট বর্জন নিশ্চিত করতে প্রার্থী হওয়া দলীয় নেতাদের আজীবনের জন্য বহিষ্কারের পাশাপাশি নিজেদের ভোটারদেরও কেন্দ্রে যেতে নিষেধ করেছে। এতে সরকারবিরোধী সব পক্ষের ভোট নিজের পক্ষে আনার নজরুলের স্বপ্ন বাস্তবায়ন আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে নগরীর ৪২টি ওয়ার্ডের সিংহভাগে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা কাউন্সিলর প্রার্থী থাকায় মেয়র পদে আনোয়ারুজ্জামান সুফল পাবেন বলে আশা করছেন দলের নেতারা। মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক বিধান কুমার সাহা বলেন, দলীয় ভোটেই নৌকার প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত।
সংশ্লিষ্ট নেতারা প্রকাশ্যে আশার কথা বললেও ভেতরে ভেতরে কতিপয় নেতার মনে ‘চাপা ক্ষোভের’ আশঙ্কার বিষয়টি উড়িয়ে দিতে পারছেন না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মহানগর আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর দুজন নেতা বলেন, প্রকাশ্যে সবাই ঐক্যবদ্ধ হলেও ভেতরে কী আছে, তা তো বোঝা যাচ্ছে না। ফলে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচল রয়েছে। ভোট শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই ভয় কাটবে না। নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ড পর্যায়ের আওয়ামী লীগের চার নেতা জানান, মেয়রপ্রার্থী আনোয়ারুজ্জামানের পক্ষে প্রকাশ্যে ঐক্য দেখা গেছে। বাস্তবে তার কতটুকু আছে, তা নিয়ে দলের ভেতরেই সন্দেহ-অবিশ্বাস আছে। এই অস্বস্তি, সন্দেহ-অবিশ্বাস দূর করার নানা চেষ্টা হয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতারা সবাইকে নিয়ে বসেছেন। সত্যিকারের ঐক্য থাকলে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পরাজিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে মনে করেন তারা।
দলীয় বিভেদকে বিবেচনায় রেখে এবার প্রথমেই পুরো নগরীকে চারটি অঞ্চলে ভাগ করে জেলা ও মহানগরের শীর্ষ চার নেতাকে প্রচারের দায়িত্ব দেওয়া হয়। মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমদ, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাকির হোসেন, জেলার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শফিকুর রহমান চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নাসির উদ্দিন খান এসব অঞ্চলের দায়িত্বে রয়েছেন। ফলে নিজ নিজ অঞ্চলে নৌকাকে বিজয়ী করার চ্যালেঞ্জ থাকছে তাদের ওপরও। প্রতিটি অঞ্চলে দলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের দায়িত্ব বণ্টন করা হয়। তবে মহানগরের একজন সহসভাপতি বলেন, প্রতিযোগিতা থাকলেও হুমকিধমকি দিয়ে রাজনীতি হয় না। নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। ভোটের সময় কাউকে মোশতাক বা বের করে দেওয়ার হুমকি হিতে বিপরীত হতে পারে।
তবে নৌকার মেয়রপ্রার্থী আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী দাবি করেছেন, যেকোনো সময়ের তুলনায় সিলেট আওয়ামী লীগের সব পর্যায়ের নেতাকর্মী এখন ঐক্যবদ্ধ। শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী বা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হওয়ার বিষয় উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন, যারা নির্বাচন করছেন, তাদের সবাই ভালো। বিগত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সবাই মাঠে থাকার পরও মেয়র পদে দলীয় প্রার্থীর পরাজয়ের বিষয়ে আনোয়ারুজ্জামান বলেন, ‘আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, শ্রমিক লীগসহ দলের প্রত্যেক নেতাকর্মী আমাকে নিয়ে অন্য যেকোনো বারের চেয়েও বেশি ইউনাইটেড। বিগত নির্বাচনে দলের সাংগঠনিক ইউনিটি এমন ছিল না। এবার নিজেরা বিভিন্ন জোনে ভাগ করে, নিজেরাই সেই দায়িত্ব নিয়ে নৌকার বিজয়ের জন্য কাজ করছেন। এবার সাংগঠনিক কোনো দুর্বলতা নেই। সবার মধ্যে মেয়র পদটি পুনরুদ্ধারের তাগিদ রয়েছে।’