রাজশাহী সিটি নির্বাচন
রাজু আহমেদ, রাজশাহী
প্রকাশ : ২০ জুন ২০২৩ ১৪:৪৩ পিএম
আপডেট : ২১ জুন ২০২৩ ০০:৫২ এএম
রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের উদ্যোগে সোমবার আয়োজিত নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেন দলীয় মেয়রপ্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। প্রবা ফটো
রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক) নির্বাচনে জয়ের বিষয়ে অনেকটাই নিশ্চিত আওয়ামী লীগের মেয়রপ্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। তিনি নিজেই বলেছেন, নির্বাচনী মাঠে যে উত্তাপ, সেটা অনেকটাই কম। তাই বলে তিনি বসে নেই।
প্রতীক বরাদ্দের আগেই তিনি স্থানীয় রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিকসহ পেশাজীবী শতাধিক সংগঠনের সঙ্গে সভা করেছেন। ঘরোয়া এসব সভায় অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যাও ছিল নজরকাড়া। ছুটে চলছেন নগরীর বিভিন্ন প্রান্তে। পাশাপাশি বিরোধী শিবিরের গতিবিধির ওপরও নজর রাখছেন। তবে নির্বাচন সামনে রেখে নিজেদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব নিরসন করে একত্র হতে পারেননি স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা। এ নিয়ে রাজশাহী আওয়ামী লীগে অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
আসন্ন রাসিক নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না বিএনপি। ২০১৩ সালে এই সিটিতে বিএনপির প্রার্থী জয়ী হয়েছিলেন। ওই জায়গা থেকে কঠিন প্রতিপক্ষই এ নির্বাচনে অনুপস্থিত। সিটিতে এবার মেয়র পদে প্রার্থী হয়েছেন চারজন। বরিশালে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী সৈয়দ ফয়জুল করীমের ওপর হামলার ঘটনায় রাজশাহীতে নির্বাচন বয়কট করেছে দলটি। তবে প্রার্থিতা বাতিলের সময় শেষ হয়ে যাওয়ায় ভোটে হাতপাখা প্রতীক থেকে যাবে। রাজশাহীতে দলটির প্রার্থী হয়েছিলেন মুরশিদ আলম ফারুকী।
বাকি দুই প্রার্থীর মধ্যে একজন জাকের পার্টির লাল গোলাপ প্রতীকের অ্যাডভোকেট মো. লতিফ আনোয়ার সুপ্ত। প্রচারের মাঠে তেমন সরব না তিনি। এ ছাড়া জাতীয় পার্টির সাইফুল ইসলাম স্বপন প্রচারের মাঠে সক্রিয় থাকলেও নগরীর তেমন পরিচিত মুখ নন তিনি। সুপ্তও অপরিচিত মুখ। তাই এ নির্বাচনে লিটন তেমন শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী পাচ্ছেন না বলে মনে করছেন দলটির নেতারা।
এদিকে নির্বাচনী কৌশলে বরিশালে নৌকার প্রার্থী আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ ওরফে খোকন সেরনিয়াবাতের পদ্ধতিকে সমর্থন করেন বলেন জানিয়েছেন লিটন। তিনি বলেন, দলের একটি অংশকে দূরে রেখে নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনার যে কৌশল খোকন নিয়েছিলেন তা সঠিক ছিল। অন্যদিকে গাজীপুরের নৌকার প্রার্থী আজমত উল্লা খানের দলের মধ্যে থাকা তার বিরোধী অংশের পরীক্ষা না নিয়ে তাদের ওপর বিশ্বাস করাটা অনেক বড় ভুল সিদ্ধান্ত ছিল বলে জানান লিটন।
আওয়ামী লীগ এই সিটিতে জয়ের বিষয়ে অনেকটাই নিশ্চিত। তার কারণ হিসেবে দলের একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ২০১৩ সালে বিএনপির প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি রাসিকের সেবার মান তলানিতে ঠেকিয়েছিলেন। নগরীর অনেক গুরুত্বপূর্ণ সড়কসহ উন্নয়নকাজ শুরু করে তিনি শেষ করতে পারেননি। রাসিকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন পর্যন্ত তিনি পরিশোধ করতে পারতেন না। এ নিয়ে একাধিকবার আন্দোলনে নামেন কর্মচারীরা।
এর আগের মেয়াদে ২০০৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের প্রার্থী লিটন মেয়র থাকাকালীন রাসিক এলাকার যে উন্নয়ন করে গিয়েছিলেন, তাতে ভাটা পড়ে বুলবুলের মেয়াদে। ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে রাসিক। এর সবই ঘটেছে নগরবাসীর সামনে। এরপর ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত মাত্র পাঁচ বছরে রাজশাহীর যে অস্বাভাবিক উন্নয়ন হয়েছে, তা সবার নজর কেড়েছে। রাজশাহী শহর প্রশংসা কুড়িয়েছে দেশে ও বিদেশে। কাজেই নগরবাসী এবার আর সে ভুল করবে না বলে মনে করেন আওয়ামী লীগ নেতারা।
ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মুরশিদ আলম ফারুকী গত ১২ জুন ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন। তিনি দাবি করেন, বরিশালের নির্বাচনে তাদের হাতপাখার প্রার্থীর ওপর হামলা করেছে আওয়ামী লীগ। তাই তারা রাজশাহী সিটি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। রাজশাহীতেও আওয়ামী লীগের প্রার্থী একাধিকবার নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গ করেছেন। এ বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ দিয়েও কোনো কাজ হয়নি।
এদিকে গত বুধবার সকালে জাতীয় পার্টির মেয়রপ্রার্থী সাইফুল ইসলাম স্বপন গণসংযোগকালে বলেন, ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন আমরা করব। যদি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড পাই, তবেই তা সম্ভব হবে। আমরা মাঠে থেকে শেষ পর্যন্ত দেখে যেতে চাই।’ জাকের পার্টির মেয়রপ্রার্থী মো. লতিফ আনোয়ার সুপ্ত বলেন, ‘আমরা আশা করছি শতভাগ ভোটার এবার নির্বাচনে ভোট প্রয়োগ করবে। মানুষ পরিবর্তন চায়। আর সেই চাওয়াটাই আমরা পূরণ করব।’
আওয়ামী লীগের প্রার্থী খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, ‘অন্য দলের বিশেষ করে বিএনপির প্রার্থী না থাকায় নির্বাচনী মাঠে যে উত্তাপ, সেটা অনেকটাই কম। দেখে মনে হচ্ছে নির্বাচন একতরফাই হচ্ছে। তবে আমরা গাজীপুরের নির্বাচন দেখেছি। সেখানে চুপচাপ থেকে আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত একজনকে জয়যুক্ত করা হয়। এক্ষেত্রে জামায়াত-বিএনপি মুখে যাই বলুক, তারাও হয়তো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। তাই আমরা কাউকেই ছোট করে দেখছি না। ছোট দল হিসেবে তারা তাদের মতো করে প্রচার করছে। তবে আপাতদৃষ্টিতে যারা বলছে ভোট করব না, তারা যদি ভোট প্রয়োগ করে বা সমর্থন দেয়, সেখানে কিছুটা সমস্যা হবে।’ তবে গত বুধবার এক পথসভায় দেওয়া বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, বিএনপির সমর্থকরাও উন্নয়নের স্বার্থে তাকে ভোট দেবে।
এদিকে নৌকার প্রার্থী লিটনের নির্বাচনী প্রচার ক্যাম্পে মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মীর ইকবাল, সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার, সাংগঠনিক সম্পাদক মীর ইতিয়াক আহমেদ লেমন, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক জেডু সরকারসহ তাদের অনুসারী কাউকে দেখা যায়নি। দেখা যায়নি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওয়াদুদ দারাকেও। রাজশাহী-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক ও রাজশাহী-৫ আসনের এমপি ডা. মনসুর রহমানকে ঘরোয়া সভায় লিটনের পাশে দেখা গেলেও বাকি তিনটি আসনের আওয়ামী লীগ মনোনীত এমপিদের দেখা যায়নি।
এদিকে ২০১৮ সালের রাসিক নির্বাচনে রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনের এমপি ফারুক চৌধুরী, রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনের আয়েন উদ্দিনসহ অন্য এমপিরা লিটনের হয়ে প্রচার চালালেও এবার তাদের দেখা যায়নি। লিটন তানোর, গোদাগাড়ী, পবা, মোহনপুর, চারঘাট ও বাঘার বাসিন্দাদের সঙ্গে ঈদ পুনর্মিলনী করেন। তবে এসব অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট এমপিদের দেখা যায়নি। তবে রাজশাহী-৪ (বাগমারা) ও রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া) আসনের এলাকাবাসীর সঙ্গে ঈদ পুনর্মিলনীতে এমপি এনামুল হক ও ডা. মুনসুর রহমানকে লিটনের পাশে দেখা গেছে।
জানা গেছে, আওয়ামী লীগের এই কোন্দলের পেছনে রয়েছে ক্ষমতা ধরে রাখার লড়াই। এমপি আয়েন উদ্দিন, ফারুক চৌধুরী ও শাহরিয়ার আলমের সঙ্গে দ্বন্দ্বের অন্যতম কারণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদের লিটনের নির্বাচনী ক্যাম্পে অংশগ্রহণ। আসাদের সঙ্গে এই এমপিদের সম্পর্কের অবনতির বিষয়টি বহু পুরোনো। আসাদ রাজশাহী-১, ৩, ৪ ও ৫ আসনের যেকোনো একটির দলীয় মনোনয়ন বাগিয়ে নিতে অনেক আগে থেকেই দৌড়ঝাঁপ চালাচ্ছেন। আর এ কারণেই এসব আসনের এমপিদের সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি হয়।