কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগ
নুপা আলম, কক্সবাজার
প্রকাশ : ১৯ জুন ২০২৩ ১৩:৩৯ পিএম
উপরের বা দিক থেকে প্রয়াত একেএম মোজাম্মেল হক ও তার প্রথম ছেলে মাসেদুল হক রাশেদ, তৃতীয় ছেলে শাহিনুল হক মার্শাল, দ্বিতীয় ছেলে শাহিদুল হক সোহেল, ছোট ছেলে কায়সারুল হক জুয়েল, মেয়ে তাহামিনা চৌধুরী লুনা।
কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন প্রয়াত একেএম মোজাম্মেল হক। জেলা পরিষদ নির্বাচন ও কক্সবাজার পৌরসভার নির্বাচনে তার দুই ছেলে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে হয়েছিলেন বিদ্রোহী প্রার্থী। এর পেক্ষাপটে হক পরিবারের আপন চার ভাই ও এক বোন দলীয় পদ হারিয়েছেন। একই সঙ্গে পরিবারটির বলয়ে থাকা ৩০ নেতাকর্মী দল থেকে বহিষ্কার হয়েছেন।
১২ জুন কক্সবাজার পৌরসভা নির্বাচন-পরবর্তীকালে জেলায় পরিবারটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী হচ্ছে তা নিয়ে বেশ আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে হক পরিবারের সন্তানরা নিজেদের শতভাগ আওয়ামী লীগের লোক এবং দলের বাইরে তাদের যাওয়ার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন। তারা বলছেন, আওয়ামী লীগ করতে হলে দলের পদে থাকতে হবে এমন নয়।
এ বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা বলছেন, দলের সঙ্গে একের পর এক বিদ্রোহ, দলের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা এবং শিষ্টাচার লঙ্ঘন করায় তারা দলে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন। আওয়ামী লীগের কেউ নন তারা। কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত মতেও তাদের দলে ফেরার কোনো সুযোগও নেই।
কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা একেএম মোজাম্মেল হক ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আস্থাভাজন। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাসে একেএম মোজাম্মেল হক স্মরণীয়।
২০১৯ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে কক্সবাজার সদর উপজেলার চেয়ারম্যান হিসেবে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন পান মোজাম্মেল হকের কনিষ্ঠ সন্তান কায়সারুল হক জুয়েল। সেই সময় জুয়েল কক্সবাজার জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। ওই বছর ৩১ মার্চ অনুষ্ঠিত ভোটে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি।
কিন্তু আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সেই পরিবারের বিভাজন শুরু হয় ২০২২ সালের ২১ মার্চ অনুষ্ঠিত কক্সবাজার পৌর আওয়ামী লীগের সম্মেলন ঘিরে। সম্মেলনে পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রার্থী হন কায়সারুল হক জুয়েল। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে সম্মেলনে জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে পদত্যাগের কোনো কাগজপত্র দেখাতে না পারায় কায়সারুল হক জুয়েলকে প্রার্থী হিসেবে বৈধতা দেওয়া হয়নি। এরপর শুরু হয় প্রকাশ্য বিরোধ। এর জেরে জুয়েল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও বার্তা এবং লাইভে এসে কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মেয়র মুজিবুর রহমানসহ অনেক শীর্ষ নেতার নাম ধরে নানা নেতিবাচক মন্তব্য করেন। মুজিবুর রহমান তাদেরই আপন চাচাতো ভাই।
এরপর ২০২২ সালে ১৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত কক্সবাজার জেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান হিসেবে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান একাধিকবারের সংসদ সদস্য মোস্তাক আহমদ চৌধুরী। কিন্তু দলের সিদ্ধান্ত না মেনে বিদ্রোহী প্রার্থী হন একেএম মোজাম্মেল হকের তৃতীয় ছেলে শাহিনুল হক মার্শাল। তিনি ওই সময় জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসভাপতি থাকলেও বহিষ্কার হন। ওই নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন শাহিনুল হক মার্শাল। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মোস্তাক আহমদ চৌধুরীসহ অনেক শীর্ষ নেতা ওই পরিবারের কাছে নাজেহালের শিকার হন। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছিলেন শীর্ষ নেতারা।
২০২২ সালের ১৩ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন। যে সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী ছিলেন ওই সময়ের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং একেএম মোজাম্মেল হকের প্রথম ছেলে মাসেদুল হক রাশেদ। কিন্তু ওইদিন কোনো প্রকার কাউন্সিল ছাড়াই সম্মেলন অধিবেশনে সভাপতি হিসেবে অ্যাডভোকেট ফরিদুল ইসলাম চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মুজিবুর রহমানের নাম ঘোষণা করা হয়। বর্তমানে জেলা আওয়ামী লীগের কমিটি দুজনের, যা এখনও পূর্ণাঙ্গ হয়নি।
সর্বশেষ ১২ জুন অনুষ্ঠিত কক্সবাজার পৌরসভার নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মাহাবুবুর রহমান চৌধুরী। এতে ক্ষুব্ধ হন মোজাম্মেল হকের সন্তান মাসেদুল হক রাশেদ। ফলে তিনি বিদ্রোহী প্রার্থী হন।
এর জেরে বহিষ্কার হন জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সদস্য সচিব কক্সবাজার সদর উপজেলা চেয়ারম্যান কায়সারুল হক জুয়েল। জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক তাদের মেঝো ভাই শাহিদুল ইসলাম সোহেল, প্রার্থী মাসেদুল হক রাশেদ আর তাদের বোন জেলা যুব মহিলা লীগের সভানেত্রী তাহমিনা চৌধুরী লুনা স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে ভাইয়ের পক্ষে নির্বাচনে নেমে পড়েন। তাদের সঙ্গে কক্সবাজার পৌর আওয়ামী লীগের ২০ নেতাসহ বহিষ্কার হন ৩০ জন।
১২ জুনের নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীকে হারিয়ে মেয়র নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগ মনোনীত মাহবুবুর রহমান। একেএম মোজাম্মেল হক পরিবারের সবাই এখন পদবঞ্চিত এবং দল থেকে বহিষ্কৃত।
এরই মধ্যে নির্বাচিত মেয়র মাহবুবুর রহমান চৌধুরী এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, মোজাম্মেল হকের সন্তানরা এখন আওয়ামী লীগের কেউ নন। তারা বারবার ‘দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গকারী।’ তাদের আওয়ামী লীগে ফেরার কোনো সুযোগও নেই।
তবে পরাজিত মেয়রপ্রার্থী মাসেদুল হক রাশেদ বলেছেন, আমার পিতা সামরিক শাসকের সময় নির্যাতন-হুমকি উপেক্ষা করে আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে কক্সবাজারে প্রতিষ্ঠা করেছেন। আমাদের রক্ত-শিরায় আওয়ামী লীগের প্রবাহধ্বনি। আওয়ামী লীগ করতে দলের পদ-পদবি থাকতে হবে এমন কোনো কথা নেই। পদ থাকলেও আওয়ামী লীগ, না থাকলেও আওয়ামী লীগ।
বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার কারণ হিসেবে রাশেদ বলেন, নির্বাচন কোনো বিরোধী প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। আমি প্রার্থী হয়েছি। ভোট হয়েছে। কক্সবাজার পৌর নির্বাচন প্রমাণ করেছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব। আমি প্রার্থী ছিলাম বলেই এটা প্রমাণ করা সম্ভব হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের সব আশা-ভরসার কেন্দ্রবিন্দু আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আগামী ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জের। এই চ্যালেঞ্জকে মাথায় রেখে কক্সবাজারের চারটি আসন শেখ হাসিনাকে উপহার দিতে সবার প্রচেষ্টা শুরু জরুরি।
এদিকে ভোট-পরবর্তী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় একই কথা বলেছেন রাশেদের ভাই জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শাহিনুল হক মার্শাল। তিনি বলেছেন, আমরা শতভাগ আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট ফরিদুল ইসলাম চৌধুরী জানান, দলের সিদ্ধান্ত না মেনে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে সবাই বহিষ্কার হয়েছেন। এ ছাড়া নির্বাচন চলাকালীন ওই পরিবারের সন্তানরা শিষ্টাচার লঙ্ঘন করেছেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে করা মন্তব্যের পর আওয়ামী লীগ করার সব যোগ্যতা হারিয়েছেন। এরা দলে ফিরবেন কীভাবে? সেই পথ বন্ধ হয়ে গেছে। তবে তাদের পিতার প্রতি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সম্মান সবসময় আছে এবং থাকবে।