তরিকুল ইসলাম মিঠু, যশোর
প্রকাশ : ১৭ জুন ২০২৩ ১৩:০৮ পিএম
খনন শেষ না হতেই ফের কচুরিপানার দখলে ভৈরব নদ। প্রবা ফটো
বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেও যশোরের ভৈরব নদের প্রাণ ফেরেনি। নদের নাব্যতা ফিরিয়ে নৌ-যোগাযোগের ব্যবস্থা চালু করার মতোও অবস্থার সৃষ্টি হয়নি। অভিযোগ উঠেছে, প্রায় ২৭৩ কোটিতেও নৌকা চলাচলের যোগ্য হয়নি নদের খনন কাজ।
গত পাঁচ বছর ধরে নামসর্বস্ব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো নদ খননের নামে বিপুল অঙ্কের টাকা লুটপাট করেছে। চলতি জুন মাসের শেষের দিকে খনন কাজের শেষ ঘোষণা করা হলেও ইতোমধ্যে কোথাও ফের ভরাট হয়ে গেছে নদ। ঠিকাদাররা শত ভাগ কাজ শেষ করার দাবি করলেও স্থানীয়দের মতে, পুকুর খনন করার সক্ষমতা নেই, সেইসব ঠিকাদার খনন করছে নদ।
এর আগে ২০১০ সালের ২৭ ডিসেম্বর যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস উদ্বোধনের সময় নদের প্রাণচাঞ্চল্য ফিরিয়ে নৌ-যোগাযোগের ব্যবস্থা সচল করার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিশ্রুতি দেন। সে অনুযায়ী ভৈরব নদ খনন ও পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের জন্য ২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট একনেকে প্রকল্পের জন্য ২৭২ কোটি ৮১ লাখ টাকা অনুমোদন করা হয়। নির্ধারণ করা হয় নদের তলদেশে ৩২ মিটার ও উপরিভাগে ৪৮ মিটার করে খনন করা হবে। কিন্তু প্রকল্পের সফলতা নিয়ে প্রথম থেকে স্থানীয়দের মধ্যে শঙ্কা দেখা দিয়েছিল।
নদের পাড়ের বাসিন্দা মজিবুর রহমান জানান, ঠিকাদারের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে কোটি কোটি টাকা জলে গেছে। একদিকে নদের মাটি ও বালি বিক্রি করেছে, অন্যদিকে সরকারের কাছ থেকে প্রকল্পের টাকা নিয়েছে। কাজের কাজ কতটুকু হয়েছে যশোরবাসী সব দিনের আলোর মতো পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে।
প্রবীণ রাজনীতিবিদ অনিল বিশ্বাস জানান, একশ্রেণির ঠিকাদার প্রকল্পের কাজ নিয়ে স্থানীয় অদক্ষ ঠিকাদার দিয়ে কমিশনে কাজ করাচ্ছে। তারা দায়সারাভাবে লোক দেখানো কাজ শেষও করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, যশোর ভৈরব নদ খননে ১৫ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৩৮টি লটে কাজ পেয়েছে। যশোর মুজিব সড়কে অবস্থিত এসটি ইন্টারন্যাশনাল দুটি লটে একটি ভবন মেরামত ও দুই কিলোমিটার নদ খননের কাজ পেয়েছে।
ঢাকা মতিঝিলের সেনাকল্যাণ ভবনে অবস্থিত ডলি কন্সট্রাকশন লিমিটেড ৩টি লটে ৭ কিলোমিটার খনন, যশোর পুরাতন কসবা মিশন পাড়া এলাকার ঠিকাদার নুর হোসেন ৪টি লটে ১২ কিলোমিটার, একই এলাকার এম টি অ্যান্ড এস এস কনসোর্টিয়াম ২টি লটে ৬ কিলোমিটার, এস এ-এমএসএ-এনএইচ (জেভি) ১টি লটে ৪ কিলোমিটার, এনএইচ-এমএসসি-এস এ ইউ (জেভি) ৮টি লটে ২৮ হাজার ৫০০ কিলোমিটার, টেকনিপ করপোরেশন ১টি লটে ৩ কিলোমিটার, কপোতাক্ষী এন্টারপ্রাইজ ৪টি লটে ১১ কিলোমিটার, ওই এলাকার বিবি রোডের রেজা এন্টারপ্রাইজ ১টি লটে ৩ কিলোমিটার, এসএস এবং এম টি (জেভি) ২টি লটে ৫ কিলোমিটার, কাজী পাড়া এলাকার শামিম চাকলাদার ৩টি লটে ৯ কিলোমিটার, দক্ষিণ টুটপাড়া এলাকার শামিম আহসান ৩টি লটে ৭ হাজার ৫০০ কিলোমিটার, ১৮ গগন বাবু রোড এলাকার আমিন অ্যান্ড কোং ৩টি লটে ১০ কিলোমিটার, সাতক্ষীরার ইটাগাছা এলাকার শেখ আশরাফ উদ্দিন ১টি লটে ২ কিলোমিটার, চুয়াডাঙ্গা জীবন নগরের জাকাউল্লাহ অ্যান্ড ব্রাদার্স ১টি লটে ৩ কিলোমিটার নদ খননের কাজ পেয়েছে। ঠিকাদারদের দাবি, তারা ইতোমধ্যে প্রায় শতভাগ নদ খননের কাজ শেষ করেছেন।
ঠিকাদার শামিম আহমেদ জানান, শতভাগ খনন সম্পন্ন করেছেন তিনি। অতিরিক্ত কমিশনের কারণে কাজে লাভও করতে পারনেনি তিনি। যশোরের পুরাতন কসবা এলাকার রেজা এন্টারপ্রাইজের মালিক রেজা জানান, তিনি শিডিউল অনুযায়ী কাজ শেষ করেছেন। ইতোমধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বরত ব্যক্তিদের কাছে শিডিউল অনুযায়ী কাজ বুঝিয়ে দিয়েছেন।
তিনি আরও জানান, যদি আবার নদ ভরাট হয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড টেন্ডার দিলে আবার কাজ করব। এভাবেই চলবে নদ খনন।
এম টি অ্যান্ড এস এস কনসোর্টিয়াম ও এস টি অ্যান্ড এম টি (জেভি) ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক ইমদাদ জানান, তিনি তিনটি লটে বার বাজার চৌগাছা এলাকায় কাজ করেছেন। এখন যদি সেখানে নদী ভরাট হয়ে যায় তাহলে তার পক্ষে কিছুই করার নেই।
ভৈরব নদ সংস্কার আন্দোলন কমিটির উপদেষ্টা ও কপোতাক্ষ বাঁচাও আন্দোলনের প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ জানান, নদটির সংস্কার নিয়ে যশোরের মানুষের অনেক স্বপ্ন ছিল। নদে আবার নৌযান চলাচল করবে। এতে অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটবে। কিন্তু সঠিকভাবে কাজ না হওয়ায় নদে নৌকা চলা তো দূরের কথা, কোথাও পানির প্রবাহও চলছে না। তিনি প্রকল্পের কাজে অনিয়ম চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
পানি উন্নয়ন বোর্ড যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী একেএম মমিনুল ইসলাম জানান, তিনি যশোরে নতুন যোগ দিয়েছেন। ঠিকাদারদের কাছ থেকে কাজের শতভাগ বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। কেউ অনিয়ম করে থাকলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান এ কর্মকর্তা।