প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৬ জুন ২০২৩ ১৫:৫৫ পিএম
আপডেট : ১৬ জুন ২০২৩ ২০:৫৬ পিএম
সাংবাদিক নাদিমের হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন করেন বকশীগঞ্জের সর্বস্তরের জনসাধারণ। প্রবা ফটো
‘কোনো সাংবাদিক যেন আমার আব্বুর মতো খুন না হয়। আব্বু সত্য নিউজ করার জন্য প্রাণ দিয়েছেন। পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়েছে আমার আব্বুকে। হত্যাকারী চেয়ারম্যান বাবুকে দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানাই। জড়িত সবাইকে কঠোর শাস্তি দেন আপনারা। যাতে অন্য কোনো সাংবাদিক সত্য নিউজ করতে গেলে এভাবে হত্যার শিকার না হয়।’
হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে এসব কথা বলছিলেন জামালপুরের নিহত সাংবাদিক গোলাম রাব্বানী নাদিমের অনার্স প্রথম বর্ষপড়ুয়া মেয়ে রাব্বিরাতুল জান্নাত।
সিসিটিভি ফুটেজ দেখে এ ঘটনায় শুক্রবার (১৬ জুন) সন্ধ্যা পর্যন্ত ছয়জনকে আটক করেছে বকশীগঞ্জ থানার পুলিশ। তারা হলেন—গোলাম কিবরিয়া সুমন, মোহাম্মদ তোফাজ্জল হোসেন, আইনাল হক, কফিল উদ্দিন, মো. শহিদ ও ফজলুল হক। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোহেল রানা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
নাদিমের পরিবারের দাবি ও প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য অনুযায়ী, এ হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা বকশীগঞ্জ সদর উপজেলার সাধুরপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাহমুদুল আলম বাবু। অথচ তিনি এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। বাবু উপজেলার সাধুরপাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।
নাদিমের ছেলে আব্দুল্লাহ আল মামুন রিফাত শুক্রবার জানান, পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাবু চেয়ারম্যান ও তার ছেলে ফাহিম রিফাতের নামে মামলা দায়ের করবেন।
ওসি সোহেল রানা বলেন, ’বাবু চেয়ারম্যানকেও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। আপরাধী যতই প্রভাবশালী হোক তাকে আইনের আওতায় আসতেই হবে। পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ পেলে মামলা নেওয়া হবে।’
এদিকে নাদিম হত্যার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে কাজ শুরু করার কথা জানিয়েছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। শুক্রবার কারওয়ান বাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন এ কথা বলেন। পুলিশের কনস্টেবল বাদল মিয়া হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা রিপন নাথকে গ্রেপ্তার উপলক্ষে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
খন্দকার আল মঈন বলেন, ’সাংবাদিক হত্যা খুবই দুঃখজনক। এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে র্যাব ছায়াতদন্ত করছে। র্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র্যাব-১৪ এ বিষয়ে আসামিদের ধরতে কাজ শুরু করেছে। এ হত্যাকাণ্ডে যারাই জড়িত থাকুক, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’
এদিকে সাংবাদিক নাদিমকে হত্যার প্রতিবাদে ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে শুক্রবার ঢাকাসহ সারা দেশে বিক্ষোভ-সমাবেশ ও মানববন্ধন করেছেন সাংবাদিক ও অন্য কিছু সংগঠন।
গোলাম রাব্বানী নাদিম নিহত হওয়ার ঘটনায় জামালপুরে দোষীদের বিচারের দাবিতে অবস্থান ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নাদিমের মরদেহ দাফনের পর জেলা ও উপজেলার সাংবাদিকরা নাদিম হত্যার সঙ্গে জড়িত সাধুরপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহমুদুল আলম বাবুসহ হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে বকশীগঞ্জ থানার সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। এ ছাড়া বিকালে উপজেলার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় প্রধান সড়কে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বকশীগঞ্জের সর্বস্তরের মানুষের ব্যানারে অনুষ্ঠিত ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধনে বকশীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান জুম্মান তালুকদার, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান মাসুমা ইয়াসমিন স্মৃতি, উপজেলা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক রাজন মিয়া, উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি শামীমসহ অন্যরা বক্তব্য দেন।
এদিকে পুলিশ সুপার নাছির উদ্দীন আহমেদ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ’সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বাকিদেরও শনাক্ত করা হয়েছে। সবাইকে গ্রেপ্তারে পুলিশের পাঁচটি টিম নিরলসভাবে এখনও কাজ করছে। নাদিমকে হত্যার নির্দেশদাতা ইউপি চেয়ারম্যান মাহমুদুল আলম বাবুকে গ্রেপ্তারে আমাদের টিম কাজ করছে। আগামী দুয়েক দিনের মধ্যে তাকে গ্রেপ্তার করতে পারব।’
নাদিম হত্যার বিচারের দাবিতে প্রতিবাদী মানববন্ধন করেছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের একাংশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এ প্রতিবাদী মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে ছাত্র ইউনিয়ন (রাগীব-রনি)।
ঢাকার সাভারে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিকস মিডিয়ার সাংবাদিকরা। নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কের বাইপাইলে আশুলিয়া প্রেস ক্লাবের উদ্যোগে এ কর্মসূচিতে অংশ নেন স্থানীয় সংবাদকর্মীরা।
এ ছাড়া গোলাম রাব্বানী নাদিম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সিলেটে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিকালে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে ‘সিলেটের সাংবাদিক সমাজের’ ব্যানারে এ সমাবেশ হয়।
খুলনা সাংবাদিক ইউনিয়নের (কেইউজে) উদ্যোগে প্রেস ক্লাবের সামনেও এ হত্যার বিচার দাবি করেছেন স্থানীয় সাংবাদিকরা। সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ফারুক আহমদের সভাপতিত্বে মানববন্ধনে বক্তব্য দেন প্রেস ক্লাবের সভাপতি এসএম নজরুল ইসলাম, প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মল্লিক সুধাংশু ও সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান রিয়াজ প্রমুখ।
এই হত্যার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (জাবিসাস)। একই সঙ্গে ঘটনায় জড়িত সন্ত্রাসীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়।
প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানববন্ধন করেছেন বরিশালের সাংবাদিকরা। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বরিশাল নগরের অশ্বিনী কুমার হলের সামনের সড়কে সব সাংবাদিক সংগঠনের সহযোগিতায় সাংবাদিক ইউনিয়ন বরিশালের আয়োজনে এ সমাবেশ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
এ ছাড়া ফরিদপুর, বরগুনা, বাগেরহাট, শরীয়তপুর, খাগড়াছড়ি, দিনাজপুর, মানিকগঞ্জ, পঞ্চগড় ও সাতক্ষীরায় সাংবাদিক নাদিম হত্যার প্রতিবাদ ও বিচার দাবি করেছেন বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় কর্মরত সাংবাদিকরা।
বুধবার (১৪ জুন) রাত সাড়ে ১০টার দিকে বকশীগঞ্জ উপজেলার পাথাটিয়া এলাকার ডাচ বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথের সামনে অতর্কিত আঘাত করে চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে তাকে ফেলে দেওয়া হয়। এরপর দেশীয় অস্ত্রধারী ১০-১২ জন দুর্বৃত্ত তাকে সড়ক থেকে মারধর করতে করতে টেনেহিঁচড়ে অন্ধকার গলিতে নিয়ে যায় এবং তার মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়ি আঘাত করে। ওই সময় সহকর্মী মুজাহিদ তাদের আটকাতে গেলে তাকেও মারধর করে দুর্বৃত্তরা।
এরপর মুমূর্ষু অবস্থায় সহকর্মী মুজাহিদ ও স্থানীয়রা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু আঘাত গুরুতর হওয়ায় সেখানকার চিকিৎসক তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। পরে বৃহস্পতিবার বেলা পৌনে ৩টার দিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সাংবাদিক গোলাম রাব্বানী নাদিমের মৃত্যু হয়।
শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে তার জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়েছে। জানাজায় হাজারো মানুষের ঢল নামে। পরে নাদিমের মরদেহ নিলক্ষিয়া গোমেরচর গ্রামে তার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। নাদিম বাংলানিউজটোয়েন্টিফোরের জামালপুর করেসপন্ডেন্ট ও বেসরকারি টেলিভিশন একাত্তরের উপজেলা প্রতিনিধি ছিলেন। প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদকরা।