সুবল বড়ুয়া, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ১৫ জুন ২০২৩ ১৩:০২ পিএম
আপডেট : ১৫ জুন ২০২৩ ১৩:০৫ পিএম
ফাইল ফটো
চলতি বছরের শেষ দিকে যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার কথা রয়েছে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মাণাধীন বঙ্গবন্ধু টানেল। প্রকল্পের ৯৭ দশমিক ৫ শতাংশ শেষ হলেও নির্ধারিত সময়ে (চলতি বছরের শেষার্ধে তথা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে) দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম এ টানেল খুলে দেওয়া সম্ভব হবে কি না তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
কারণ প্রকল্পের কাজের মাঝপথে ২০২২ সালে নিরাপত্তার স্বার্থে টানেলের দুই প্রান্তে স্ক্যানার বসানোর সিদ্ধান্ত হয়। ইল্যাংন্ড থেকে আনতে চাওয়া সে স্ক্যানার এখনও দেশে আসেনি। কবে নাগাদ আসবে তারও সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে।
জানা গেছে, নিরাপত্তার স্বার্থে টানেলের দুই প্রান্তে ১০টি স্ক্যানার বসানোর সিদ্ধান্ত হয়। প্রথম পর্যায়ে দুই প্রান্তে চারটি স্ক্যানার বসানোর কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। স্ক্যানার বসানোর উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। সন্ত্রাসী গোষ্ঠী গাড়িতে বিস্ফোরক নিয়ে টানেলের ভেতরে প্রবেশের সুযোগ পেলে নাশকতা ঘটাতে পারে। সে ক্ষেত্রে যানবাহন স্ক্যানিংয়ের পর টানেলে প্রবেশ নিশ্চিত করতে পারলে নাশকতার শঙ্কা অনেকাংশেই কমে যাবে বলে মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
স্ক্যানার স্থাপনের বিষয়ে জানতে চাইলে টানেলের প্রকল্প পরিচালক মো. হারুনুর রশিদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বহু লেন সড়ক টানেলের নির্মাণকাজের ৯৭ দশমিক ৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। বাকি নির্মাণকাজও একেবারে শেষ পর্যায়ে। ইংল্যান্ড থেকে স্ক্যানার আনা হচ্ছে। সে স্ক্যানার স্থাপনের পরই টানেল খুলে দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।’
শেষ মুহূর্তে চলমান কাজের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘টানেলের দুটি টিউবের খননকাজ শেষ। দুটি টিউবের মধ্যে অ্যাপ্রোচ সড়ক, ভায়াডাক্টসহ কার্পেটিং, পেইন্টিং, ক্যাবল ওয়্যারিং, সার্ভিস এরিয়ার নির্মাণকাজ একেবারে শেষ পর্যায়ে রয়েছে।’ কবে নাগাদ প্রকল্প উদ্বোধন হবে- এমন প্রশ্নে পরিচালক বলেন, ‘স্ক্যানার স্থাপন শেষে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে উদ্বোধনের বিষয়টি নির্ধারণ করবে।’
স্ক্যানার কেনা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ ফেরদাউস বলেন, ‘যান চলাচলের নিরাপত্তায় টানেলের উভয় প্রান্তে স্ক্যানার স্থাপন করা হবে। স্ক্যানারগুলো ইংল্যান্ড থেকে আনা হচ্ছে।’ তবে কবে নাগাদ এসব স্ক্যানার দেশে আসবে, সে বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলী স্পষ্ট করে সময় বা দিনক্ষণ বলতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘কখন এসব স্ক্যানার দেশে আসবে, সেটা এখনও নিশ্চিত নয়।’ নির্বাচনের আগে টানেল উদ্বোধন সম্ভব কি নাÑ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘স্ক্যানার আসুক বা না আসুক, টানেল উদ্বোধন হয়ে যাবে।’
নির্মাণকাজ চলাকালে ২০২১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু টানেলের উভয় প্রান্তে ট্রাফিক রুট নির্মাণসংক্রান্ত গঠিত কমিটির একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় টানেলের সার্বিক নিরাপত্তায় ও যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে জোর দেওয়া হয়। এতে টানেলের নিরাপত্তায় দুই প্রান্তে দুটি পুলিশ ফাঁড়ি নির্মাণ এবং অগ্নিদুর্ঘটনা প্রতিরোধে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপনের জন্য বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা হয়। পরে একই কমিটি ২০২২ সালের ৩ মার্চ টানেলের উভয় প্রান্তে (পতেঙ্গা ও আনোয়ারা) পুলিশ ফাঁড়ি ও ফায়ার স্টেশন নির্মাণের জন্য বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষকে লিখিত প্রতিবেদনের মাধ্যমে সুপারিশ করে। সে সুপারিশও বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে সেতু কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে টানেলের দুই প্রান্তে স্ক্যানার বসানোরও সিদ্ধান্ত হয়।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের তথ্যানুযায়ী, বঙ্গবন্ধু টানেলটি চট্টগ্রাম নগরীর পতেঙ্গার নেভাল একাডেমি প্রান্ত থেকে শুরু হয়ে চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) এবং আনোয়ারায় কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার লিমিটেড কারখানার মধ্যে নদীর তলদেশে সংযোগ স্থাপন করছে। ৩ দশমিক ৩২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের বঙ্গবন্ধু টানেলে টিউবের দৈর্ঘ্য ২ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার এবং ভেতরের ব্যাস ১০ দশমিক ৮০ মিটার।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ২০১৫ সালের নভেম্বরে ৮ হাজার ৪৪৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা ব্যয়ে যখন বহু লেন সড়ক টানেল প্রকল্পটি অনুমোদন করে, তখন প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছিল ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। পরে ডলারের মূল্যবৃদ্ধিসহ একাধিক কারণে প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা করা হয় এবং মেয়াদ ধরা হয় ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। তবে দ্বিতীয় দফায় আবারও প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয় এবং ব্যয় বাড়ানো হয় ১৬৪ কোটি টাকা। বর্তমানে প্রকল্পটির মোট ব্যয় বেড়ে ঠেকেছে ১০ হাজার ৫৩৮ কোটি ৪২ লাখ টাকায়।
২০২২ সালের ২৬ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু টানেলের একটি টিউবের পূর্তকাজের সমাপ্তি অনুষ্ঠানে ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘টানেল নির্মাণের কাজটি বাংলাদেশের বিস্ময়। নদীর তলদেশ থেকে টানেল বিদেশে দেখেছি। দক্ষিণ এশিয়ায় এটাই প্রথম। এটি আমাদের জন্য বিরাট কাজ। চট্টগ্রাম এক সময় অবহেলিত ছিল। আমরা ক্ষমতায় আসার পর ব্যাপক কাজ করেছি। টানেল নির্মাণের ফলে চট্টগ্রামসহ দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি আরও বেশি দৃশ্যমান হবে। টানেলের মাধ্যমে নদীর দুই পাড় সংযুক্ত হওয়ার কারণে টুইন সিটি হবে চট্টগ্রাম। কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ প্রান্তে চট্টগ্রাম শহরের চেয়েও পরিকল্পিত উন্নয়ন ঘটবে। নদীর অপর পাড়ে চট্টগ্রাম বন্দরের সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে।’