সাইদুর রহমান আসাদ, সুনামগঞ্জ
প্রকাশ : ১৪ জুন ২০২৩ ১২:৪৬ পিএম
ইজারা বাতিল করার পরও সুনামগঞ্জের ধোপাজান নদীর তীর কেটে অবৈধভাবে বালু ও পাথর তুলছে প্রভাবশালী চক্র। প্রবা ফটো
সরকারিভাবে ইজারা বন্ধ থাকলেও ধোপাজান নদীতে অবৈধভাবে ড্রেজার ও বোমা মেশিন চালিয়ে বালু ও পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, সাময়িক সময়ের জন্য ইজারা পাওয়ার আগের পাথরগুলো না সরিয়ে এখনও নদী থেকে পাথর তোলার কাজ চলছে।
একটি চক্রের বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রশাসনকে জড়িয়ে কৌশলে কোটি টাকার বালু-পাথর বিক্রি করার অভিযোগ উঠেছে। এতে ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে কয়েক কিলোমিটার নদীতীর। সম্প্রতি এমন অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নদীতে শ্রমিক দিয়ে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করে জানান, ড্রেজার ও বোমা মেশিন দিয়ে রাতের বেলাও পাথর উত্তোলন করা হয়। প্রতি পাথর নিলামকারীরা কেনেন প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা দরে। পরে পাথরগুলো নদীপথে বিভিন্ন এলাকায় চলে যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানান, সুনামগঞ্জ সদর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত ধোপাজান নদীর বালু মিশ্রিত পাথর মহাল। এটি সর্বশেষ ২০১৮ সালে ৬ মাসের জন্য প্রায় ১৭ লাখ টাকায় খণ্ডকালীন ইজারা দিয়েছিল সরকার। এরপর থেকে ইজারা বন্ধ রয়েছে। কিন্তু ইজারা বন্ধ থাকলেও নদী থেকে বালু-পাথর উত্তোলন থেমে নেই বলেও তারা জানান।
জানা গেছে, সম্প্রতি অভিযান চালিয়ে পাথর জব্দ করেছে প্রশাসন। জব্দ করা পাথরের পরিমাণ ১ লাখ ৬৪ হাজার ১৭৩ ঘনফুট। পরে তা ২২ মে প্রকাশ্যে নিলামের মাধ্যমে প্রতি ঘনফুট ৮৩ টাকা দরে কাইয়ারগাঁও গ্রামের বাসিন্দা আ. জলিলের ছেলে ফারুক মিয়ার কাছে বিক্রি করা হয়। ফারুক মিয়া আয়কর ও ভ্যাটসহ প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ ৩২ হাজার ৯৪৯ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেন। অভিযানকালে সদর উপজেলা প্রশাসন ৩০ মে থেকে ৩০ জুন, অর্থাৎ এক মাসের মধ্যে পাথর সরানোর জন্য কার্যাদেশ দেন নিলাম গ্রহণকারীকে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কাইয়ারগাঁও গ্রামের এক বাসিন্দা জানান, প্রতিদিন হাজারো শ্রমিক নদীতে পাথর উত্তোলন করে। নিলামকারী ব্যবসায়ীদের নির্দেশে সেগুলো নদীর পাড়ে জমা করে রাখে। বেশি পাথর জমা হলে ওই ব্যবসায়ীরা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা টাস্কফোর্স অভিযান চালিয়ে সেগুলো জব্দ করে। এরপর নিলামে নেওয়া পাথর হিসেবে সেগুলো চালান করা হয়।
এলাকাবাসীরা জানায়, নিলামকারী ও তার সহযোগীরা শ্রমিক দিয়ে নদী থেকে পাথর উত্তোলন করায়। তারা সাময়িক নিলামে পাওয়া পাথরগুলো অপসারণ না করে প্রকাশ্যে নদী থেকে আরও পাথর উত্তোলন করে বিক্রি করছে।
জানা গেছে, এক মাসের জন্য পাথর তোলার ইজারা নিয়ে নিলামকারী ফারুক মিয়া ১ লাখ ৬৪ হাজার ১৭৩ ঘনফুট পাথরের মধ্যে এখনও ২০ হাজার ঘনফুট পাথর সরাতে পারেননি। তিনি জানান, একটি বড় নৌকা বোঝাই করতে কমপক্ষে ৫ থেকে ৬ দিন লাগে। পাড় থেকে ছোট নৌকায় পাথর এনে বড় নৌকা বোঝাই করতে হচ্ছে। এতে তিনি এক কোটি টাকা লোকসানের মধ্যে আছেন বলেও দাবি করেন। ইজারা দেওয়া বন্ধ থাকার পরেও বালু-পাথর তোলার অভিযোগের বিষয়ে তিনি জানান, ভোর ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত পাথর সরানোর কাজ করি। এরপরে কারা এখানে কাজ করে জানেন না তিনি।
গত বৃহস্পতিবার সংশ্লিষ্ট স্থান পরিদর্শনে যান পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেট বিভাগের সহকারী পরিচালক মোহাইমিনুল হক। তিনিও নদীতে ড্রেজার ও বোমা মেশিন চালিয়ে পাথর উত্তোলনের সত্যতা পেয়েছেন। তিনি জানান, অভিযোগ পেয়ে সেখানে যাই। প্রাথমিকভাবে ড্রেজার মেশিন চালানোর সত্যতা পেয়েছি। নদীর পাড় কেটে যে অবস্থা করা হয়েছে সেটি ভবিষ্যতের জন্য হুমকিস্বরূপ। বড় ধরনের বন্যা বা দুর্যোগ এলে পাড় ভেঙে তীরবর্তী মানুষ ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হবে।
জেলা প্রশাসক দিদারে আলম মোহাম্মদ মাকসুদ চৌধুরী জানান, মহামান্য হাইকোর্টের রিট থাকার ফলে ধোপাজান নদীতে দীর্ঘদিন ইজারা বন্ধ রয়েছে। এরপরেও কেউ অবৈধভাবে বালু-পাথর তুলে নেওয়ার চেষ্টা করলে সেগুলো আটক করেন। পরে উন্মুক্ত নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করেন। সেগুলো নেওয়ার সময় নিলামকারী নদী থেকে তুলে নেওয়ার অভিযোগও পেয়ে থাকেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখে সত্যতা পেলে নিলাম বাতিল ও টাকা বাজেয়াপ্ত করবেন বলেও তিনি জানান।