দুই সিটিতে নির্বাচন
শাকিল ফারুক, ঢাকা, মঈনুল হক সবুজ, বরিশাল ও সনীল দাস চৌধুরী, খুলনা
প্রকাশ : ১৩ জুন ২০২৩ ০৯:৫১ এএম
আপডেট : ১৩ জুন ২০২৩ ১০:১৮ এএম
বরিশালে সোমবার ভোট চলাকালে ইসলামী আন্দোলনের মেয়রপ্রার্থী মুফতি ফয়জুল করীমের ওপর হামলা।
গাজীপুর সিটি নির্বাচনে ফল বিপর্যয়ের পর বরিশালে দলীয় প্রার্থীর জয় নিয়ে বেশ চাপেই ছিল আওয়ামী লীগ। কারণ বর্তমান মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ সেরনিয়াবাতকে বাদ দিয়ে তার চাচা আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ ওরফে খোকন সেরনিয়াবাতকে নৌকার প্রার্থী ঘোষণার পর স্থানীয় আওয়ামী লীগে মাথাচাড়া দেয় বিভেদ। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নৌকা ডোবানোর পরিকল্পনা ছিল মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী অন্য প্রার্থীদের।
তাই ‘বিএনপিবিহীন’ ভোটের মাঠেও দলের প্রার্থীকে নিয়ে দুশ্চিন্তা পোহাতে হয়েছে ক্ষমতাসীনদের।অবশেষে সেই চিন্তার অবসান ঘটল খোকন সেরনিয়াবাতের বিজয়ের মধ্য দিয়ে। গতকাল সোমবার অনুষ্ঠিত বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৮৭ হাজার ৮০৮ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন খোকন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী সৈয়দ ফয়জুল করীম পেয়েছেন ৩৩ হাজার ৮২৮ ভোট। বরিশালে ভোট পড়েছে ৫১ দশমিক ৪৬ শতাংশ।
অন্যদিকে গতকাল খুলনা সিটি নির্বাচনে প্রত্যাশিতভাবেই মেয়র পদে ফের বিজয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক। ১ লাখ ৫৪ হাজার ৮২৫ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামী আন্দোলনের আব্দুল আউয়াল পেয়েছেন ৬০ হাজার ৬৪ ভোট। খুলনায় ভোট পড়েছে ৪২ থেকে ৪৫ শতাংশ।
এর মধ্য দিয়ে গাজীপুরের ধকল কাটিয়ে ফের জয়ের বন্দরে ভিড়েছে নৌকা। তবে গত ২৫ মে অনুষ্ঠিত গাজীপুর সিটির ভোট যেভাবে সর্বসম্মতিক্রমে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে, বরিশাল ও খুলনার ভোট নিয়ে তেমনটি বলার সুযোগ নেই। কারণ গতকাল এই দুই সিটির ভোটে দেখা গেছে চিরাচরিত সেই হাঙ্গামার চিত্র। ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর পক্ষে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ, অন্যান্য বিরোধী দলের এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া, নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে প্রার্থীদের অসন্তোষ, সংঘর্ষ-উত্তেজনা, ভোটকেন্দ্রে বহিরাগতদের উৎপাত এবং শেষ পর্যন্ত ফল বর্জনের ঘোষণার মতো ঘটনা ঘটেছে দুই সিটিতে।
বরিশালে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী ফয়জুল করীমের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। ফয়জুল করীম ইসলামী আন্দোলনের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা এবং চরমোনাইয়ের বর্তমান পীরের ছোট ভাই। তার ওপর হামলার খবর পেয়ে ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মী, সমর্থক এবং চরমোনাই পীরের অনুসারীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তারা একাট্টা হয়ে বরিশাল নগরে প্রবেশের চেষ্টা চালালে ভোটের মাঠে উত্তাপ বাড়তে থাকে।
ফয়জুল করীমের রক্তাক্ত ছবি বিভিন্ন মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর পরিস্থিতি অশান্ত হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দেয়। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নির্বাচন কর্মকর্তাদের তৎপরতায় অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেছে। এ ছাড়া জাতীয় পার্টির প্রার্থী ইকবাল হোসেন তাপসও অভিযোগ করেছেন নৌকার কর্মীরা তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছেন। খুলনার ভোটের পরিবেশ নিয়েও সকাল থেকে নানা অভিযোগ করেছেন ইসলামী আন্দোলনের আউয়াল এবং জাতীয় পার্টির শফিকুল ইসলাম মধু।
দুই সিটিতে গতকালের ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম)। যথারীতি এ নিয়ে ভোটারদের মধ্যে দেখা গেছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। অনভ্যস্ততা এবং ধীরগতির কারণে বরিশালে ইভিএম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অনেকে। আবার প্রথমবার ইভিএমে ভোট দিয়ে উচ্ছ্বাসেরও কমতি ছিল না অনেকের। তবে খুলনায় ইভিএম নিয়ে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন, ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী। তিনি দাবি করেছেন, তার প্রতীক হাতপাখায় ভোট দিলেও সেটি নৌকায় চলে গেছে।
এসব ঘটনার পরও প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেছেন, দুই সিটির ভোট নিয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সন্তুষ্ট। ভোটগ্রহণ শেষে গতকাল বিকালে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তিনি বলেন, ‘আমার পর্যবেক্ষণ হলো, কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল। তা ছাড়া ভোটগ্রহণ পরিস্থিতি সুন্দর ও সুচারু ছিল। এতে আমরা সন্তুষ্ট। সার্বিকভাবে ভোটগ্রহণ পরিবেশ বেশ সুশৃঙ্খল ও উৎসবমুখর ছিল।’ নির্বাচনে অনিয়ম ঠেকাতে গতকাল রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে বসে সিসি ক্যামেরায় ভোট পর্যবেক্ষণ করেছেন নির্বাচন কমিশনাররা।