শেরপুর প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১১ জুন ২০২৩ ১১:৫৬ এএম
বৈদ্যুতিক বেড়ার তার ছিঁড়ে গেছে, ভেঙে গেছে খুঁটি। প্রবা ফটো
শেরপুরের গারো পাহাড়ে হাতি-মানুষের দ্বন্দ্ব নিরসনের জন্য সরকার বৈদ্যুতিক বেড়া বানিয়েছিল। ৯১ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত দেশের প্রথম এই বেড়া বছর না যেতেই পুরোপুরি অকেজো হয়ে গেছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, কোথাও তার ছিঁড়ে গেছে, কয়েকটি জায়গায় খুঁটি থাকলেও শুকানো হচ্ছে কাপড়, নিয়ন্ত্রণকক্ষ তালাবদ্ধ থাকলেও নেই কোনো যন্ত্রপাতি, চুরি হয়ে গেছে ব্যাটারি, নেই সোলার প্যানেলও। কিছু জায়গায় বেড়ার লাইন থাকলেও তা টিন দিয়ে ঘিরে রেখেছেন স্থানীয়রা। তারে জং ধরে গেছে অনেক দূর পর্যন্ত। কোথাও বা খুঁটি চুরি হয়ে গেছে। এসব কারণে প্রকল্পটির ওপর আস্থা হারিয়েছেন পাহাড়িরা।
বন বিভাগের তথ্যমতে, জেলার সীমান্তবর্তী শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার বিশাল এলাকাজুড়ে অবস্থিত গারো পাহাড়। পাহাড়ি জনপদের মানুষের প্রধান সমস্যা বন্য হাতি। হাতির উপদ্রব থেকে বাঁচতে ২০১৭ সালে শেরপুরের ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী সীমান্তে ১৩ কিলোমিটারে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে বৈদ্যুতিক বেড়া বানায় বন বিভাগ। তৎকালীন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা গোবিন্দ রায় জানান, বিশ্বব্যাংকের সহায়তার ৯১ লাখ টাকায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছিল বন বিভাগ। প্রকল্পটি কেন কাজে এলো না, সে বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারেননি।
ঝিনাইগাতী উপজেলার কাংশা ইউনিয়নের বাসিন্দা শাহজাহান আলী, এরশাদ আলী ও মাসুদ আলম জানান, নির্মাণের কিছুদিন পরই জং ধরে তার ছিঁড়ে যায়। বনের লতা পেঁচিয়ে নষ্ট হতে থাকে লাইনের তারগুলো। সরকারি কোনো লোকজন এসব ঠিক করতে আসে না। ছোট গজনী এলাকার বাসিন্দা ইলিছুর সাংমা বলেন, ‘মামু, এল্লে আর দরকার নাই। আগে দিছিল। তারপরই লাইন নষ্ট হয়ে গেছে গা। সরকারের হুদা হুদা ট্যাহা গচ্চা।’
বাবলা কোনার কাঞ্চন মি. মারাক বলেন, ‘হাতি তাড়াতে এ বেড়া কোনো কাজে আসেনি। বন বিভাগের লোকজন এ বেড়ার নামে টাকা মেরে দিয়েছে। কারণ এখানে নিম্নমানের তার ব্যবহার করা হয়েছে। যার কারণে তারগুলো কিছুদিনের মধ্যে জং পড়ে ছিঁড়ে যায়। তা ছাড়া বেড়া নির্মাণের পর বন বিভাগের কেউ দেখতে আসেনি। সোলার প্যানেলও নষ্ট হয়ে যায়। ব্যাটারিগুলো চুরি হয়ে গেছে। এখন প্রশ্ন হলো, তালাবদ্ধ ঘর থেকে কীভাবে ব্যাটারি চুরি হয় আর কেন কেউ এগুলো তদারক করতে আসেনি?’
এই বেড়া অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল বলে মনে করেন বাংলাদেশ এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের ট্রেইনার আদনান আজাদ। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন মিডিয়াতে দেখেছি বন বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও আফ্রিকার আদলে তৈরি করা হয়েছে এই বেড়া। কিন্তু ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কার সঙ্গে এই বেড়ার কোনো মিল পাইনি আমরা। আমাদের টিম গারো পাহাড়ের ওই প্রকল্পটি পরিদর্শন করেছে। সেখানে অত্যন্ত নিম্নমানের তার ব্যবহার করা হয়েছে, যে কারণে অল্প দিনেই সেগুলো ছিঁড়ে গেছে। আর তদারকের অভাবে নিয়ন্ত্রণকক্ষসহ পুরো প্রকল্পটি ভেস্তে গেছে। সরকার সঠিক নজরদারি ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলে সীমান্ত অঞ্চলে যে হাতি-মানুষের দ্বন্দ্ব আছে, তা নিরসন করা সম্ভব।’
সবুজ আন্দোলনের শেরপুর শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক সাবিহা জামান শাপলা বলেন, সঠিক পরিকল্পনা আর নিয়মিত তদারকির অভাবে প্রকল্পটি বছর না যেতেই ভেস্তে যায়। এতে উপকারের বদলে সরকারের ক্ষতি হয়েছে। তবে প্রধান বিভাগীয় বন সংরক্ষক আমির হোসাইন চৌধুরী বলছেন, এটি ছিল দেশের প্রথম প্রকল্প। এখানে যেসব ত্রুটি ছিল তা থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে গারো পাহাড়ে আরও ১০ কিলোমিটার বৈদ্যুতিক বেড়া বানানো হবে। পাশাপাশি আগের ১০ কিলোমিটারও সংস্কার করা হবে।