শরীয়তপুর প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১০ জুন ২০২৩ ১৯:০২ পিএম
আপডেট : ১০ জুন ২০২৩ ১৯:২৪ পিএম
শরীয়তপুরে ছিনতাই মামলার আসামিকে নির্যাতন। প্রবা ফটো
ছিনতাই মামলার চার আসামিকে এবার নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে শরীয়তপুরের নড়িয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেল মনির ও পদ্মা সেতু দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকতা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে। ওই ৪ আসামির পরীক্ষা-নিরিক্ষা করে শরীরে বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে জানিয়ে সদর হাসপাতাল থেকে ৬ জুন আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।
নির্যাতনের শিকার আসামিরা হলেন- শরীয়তপুরের জাজিরার নাওডোবা এলাকার সাদ্দাম চোকদার, বকুল চোকদার, আনোয়ার হোসেন ও সাইদুল শেখ।
এদিকে ওই ঘটনায় সদ্দাম ও বকুলের আত্মীয় নাওডোবা এলাকার ব্যবসায়ী আবু জাফর ওরফে ঠান্ডু চোকদারকে থানায় আটকে পিটিয়ে ৭২ লাখ টাকার চেক লিখে নেওয়ার অভিযোগে পদ্মা সেতু দক্ষিণ থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

থানা সূত্র ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জাজিরার আহাদী বয়াতিকান্দি গ্রামের শাহীন আলম শেখ ও তার সহযোগী ছোট কৃষ্ণনগর গ্রামের সেকান্দার মাদবরের কাছ থেকে গত ২১ মে ১৭ হাজার ডলার, টাকা ও মুঠোফোন ছিনতাই হয়। তাতে ২১ লাখ ১৫ হাজার ২৫০ টাকা খোয়া গেছে এমন অভিযোগ এনে পদ্মা সেতু দক্ষিণ থানায় মামলা করেন শাহীন আলম। এতে বকুল চোকদার, সাদ্দাম চোকদার, সাইদুল শেখ ও আনোয়ার হোসেনসহ ৯ জনকে আসামি করা হয়।
ভুক্তভোগী ওই চার আসামির ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৯ মে তারা উচ্চ আদালত থেকে ৬ সপ্তাহের জামিন পান। এরপর রাতে তারা ঢাকার কেরানীগঞ্জের একটি বাসায় অবস্থান করছিলেন। সেখানে তাদের ওপর চড়াও হন জাজিরা উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি রুবেল ব্যাপারী ও ছিনতাই মামলার বাদীর আত্মীয় শহীদুল ইসলাম। পরে রুবেল অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেল মনির ও ওসি শেখ মোস্তাফিজুর রহমানকে মুঠোফোনে কেরানীগঞ্জের ওই বাসায় ডেকে নেন। সেখানেই একটি কক্ষে আটকে তাদের নির্যাতন করা হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রলীগ নেতা রুবেল ব্যাপারী মুঠোফোনে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, যার ডলার এবং টাকা ছিনতাই হয়েছে, তিনি তার ভাগ্নে হন। তাকে সহযোগিতা করার জন্য সামাজিকভাবে তিনি মামলার আসামিদের ওপর চাপ প্রয়োগ করেছিলেন। ঢাকায় তাদের অনুসরণ করে পুলিশে ধরিয়ে দিয়েছেন। তখন ধস্তাধস্তিতে তারা ব্যথা পেতে পারেন।

গত ২৯ মে রাতে ওই চার আসামিকে গ্রেপ্তার করা হলেও ১ জুন তাদের চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে হাজির করেন পদ্মা সেতু দক্ষিণ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সুরুজ উদ্দিন আহম্মেদ। তিনি আসামিদের আদালতে উপস্থাপন করার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন আসামিদের গ্রেপ্তারের সময় ধস্তাধস্তিতে তারা জখম হয়েছে। তাদের জাজিরা উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
৪ জুন ওই চার আসামির জামিন ও রিমান্ড শুনানির দিন ছিল। ওই দিন আসামিপক্ষের আইনজীবী চারজনকে গ্রেপ্তারের পর শারীরিক নির্যাতনের বিষয় আদালতের নজরে আনেন। আদালত তাদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে মেডিকেল প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ককে নির্দেশ দেন।
সদর হাসপাতাল থেকে ৬ জুন আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। মেডিকেল প্রতিবেদনের বিষয়ে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা সুমন কুমার পোদ্দার বলেন, ৪ জুন সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আল-ইমরান চার আসামিকে হাসপাতালে পাঠিয়েছেন। শারীরিক পরীক্ষা-নিরিক্ষা করে দেখেছেন, তাদের শরীরে বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
ভুক্তভোগী সাদ্দাম চোকদার বলেন, ‘আমাদের চোখ বেঁধে আটকে রেখে দুদিন ধরে পিটিয়েছে। হাতুড়ি দিয়ে হাড় ও হাত পায়ের গিরায় পেটানো হয়েছে। প্লাস দিয়ে হাত ও পায়ের নখ তুলে দেওয়া হয়েছে। আমার বাম চোখে লাথি মেরেছে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেল মনির।’
নড়িয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেল মনিরের কাছে আসামিদের নির্যাতনের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি তা অস্বীকার করেন। এর বেশি কিছু বলতে তিনি রাজি হননি।
তবে ওসি শেখ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, একটি সন্ত্রাসবিরোধী ও ছিনতাই মামলার চার আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। তাদের কোনো নির্যাতন করা হয়নি। ওই অভিযোগ সঠিক নয়। অপরাধীরা হয়তো মামলা থেকে বাঁচার জন্য পুলিশের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ করছেন।
শরীয়তপুরের পুলিশ সুপার সাইফুল হক বলেন, আসামিদের গ্রেপ্তারের সময় নির্যাতন করেছে এমন কোনো অভিযোগ তার কাছে কেউ করেনি। বিষয়টি আদালতের নজরে এসেছে কিনা তা জানা নেই। তবে নাওডোবা এলাকার এক ব্যবসায়ীর একটি অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।