সাইফুল হক মোল্লা দুলু, মধ্যাঞ্চল
প্রকাশ : ১০ জুন ২০২৩ ১৩:৪৯ পিএম
পানি না থাকায় আসছেন না পর্যটক। কিশোরগঞ্জ হাওরে অলস সময় পার করছেন পর্যটকবাহী নৌকার মাঝিরা। প্রবা ফটো
জ্যৈষ্ঠ মাস শেষ হতে চলছে। এ সময় হাওরে পানি থৈ থৈ করার কথা। কিন্তু সেখানকার মাটি শুকিয়ে চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। পানি না থাকায় মাছের উৎপাদন কমে গেছে। নতুন পানিতে মা মাছ ডিম ফুটিয়ে বংশবৃদ্ধি করে।
কিন্তু এবার পানি তলানিতে চলে যাওয়ায় অসংখ্য মা মাছ মারা গেছে। এতে দেশি মাছের কয়েটি জাত বিলুপ্ত হবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। হাওরে ঝিনুক, শামুকসহ ডুবোজলের উদ্ভিদের অস্তিত্ব কমে যাওয়ায় হাঁসের খামারগুলোয়ও খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, অল্প কিছু জমে থাকা পানি ছাড়া প্রায় পুরো হাওর শুকিয়ে গেছে। অথচ জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়কে হাওর এলাকায় ভরা বর্ষার মাস বলা হয়। এ সময় পানি না থাকায় মাছের উৎপাদন কমে গেছে। এতে মৎস্যজীবী ও জেলে সম্প্রদায় বিপাকে পড়েছে। তারা জানান, করিমগঞ্জের বালিখলা ও ভৈরবে রাতের মাছের বাজারে প্রতিদিন তিন কোটি টাকার মাছ বিক্রি হতো। এখন দুই মোকামে এক কোটি টাকার দেশীয় মাছ বিক্রি হয় না।
ইটনা হাওরের জেলেপাড়ার বাসিন্দা মদন ধর, মধুবন ধরসহ জেলে সম্প্রদায়ের একাধিক ব্যক্তি জানান, বৈশাখ মাসের শুরুতেই হাওরে পানি আসা শুরু হয়। ১৫ তারিখের পর পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির পানিতে হাওরে পানির বিশাল ঢেউ লক্ষ্য করা যায়। এ সময় নতুন পানিতে মা মাছ বাচ্চা ফুটিয়ে বংশবৃদ্ধি করে। এবার পানি না থাকায় মা মাছ মারা গেছে।
শুষ্ক থাকায় হাওরের প্রকৃতি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকিতে পড়েছে। ঝিনুক, শামুক ও পানিজাতীয় উদ্ভিদের অস্তিত্ব কমে গেছে। হাঁসের খাবার কিনতে হচ্ছে বাজার থেকে। খামারিরা জানান, হাওরে হাঁস ছেড়ে দিলে তারা ৬০ ভাগ খাবার সংগ্রহ করতে পারত। ৪০ শতাংশ খাবারের জোগান দিতে হতো। এখন পানি না থাকায় ৮৫ শতাংশ খাবার কিনতে হচ্ছে।
‘হাওর অঞ্চলবাসী’ সংগঠনের সমন্বয়কারী প্রকৌশলী এনায়েতুর রহমান জানান, আগামী কয়েক বছর পর দেশে মিঠাপানির মাছের অস্তিত্ব থাকবে না। খাদ্য উৎপাদন কমে যাবে। এতে আগামী প্রজন্ম খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদা পূরণ করতে পারবে না। এ নিয়ে এখনই সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে পড়তে হবে।
হাওর ও মৎস্য বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ আজহার আলী জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি হাওরে অপরিকল্পিত সড়ক, রাস্তাঘাট, বাসাবাড়ি ও অট্টালিকা নির্মাণের কারণে এবং হাওরে বাঁধ দিয়ে নদীর পানি আটকে দেওয়ায় প্রতি বছর পানি কমে যাচ্ছে। হাওরের উন্নয়ন যথাযথ সমীক্ষাভিত্তিক হচ্ছে না বলেও তিনি অভিযোগ করেন। এ বিষয়ে সম্মিলিত উদ্যোগ ও সমীক্ষার প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি আরও জানান, বর্ষায় জেলে সম্প্রদায়ের লোকজন ও মৎস্যজীবীরা হাওরের ভাসান পানিতে মাছ আহরণ করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে। এবার জেলেপল্লীতে মাছ ধরার উৎসব নেই। জেলেরা প্রায় বেকার হয়ে পড়েছেন।
জেলা মৎস্য কর্মকতা রিপন কুমার পাল জানান, তাপপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত কম হওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে হওরের পানি কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ও ভারতে ব্যাপকভাবে বন-জঙ্গল কমিয়ে ফেলা বৃষ্টি কম হওয়ার অন্যতম কারণ।
হাওরবাসীর মতে, সামনে পানি আসবে এমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ঢলের পানির স্রোতে প্রাকৃতিকভাবে মাছের প্রজনন হয়। পানি কম থাকায় বংশবৃদ্ধি কমে গিয়ে মাছের সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে দেশীয় মাছের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। অনেকগুলো দেশীয় প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। যে মাছগুলো টিকে আছে, তারাও এবার পানির অভাবে বিলুপ্ত হবে।
পরিবেশ রক্ষা আন্দোলেনের জেলা সাধারণ সম্পাদক সাইফুল জুয়েল জানান, প্রথমত পানি কম আসায় জমিতে পলি পড়বে কম। এতে ফসল উৎপাদন কমে যাবে। জমিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের মাত্রা পানির স্রোতে প্রশমিত হতো। জমিতে পড়ে থাকা খড় ও ঘাস পানিতে পচে জৈবসারের সৃষ্টি করে। এবার তা না হওয়ায় আগামী মৌসুমে উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কিশোরগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান নূরে আলম জানান, হাওরে বর্ষা মৌসুমে ৯০ শতাংশ এলাকায় পানি থাকে। শত শত বছরের প্রাকৃতিক এই নিয়ম হঠাৎ করে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।