রিকোর্স চাকমা, রাঙামাটি
প্রকাশ : ০৮ জুন ২০২৩ ১২:০৯ পিএম
আপডেট : ০৮ জুন ২০২৩ ১৫:৫৪ পিএম
রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদে নৌকা ঠেলে পার করে দিচ্ছেন কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবী। প্রবা ফটো
শুষ্ক মৌসুমে সাধারণত হ্রদ ও নদ-নদীর পানি কমে যায়। দেখা দেয় নাব্য সংকট। এতে নৌযান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। এমনই পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদের বরকল উপজেলার শুভলং ইউনিয়নের শিলার ডাক নামক এলাকায়। অস্বাভাবিক মাত্রায় পানি কমে যাওয়ায় ডুবোচরে ইঞ্জিনচালিত নৌকাগুলো সেখানে প্রায় আটকে যায়। এ কারণে স্থায়ীয় বেশ কয়েক ব্যক্তি ঐক্যবদ্ধ হয়ে ওই জায়গা খনন করেছেন। পাশাপাশি নৌকাগুলো ঠেলে পার করে দিচ্ছেন তারা। স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে এভাবে তারা মানবসেবা করছেন।
জানা যায়, কাপ্তাই হ্রদই রাঙামাটির বাঘাইছড়ি, লংগদু, বরকল ও জুরাছড়ি উপজেলার মানুষের নৌপথে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে কাপ্তাই হ্রদে অস্বাভাবিক মাত্রায় পানি কমে যাওয়ায় পুরো চার উপজেলার মানুষের যাতায়াত খুব কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। যাত্রীদের প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। বিশেষ করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারছেন না।
সরেজমিনে দিয়ে দেখা যায়, স্থানীয় ২০ থেকে ২৫ জন যুবক মিলে শিলার ডাক নামক এলাকায় ওই হ্রদের ডুবোচরে আটকে পড়া নৌকাগুলো ঠেলে পার করে দিচ্ছেন। বিনিময়ে যাত্রীবাহী নৌকার চালকরা তাদের কষ্টের কথা চিন্তা করে বকশিশ হিসেবে ২০, ৩০, ৫০ টাকা দিয়ে যান।
এভাবে নৌকা পারাপারের কাজে যুক্ত সুমন চাকমা বলেন, ‘২০-২৫ দিন আগে আমরা দেখতাম এই জায়গায় প্রচুর নৌকা আটকে গিয়ে জ্যাম লেগে যেত, এতে যাত্রীদেরও ভোগান্তির শিকার হতে হতো। তাই আমরা এলাকাবাসী মিলে নিজস্ব উদ্যোগে হ্রদের চ্যানেলটি খনন করে এলাকার ২৫ জনের মতো লোক নিজের কাজকর্ম ফেলে এখানে বোট ঠেলার কাজ করি। যেহেতু মানবিক কাজ করতেছি, সেই হিসেবে স্বেচ্ছায় চালকরা যা দিচ্ছেন, তা নিচ্ছি। দিন শেষে হিসাব করলে দেখা যায় যে আমাদের ২৫ জন লোকের ১০০ থেকে ২০০ টাকা করে ভাগে পড়ে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যেহেতু মানবসেবা করতেছি দশজন মানুষ উপকার পাচ্ছে; এটাই অনেক। তাই আমরা টাকার জন্য জোরজবরদস্তি করি না।’
নিবারণ চাকমা বলেন, ‘সাধারণ মানুষের যোগাযোগের কষ্টের বিষয়টি বিবেচনা করে আমরা স্থানীয় যুবকরা মিলে গত মঙ্গলবারসহ ১৮ দিন হবে এ কাজে যুক্ত হয়েছি। এই ডুবোচরে যদি যাত্রীবাহী বা রোগীবাহী নৌকা কোনো কারণে আটকে যায়, আমরা তখন ঠেলাঠেলি করে যত দ্রুত পার করার চেষ্টা করি। তখন আমাদের মনে একটা ভালো লাগা কাজ করে। যদি স্বেচ্ছায় কেউ ২০-৫০ টাকা দিয়ে যায়, এতে আমরা সন্তুষ্ট।’
নৌকাচালক আলোময় চাকমা বলেন, পানি কমে যাওয়ায় চলাচলে অসুবিধা হয়। অনেক সময় নৌকা আটকে গেলে ঠেলে ঠেলে নিয়ে যেতে হয়। এখানে এলাকাবাসীরা নৌকা ঠেলাঠেলির কাজ করার কারণে এখন কিছুটা সুবিধা হয়েছে।
স্পিডবোটচালক মো. মামুন বলেন, ‘আগে বোট নিয়ে যেতে খুব কষ্ট হতো, চরে আটকে গেলে জ্যামে পড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লেগে যেত। এখন এই এলাকাবাসী হ্রদটি একটু খনন করার পর চলাচলের ভোগান্তি কমেছে। তবে মাঝে মাঝে আটকে গেলে তারা আবার ঠেলে ঠেলে ওই অংশটুকু পার করে দেন। তবে তাদের কষ্টের বিষয়টি চিন্তা করে সামান্য ২০-৩০ টাকা বকশিশ দিই।’
নৌকার যাত্রী বল্লাল সেন চাকমা বলেন, ‘পানি শুকিয়ে যাওয়ার কারণে আমাদের যাতায়াতে ভোগান্তির শিকার হতে হয়। নির্দিষ্ট সময় গন্তব্য স্থানে পৌঁছাতে পারি না। যে জায়গায় তিন ঘণ্টা সময় লাগত সেই জায়গায় পাঁচ-ছয় ঘণ্টায়ও পৌঁছানো যায় না। স্থানীয়রা একতাবদ্ধ হয়ে যখনই মাটি খনন করেন এবং নৌকাগুলো ঠেলে ডুবোচর পার করার কাজ শুরু করেন তখন থেকে আমাদের তেমন ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে না। এখন অনেক সুবিধা হচ্ছে।’
বালুখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অমর কুমার চাকমা বলেন, ‘সুবলং ইউনিয়ন আর আমার বালুখালী ইউনিয়নের মাঝখানে জেগে ওঠা ডুবোচরে অনেক সময় মালামাল ও যাত্রীবাহী নৌকাগুলো আটকে যায়। পরে বিষয়টি আমার নজরে আসে। তখন আমি আমার এলাকাবাসীকে অনুরোধ করেছি যেন তারা সেখানে মানবিক সহায়তা দেয় এবং এজন্য জোরপূর্বকভাবে যেন টাকা দাবি না করে। যদি কেউ বকশিশ দেয় তখন যেন নেওয়া হয়। এলাকাবাসী আমার কথায় সাড়া দিয়ে সেখানে তারা নিরলসভাবে মানবিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন। এজন্য আমি এলাকাবাসীকে ধন্যবাদ জানাই।’
রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর বলেন, কাপ্তাই হ্রদসহ সংশ্লিষ্ট শাখাসমূহে ড্রেজিংয়ের জন্য নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। সেটি বাস্তবায়ন হলে নাব্যতাসহ অন্যান্য সংকট কেটে যাবে। এই এলাকার মানুষের যোগাযোগের দুভোর্গ কমে আসবে।