সুনামগঞ্জ প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৩ জুন ২০২৩ ২১:৫১ পিএম
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল শিশু রিফাত। ছবি: সংগৃহীত
রিফাত। সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার লম্বাবাঁক পশ্চিমপাড়া আব্দুস ছোবহান তালুকদার ও লালমিয়া তালুকদার নূরানীয়া মাদ্রাসার শিশু শ্রেণির শিক্ষার্থী। বয়স এখনো পাঁচ বছর পূর্ণ হয়নি। তবে ক্লাসের অন্য শিক্ষার্থীদের থেকে কিছুটা আলাদা সে। ভুল হলেও প্রশ্নের সাবলীল উত্তর, দৃষ্টিভঙ্গি ও কথোপকথন নজর কাড়ে।
শিক্ষকের সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, এমনকি ভুল উত্তর হলেও সেটা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দেওয়া, অন্যদের চেয়ে কিছুটা ব্যতিক্রম বাচনভঙ্গিই খুদে শিক্ষার্থী রিফাতকে আলাদা করেছে অন্যদের থেকে। তবে রিফাতের এই স্বতন্ত্র্য বৈশিষ্ট রীতিমত কাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন এখন।
সম্প্রতি ক্লাসে রিফাতকে পাঠদানের সময় করা একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়। সেখানে ইংরেজি সাত দিনের নাম, জাতীয় ফল, মাছ, ফুলের নাম জানতে চান শিক্ষক।
সেগুলোরই চমৎকার উত্তর দেয় রিফাত। কিছু উত্তর ভুল হলেও বলার সময় আত্মবিশ্বাস সামাজিক যোগাযোগ মধ্যামের দর্শকদের নজর কেড়েছে। তবে এটি যে তার এই শিশু জীবনেই বয়ে আনবে বিড়ম্বনা সেটি ঠাওর করতে পারেনি কেউ।
ক্লাসে রিফাতের সেই প্রশ্নের ভুলভাল উত্তরের পর শুরু হয়েছে তাকে নিয়ে টানাহেঁচড়া। নামে- বেনামে ফেসবুক আর ইউটিউব চ্যানেল থেকে অসংখ্য ইউটিউবার তার ভিডিও নিতে ছুটে চলেছেন মাদ্রাসায়।
ক্লাসে কিংবা ক্লাসের ফাঁকে সারাটা দিন এখন বিভিন্ন প্রশ্নবাণে জর্জরিত করা হচ্ছে রিফাতকে। এমন কি, অনেকেই সেসব প্রশ্নের ভুল উত্তরও শিখিয়ে দিচ্ছেন বলতে।
শুধু ফেসবুকার কিংবা বিভিন্ন ইউটিউব চ্যানেলের মালিকরাই এসব ভিডিও করছেন এমন নয়। পিছিয়ে নেই রিফাতের মাদ্রাসার পরিচালক ও প্রধান শিক্ষক ক্বারী আব্দুল কদ্দুস। মূলত তার করা ভিডিও তিনি ফেসবুকে দিলে সেটি ভাইরাল হয় প্রথম।
এরপর থেকে ওই শিক্ষকও সারা দিন রিফাতকে দিয়ে ভিডিও তৈরি করছেন, আপলোড দিচ্ছেন ফেসবুক ও ইউটিউবে।
তবে শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনের নেতারা বলছেন, ফেসবুক ও ইউটিউবাররা রিফাতকে বিভিন্ন বিতর্কিত প্রশ্ন করে তাকে মানসিক নির্যাতন করছে। এতে তার শিশু মনে প্রভাব পড়ছে।
সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন স্বপ্নডানার প্রধান নির্বাহী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘শিশুমনে ভুল কিছু শেখানো উচিত নয়। ভিডিও দেখেই বোঝা যায় রিফাত মেধাবী। এজন্য তাকে এমন কিছু শেখানো উচিত নয় যা তার শিশু মনে কোনো চাপ ফেলে।’
তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেলে দর্শক ও ভিউ বাড়ানো জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। সারাদিন বিভিন্ন বিতর্কিত প্রশ্ন করে তা ভিডিও রেকর্ড করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এসব প্রশ্নে মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।’
এ বিষয়ে মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক ও পরিচালক ক্বারী আব্দুল কদ্দুস বলেন, ‘সে ভাইরাল হবার পর থেকে বিভিন্ন ফেসবুক ইউটিউব চ্যানেলের পক্ষ থেকে প্রতিনিধিরা মাদ্রাসায় আসতেছেন। রিফাতের ভিডিও করছেন। এতে তার মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে।’
তিনি জানান, শনিবারও দুই জন ইউটিউবার ও ৩ জন সাংবাদিক পরিচয়ে রিফাতের ভিডিও করে নিয়েছে।
মাদ্রাসাটিতে গিয়ে দেখা যায়, দুজন ব্যক্তি রিফাতের ভিডিও করছেন। তারা বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন করছেন। এমনকি কিছু বিতর্কিত প্রশ্নও করছেন। এ সময় তারা রিফাতকে ‘আরও জোরে, আরও জোরে বলো’ বলতে দেখা যায়।
সুনামগঞ্জ শিশু ও মানবপাচার আদালতের অতিরিক্ত পিপি হাসান মাহবুব সাদী বলেন, ‘শিশুদের সুরক্ষা ও অধিকার নিয়ে কাজ করার জন্য প্রতিটি থানায় একজন অফিসার রয়েছে। এ ছাড়া সমাজ সেবা অফিসও শিশুদের নিয়ে কাজ করে। বিষয়টি নিয়ে তারা খোঁজ নেবে বলে আশা করি।’
জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা বাদল চন্দ্র বর্মন বলেন, ‘সামজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমি শিশু রিফাতের ভিডিও দেখেছি। স্বাভাবিকভাবেই সে মেধাবী হওয়ায় সকল প্রশ্নের উত্তর দেয়। কিন্তু এখন তাকে নিয়ে অতিরিক্ত হয়ে যাচ্ছে। এতে মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে শিশু রিফাত।’
জামালগঞ্জ উপজেলা ভূমি অফিসের সহকারী কমিশনার ও ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তনুকা ভৌমিক বলেন, ‘একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখেছি। এটি যে আমার উপজেলায় জানতাম না। এ বিষয়ে আগামীকাল খোঁজ-খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’