রাঙামাটি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৯ মে ২০২৩ ০৯:২৪ এএম
রাঙামাটির বরকল উপজেলায় দুর্গম অঞ্চলের ২৩ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবই পায়নি। পুরোনো বই দিয়ে কোনোরকমে পাঠদান চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এতে প্রায় ৯০০ শিক্ষার্থীর পাঠ গ্রহণ ব্যাহত হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে, প্রথম শ্রেণিতে। কারণ এবার প্রথম শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রমের আলোকে পাঠ্যবই দেওয়া হয়েছে। ফলে পুরোনো বই থেকে পাঠ গ্রহণ করতে পারছে না তারা। এতে বিপাকে পড়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ অভিভাবকরা। তারা চরম হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। দ্রুত নতুন বই সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন তারা।
বিদ্যালয়সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২৩টি বিদ্যালয়ের মধ্য ৮টি সুবর্ণভূমি ফাউন্ডেশন নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। বাকি ১৫টি বিদ্যালয় স্থানীয়দের সহায়তায় নির্মিত ও পরিচালিত। বিদ্যালয়গুলো দুর্গম এলাকায় হওয়ায় অধিকাংশই মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্কের বাইরে।
তা ছাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এসব এলাকা থেকে অনেক দূরে। তাই স্থানীয় বাসিন্দাদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এসব প্রতিষ্ঠান। চলমান শিক্ষাবর্ষের প্রায় অর্ধেক সময় পেরিয়ে গেছে। শিক্ষার্থীরা এখনও বই না পাওয়ায় তাদের শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। এতে আশঙ্কা রয়েছে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার।
রামছড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়েছে সফল চাকমা। সে বলে, ‘নতুন বই পাইনি। পুরোনো ছেঁড়া বই দিয়ে কোনোমতে লেখাপড়া করছি। পড়তে মন বসে না। নতুন বই চাই।’ তার মতো উজ্জ্বল চাকমাও বলল একই কথা।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি কিনাধন চাকমা বলেন, ‘আমাদের স্কুলে মোট ৭৭ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তারা নতুন বই পায়নি। সরকার বইগুলোতে যে সংশোধন এনেছে সেসব থেকে শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত। তাই সরকারের কাছে দাবি শিক্ষার্থীরা যেন নতুন বই পায়।’
অনিতা রানী চাকমা নামে এক অভিভাবক বলেন, ‘আমরা অনেক কষ্টে হলুদ চাষ করে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখাচ্ছি। সুবর্ণভূমি ফাউন্ডেশন আমাদের সহায়তা না করলে ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যাবে। নতুন বই না পাওয়ার কারণে তাদের লেখাপাড়ার ক্ষতি হচ্ছে। দ্রুত নতুন বই চাই।’
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক অনিল চাকমা বলেন, ‘প্রতিবছর আমরা ঠিক সময়ে বইয়ের চাহিদা দিতাম। কিন্তু গত বছর থেকে প্রাইমারি এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (পিইএমইএস) চালু হয়েছে। শিক্ষা অফিস থেকে ব্যবস্থা করে দেবে বলেছে। কিন্তু তারা সঠিক সময়ে করে দেয় নাই। ফলে এই সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া নতুন বইয়ে অনেক পরিবর্তন আনা হয়েছে। বই না পাওয়ায় শিক্ষার্থীরা তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। উপজেলা শিক্ষা অফিসে আমরা অনেকবার যোগাযোগ করেছি। কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না।’
সুবর্ণভূমি ফাউন্ডেশনের কো-অর্ডিনেটর মানবাশীষ চাকমা বলেন, ‘আমাদের পরিচালিত ৮টি বিদ্যালয়ে ৩৩৮ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। ১ হাজার ৬৭৬টি বইয়ের চাহিদা ছিল। শুরু থেকে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে বইয়ের চাহিদা দিয়েছি। কিন্তু আমাদের সব বই দেওয়া হয়নি। ৫০৪টি দেওয়া হয়েছে।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক এম জিসান বখতিয়ার বলেন, বরকলের ২৩টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বই পায়নি। এটা খুবই উদ্বেগজনক বিষয়। সঠিক সময়ে বই না পেলে দুর্গম এলাকার শিশুরা পড়ালেখা থেকে ঝরে পড়বে। কী কারণে বই পাচ্ছে না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের খতিয়ে দেখা দরকার।
বরকল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবদুস সালাম বলেন, ‘পূর্বে ম্যানুয়ালি বইয়ের চাহিদা নেওয়া হতো, গত বছর থেকে অনলাইনে নেওয়া হচ্ছে, যেটাকে প্রাইমারি এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম বলা হয়। তাগাদা দেওয়ার পরও সে অনুযায়ী বেসরকারি বিদ্যালয়গুলো ফরম পূরণ করেনি। তা ছাড়া দুর্গম এলাকায় মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক না থাকায় তারা সঠিক সময়ে বইয়ের চাহিদা দিতে পারেনি। এজন্য জটিলতা হয়েছে, চাহিদামতো প্রয়োজনীয় বই আসেনি। ভবিষ্যতে এ সমস্যা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করা হবে। বিদ্যালয়গুলোতে বই পাঠানোর চেষ্টা করছি।’ তবে ঠিক কবে নাগাদ বই পাঠানো হবে, তা তিনি জানাতে পারেননি।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ২৩টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নতুন বই না পাওয়ার বিষয়টি শুনেছি। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে বিষয়টি ব্যবস্থাপনার নির্দেশ দেওয়া হেয়ছে।