× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

শ্যামাসুন্দরী খালের শ্রী ফিরবে কবে

মেরিনা লাভলী, রংপুর

প্রকাশ : ১৭ মে ২০২৩ ১১:১২ এএম

ক্রমাগত দূষণে ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে রংপুরের শতবর্ষী শ্যামাসুন্দরী খাল। প্রবা ফটো

ক্রমাগত দূষণে ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে রংপুরের শতবর্ষী শ্যামাসুন্দরী খাল। প্রবা ফটো

রংপুরে যতগুলো ঐতিহ্য আছে, শতবর্ষী শ্যামাসুন্দরী খাল তার একটি। একসময়ের মনোরম খালটি ক্রমাগত দূষণে এখন ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। বৃষ্টি হলে শহরের সব পানি এই খালে গিয়ে পড়ত। ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন বন্ধ থাকে। এতে নগরীতে সৃষ্টি হয় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা।

২০২০ ও ২০২১ সালের ভারী বৃষ্টিপাতে রংপুরে তীব্র জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। খালটির উন্নয়নে ২০২১ সালে মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়। এজন্য নিয়োগ দেওয়া হয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠানও। কিন্তু দীর্ঘদিনেও উন্নয়নকাজে দৃশ্য কোনো অগ্রগতি নেই। খালটি সংস্কার না হলে আসছে বর্ষায় পুরো শহর ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন নগরবাসী। 

রংপুর নগরীর বুক চিরে বয়ে যাওয়া প্রায় ১৩০ বছর পুরোনো শ্যামাসুন্দরী খাল। ১৮৯০ সালে তৎকালীন পৌরসভার চেয়ারম্যান ও ডিমলার রাজা জানকি বল্লভ সেন তার মা শ্যামাসুন্দরীর স্মরণে এ খাল খনন করেছিলেন। এটি রংপুর সিটি করপোরেশন এলাকার মধ্যে ১৫ দশমিক ৮০ কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত। এলাকাভেদে এর প্রস্থ ২৩ থেকে ৯০ ফুট। খালটি উত্তর-পশ্চিমে কেল্লাবন্দ ঘাঘট নদ থেকে শুরু হয়ে নগরীর বিভিন্ন এলাকার বুক চিরে মাহিগঞ্জ সাতমাথা রেলগেট এলাকায় কেডি ক্যানেল স্পর্শ করে মিশেছে খোকসা ঘাঘট নদে।

রংপুর সিটি করপোরেশন ও বিভাগ হওয়ার পর থেকে নগরীতে জনসংখ্যা বেড়েছে। শ্যামাসুন্দরী খাল ঘেঁষে তৈরি হয়েছে বড় বড় অট্টালিকা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, রেস্তোরাঁ ও আবাসিক ভবন। এসবের প্রতিদিনের বর্জ্য ফেলা হচ্ছে শ্যামাসুন্দরী খালে। এতে খাল ভরাট হয়ে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পানির প্রবাহ না থাকায় দুর্গন্ধ ছড়ানোর পাশাপাশি মশা-মাছির উপদ্রব বেড়েছে খালপাড়ে। এ ছাড়া অনেকে পয়োনিষ্কাশনের সংযোগ এ খালে দেওয়ায় পানি দূষিত হয়ে পড়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শ্যামাসুন্দরী খালের পুরোনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে ২০১৯ সালের ২৬ আগস্ট জেলা প্রশাসক সম্মেলনকক্ষে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, সেনাবাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, নদী বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী, শিক্ষক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও সাংবাদিকদের সমন্বয়ে একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। শ্যামাসুন্দরীকে পুনরুজ্জীবিত করতে তিনটি ধাপে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। সীমানা নির্ধারণ, পুনরুদ্ধার ও পুনরুজ্জীবিত কর্মসূচির আওতায় ওই বছর ২৩ অক্টোবর নগরীর চেকপোস্ট এলাকায় সীমানা নির্ধারণ কাজের উদ্বোধন করা হয়।

পরবর্তী সময়ে স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে আলোচনা সভাও অনুষ্ঠিত হয়। এরপর সীমানা নির্ধারণসহ অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। ২০২০ সালে করোনার প্রকোপ বেড়ে গেলে থমকে যায় শ্যামাসুন্দরী পুনরুজ্জীবিতকরণের কাজ। ওই বছর ২৭ সেপ্টেম্বর ১১ ঘণ্টায় ৪৩৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতে রংপুর নগরীর প্রধান সড়ক, পাড়া-মহল্লার অলিগলিসহ বেশিরভাগ এলাকা তলিয়ে যায়। ঘরবাড়ি, দোকানপাট, মালামাল, খাদ্যশস্যসহ প্রায় অর্ধকোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়। স্থানীয়রা ঘরবাড়ি ছেড়ে গবাদি পশুসহ আশ্রয় নেয় নগরীর স্কুলগুলোতে। এরপরেও রংপুর সিটি করপোরেশনসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা শ্যামাসুন্দরী খাল নিয়ে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেননি। 

২০২১ সালের ৩ অক্টোবর ২৪ ঘণ্টায় ২৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হলে শ্যামাসুন্দরী দিয়ে পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় নগরীতে তীব্র জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। ফলে পুনরায় পানিবন্দি হয়ে পড়েন নগরবাসী। পরপর দুই বছর তীব্র জলাবদ্ধতার কারণে ২০২১ সালের শেষের দিকে সিটি করপোরেশন শ্যামাসুন্দরী নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়। এজন্য ৮৬ লাখ টাকা ব্যয়ে বিকন ডিজাইন স্টুডিও নামের একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়া হয়। সেই পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রশাসন, প্রকৌশলী, সুশীল সমাজসহ স্থানীয় অধিবাসীদের নিয়ে আলোচনা করে শ্যামাসুন্দরী খাল সংস্কারে স্থায়ী পরিকল্পনা নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কচ্ছপ গতিতে কাজ করায় এক বছরেও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সেই আলোচনা শেষ করতে পারেনি।

নগরীর নিউ ইঞ্জিনিয়ারপাড়ার সাজু আহমেদ বলেন, ২০১৯ সালে শ্যামাসুন্দরী খালের উন্নয়নের জন্য পাড় থেকে আমরা গাছপালা সরিয়ে নিয়েছি। কিন্তু দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও খালের উন্নয়নকাজ শুরু করা হচ্ছে না। অপরদিকে ময়লা-আবর্জনার কারণে খালের পানি প্রবাহিত হতে না পেরে দুর্গন্ধ ও মশার উৎপাত চরমে উঠেছে। আমরা চাই বর্ষার আগেই শ্যামাসুন্দরী খালের উন্নয়নকাজ শুরু হোক। 

সার্কিট হাউস এলাকার বাসিন্দা শাহনাজ বেগম বলেন, খালের দুর্গন্ধে আমরা অতিষ্ঠ। দিন-রাতে মশার উৎপাত। আমরা চাই দ্রুতই ঐতিহ্যবাহী শ্যামাসুন্দরী খালের পরিকল্পিত উন্নয়ন হোক। 

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রংপুর মহানগর সভাপতি অধ্যক্ষ ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, দীর্ঘদিন অবহেলায় থাকার পর সিটি করপোরেশন শ্যামাসুন্দরী খালের উন্নয়নে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দিয়েছে। মন্দের ভালো খবর ছিল এটি। পরামর্শক কমিটির দু-তিনটি সভায় আমিও উপস্থিত ছিলাম। কিন্তু যে গতিতে পরামর্শক কমিটি আলোচনা সভা করছে, এতে করে কয়েক বছরেও এ খাল নিয়ে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও নদী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ বলেন, বর্তমানে শ্যামাসুন্দরীকে বাঁচাতে হলে এতে পানি লাগবে। ৩০ বছর আগে কীভাবে পানি প্রবাহিত হতো, ঘাঘট থেকে শ্যামাসুন্দরীতে কেন পানি প্রবাহিত হচ্ছে না, কোথায় কোথায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে তা আমাদের চিহ্নিত করতে হবে। বর্তমানে রংপুর শহরের আকাশ খারাপ হলে গোটা নগরী পানিতে ডুবে যাবে, যা দুই বছর থেকে আমরা বুঝতে পারছি। বর্ষায় বেশি বৃষ্টিপাত হলে নগরীর অধিকাংশ এলাকায় হাঁটু-বুক কিংবা তার চেয়ে বেশি উচ্চতায় পানি উঠে যায়। এ ছাড়া শ্যামাসুন্দরী খালের দূষণ অন্যান্য নদীতে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে নদীর মাছসহ নদীকেন্দ্রিক জীববৈচিত্র্য হুমকিতে পড়েছে।

রংপুর সিটি করোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিন মিঞা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান খালের উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে। সেই পরিকল্পনার ভিত্তিতে প্রাক্কলন তৈরি করে তা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হবে। বরাদ্দ আসার পর পুরোদমে খালের উন্নয়নে কাজ শুরু করা সম্ভব হবে। বর্ষা সামনে রেখে জলাবদ্ধতা রোধে নগরীর ড্রেন ও শ্যামাসুন্দরী খাল পরিষ্কারের কার্যক্রম চলছে। আশা করছি জলাবদ্ধতার কারণে নগরবাসীকে দুর্ভোগ পোহাতে হবে না। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা