× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নাব্য সংকটে মলিন জীবন-জীবিকা

গাইবান্ধা সংবাদদাতা

প্রকাশ : ১১ মে ২০২৩ ১২:০১ পিএম

আপডেট : ১১ মে ২০২৩ ১৩:৪৪ পিএম

গাইবান্ধার ফুলছড়িতে নাব্য সংকটের কারণে ব্রহ্মপুত্র নদের বিস্তীর্ণ চরে মাইলের পর মাইল হেঁটেই পাড়ি দিতে হয় স্থানীয়দের। প্রবা ফটো

গাইবান্ধার ফুলছড়িতে নাব্য সংকটের কারণে ব্রহ্মপুত্র নদের বিস্তীর্ণ চরে মাইলের পর মাইল হেঁটেই পাড়ি দিতে হয় স্থানীয়দের। প্রবা ফটো

চর-দ্বীপচরের প্রতিটি বালুকণায় মিশে আছে তাদের হাড়ভাঙা খাটুনি। যাদের শ্রম ও ঘামে কমলা-হলুদ সোনায় ভরে ওঠে বিস্তীর্ণ বালুচর। গবাদিপশুর একটা বড় অংশই আসে চরাঞ্চলের গতরখাটা মানুষগুলোর গোয়াল থেকে।

অথচ এই জনপদে ওদের জীবনটা কখনও কখনও দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। গ্রীষ্মকাল মানে দুঃখ-কষ্টের পাহাড় এখানে। নদ-নদী শুকিয়ে যখন মরা কঙ্কাল। তখন মাইলের পর মাইল পাড়ি দিতে হয় হেঁটে। 

তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনাবেষ্টিত উত্তর জনপদের জেলা গাইবান্ধার অন্ততপক্ষে ৩৫ শতাংশ নদী ও চরাঞ্চল। জেলার মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ মানুষের বসবাস সুন্দরগঞ্জ, সদর, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার ২৮টি ইউনিয়নের ১৬৫টি চর-দ্বীপচরে। সেখানে অন্ততপক্ষে ৪৭ শতাংশ মানুষেরই জীবনমান দারিদ্র্যসীমার নিচে। 

গাইবান্ধার নদীগুলোর সবই নাব্য হারিয়ে এখন প্রাণহীন। নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনাবেষ্টিত গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি, সদর, সাঘাটা উপজেলার বিভিন্ন স্থানে প্রতি বছর দেখা দিচ্ছে নদীভাঙন। 

গাইবান্ধা জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও জলবায়ু পরিষদের জেলা সদস্য সচিব জিএসএম আলমগীর জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে জীবন, স্বাস্থ্য, খাদ্য, উন্নয়ন, আত্মনিয়ন্ত্রণ, পানি ও স্যানিটেশন, কর্ম, পর্যাপ্ত বাসস্থান ও সহিংসতা, যৌন নির্যাতন, পাচার এবং অন্যান্য অধিকারসহ মানবাধিকার নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত ও লঙ্ঘিত হচ্ছে।

বর্ষায় ফুঁসে ওঠা তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা স্বরূপ হারিয়ে শুষ্ক মৌসুমে পরিণত হয় মরা খালে। পলি বহন করতে গিয়ে দীর্ঘতম ব্রহ্মপুত্র নদের অস্তিত্বই প্রায় বিপন্ন। গত কয়েক দশকে প্রস্থে দ্বিগুণ হলেও কমেছে গভীরতা। এ কারণে সংকটে পড়েছে নদীনির্ভর লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা।

গাইবান্ধার ফুলছড়ি অংশে ব্রহ্মপুত্র নদ। চাষাবাদে সহযোগী হলেও পানিশূন্য প্রায় ব্রহ্মপুত্রে চলছে ঘোড়ার গাড়ি। অভ্যন্তরীণ নৌরুট বন্ধ হওয়ার পর পানির অভাবে ঠেলেঠুলে চলছে আন্তঃজেলা রুটের কয়েকটি নৌকা। যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে সংকটাপন্ন কৃষি, জীববৈচিত্র্য আর জীবন-জীবিকা।

গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, দ্বিগুণ হয়ে এলাকাভেদে ব্রহ্মপুত্রের প্রস্থ ঠেকেছে ১৬ থেকে ১৮ কিলোমিটারে। বছরে সাড়ে ৭২ কোটি মেট্রিক টন পলি বহন করতে গিয়ে কমেছে গভীরতাও। শত শত চর-দ্বীপচর জেগে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য চ্যানেল। নাব্য সংকটে মৃতপ্রায় ব্রহ্মপুত্রকে বাঁচাতে সুষ্ঠু পরিকল্পনা চান সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য কৃষক নেতা আমিনুল ইসলাম গোলাপ জানান, পানি না থাকায় এখানকার কৃষিকাজ ও জীববৈচিত্র্য ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ১৯৮৮ সালের বর্ষায় ব্রহ্মপুত্র নদে সর্বোচ্চ পানিপ্রবাহ ৯৮ হাজার ৬০০ কিউসেক রেকর্ড করা হলেও এবার শুষ্ক মৌসুমে মানুষ হেঁটেই পাড়ি দিচ্ছেন ব্রহ্মপুত্র নদ। তবে পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে ব্রহ্মপুত্র নদের প্রস্থ কমানোর চিন্তার কথা জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী।

১৯৩৮ সালে গাইবান্ধার তিস্তামুখ-বাহাদুরাবাদ রুটে ফেরি চলাচল শুরু হলে সময় ও খরচ বাঁচাতে নৌপথে যাতায়াত করতেন আট জেলার মানুষ। নাব্য সংকটের কারণে বালাসীতে ঘাট স্থানান্তর করা হলেও একই কারণে ২০০৪ সালে বন্ধ হয় বালাসী-বাহাদুরাবাদ নৌরুটে ফেরি ও লঞ্চ সার্ভিস।

১৯৯৯ সালে করা জাপানের নাগোয়্যা বিশ্ববিদ্যালেয়ের একটি জরিপ বলছে, প্রতি বছর ব্রহ্মপুত্র নদে প্রবাহিত হয় ৭২১ মিলিয়ন টন পলি আর গঙ্গা পলি বহন করে ৩১৬ মিলিয়ন টন। এর মাত্র ৫১ শতাংশ পলি যায় বাংলাদেশের উপকূলে। বাকি ৫১২ মিলিয়ন টন জমা হয় নদ-নদী দুটির তলদেশে। এর ২৮ শতাংশ জমা হয় প্লাবন ভূমিতে আর ২১ শতাংশ অর্থাৎ ২২৩ মিলিয়ন টন পলি জমা হয় নদীর বুকে। ফলে প্রতি বছর নদীর তলদেশ ভরাট হচ্ছে ৩ দশমিক ৯ সেন্টিমিটার।

গাইবান্ধা পরিবেশ আন্দোলনের আহ্বায়ক ওয়াজিউর রহমার রাফেল বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রত্যক্ষ আর্থিক ক্ষতির শিকার হওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তরা স্বাস্থ্য সংকট, বাস্তুচ্যুতি, সামাজিক ও যৌন হয়রানি, পানি সংকট, স্কুল থেকে ঝরে পড়া, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, সহিংসতা, মানসিক বিপর্যয়সহ বিভিন্ন সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে।

এদিকে, স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থা ও এনজিওগুলো স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে চরের মানুষের জীবনমানের উন্নয়নে এক থেকে পাঁচ বছর মেয়াদি বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করলেও এলাকা নির্বাচন এবং অনেক ক্ষেত্রে উপকারভোগীর তালিকার বৈশিষ্ট্য পূরণ না হওয়ায় যাদের নিয়ে প্রকল্প তারা সুফল থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এ কারণে দৃশ্যত খুব বেশি উন্নয়ন হয়নি এসব মানুষজনের। 

সাঘাটার উদয়ন স্বাবলম্বী সংস্থার নির্বাহী পরিচালক শাহাদৎ হোসেন মণ্ডল জানান, চরাঞ্চলের শিক্ষার বেহাল অবস্থা, মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ না থাকায় প্রাথমিক শেষ করেই ঝড়ে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। এতে বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রমে যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছে ছেলে-মেয়েরা। 

ফুলছড়ির ফজলুপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আবু হানিফ প্রামাণিক জানান, বন্যা ও নদীভাঙনে স্থায়ী পদেক্ষপ না নিলে চরের সমস্যা সমাধান করা কঠিন। তিনি বলেন, চরের মানুষের জন্য বসতবাড়ি উঁচু করে বন্যাকালীন থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। 

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা গণ উন্নয়ন কেন্দ্রের (জিইউকে) প্রধান নির্বাহী এম আবদুস সালাম বলেন, চরাঞ্চলের মানুষের জীবনমানের উন্নয়নে প্রয়োজন গবেষণার আলোকে প্রকল্প গ্রহণ করা। চরের মানুষের জীবনমানের উন্নয়নে চর উন্নয়ন বোর্ড গঠন করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, গত কয়েক বছর থেকে ত্রাণ ও পুনর্বাসনকাজে এনজিওদের মধ্যে যাতে সমন্বয় থাকে, এজন্য নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। 

গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক মো. অলিউর রহমান জানান, চরাঞ্চলের মানুষজন এখন উন্নয়নের পথেই হাঁটছে। সরকারও এখন চর নিয়ে টেকসই পরিকল্পনা করেছে। এজন্য বিদ্যুৎ সংযোগ, হাট-বাজার গড়ে তোলা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ালেখার মান বৃদ্ধি, কৃষিতে বিশেষ ভুর্তকি, গবাদিপশু পালনে কাজ করে যাচ্ছে। চরাঞ্চলে ১০টি আশ্রয়ণ প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যে শতাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। চরের ভুট্টা ও মরিচ এখন দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছে। 

গাইবান্ধা-৫ (সাঘাটা-ফুলছড়ি) আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদ হাসান রিপন জানান, চরাঞ্চলের উন্নয়নে বর্তমান সরকারের বিশেষ দৃষ্টি ও পৃথক পরিকল্পনা রয়েছে। এগুলো সরকারের বিভিন্ন বিভাগের সমন্বয়ে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা