বেড়া (পাবনা) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১১ মে ২০২৩ ০৯:১৪ এএম
আপডেট : ১১ মে ২০২৩ ১০:৩৪ এএম
লতাগুল্মে ঢাকা পড়েছে পাবনার সাঁথিয়ার ক্ষেতুপাড়ার জমিদারবাড়ি। প্রবা ফটো
প্রাচীনকাল থেকেই ঐতিহ্যে বৈচিত্র্যে আর আভিজাত্যে জমিদারদের মধ্যে ছিল ভিন্নতা। তাদের যেমন অত্যাচার নির্যাতনের লোমহর্ষক কাহিনী রয়েছে, তেমনি প্রজাদের ভালোবাসায় সিক্ত হওয়ার গল্প ছিল অনেক। তাদের ছিল প্রাচীর ঘেরা কারুকার্যেখচিত সুরম্য অট্টালিকা।
হাতি-ঘোড়া, রথ-পালকি, স্নানাগার ঘাটবাঁধানো পুকুর। নিরাপত্তার জন্য ছিল পাইক-পেয়াদা-বরকন্দাজ-লাঠিয়াল, কাজের জন্য ছিল নায়েব, সেবার জন্য ছিল দাস-দাসী আর মনোরঞ্জনে বাইজি।
পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার ক্ষেতুপাড়া ইউনিয়নের গোলাবাড়ি গ্রামে রয়েছে এমন এক জমিদার বাড়ি। এটি ক্ষেতুপাড়ার জমিদার বাড়ি নামে পরিচিত। এটি উপজেলার প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম। বর্তমানে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। কালের বিবর্তনে কিছু মানুষ এটাকে খুবলে খেয়ে বিলুপ্তির পথে এনে দাঁড় করিয়েছে। মূল ভবনের পলেস্তারা বহু বছর আগেই খসে পড়েছে। ভাঙা দেয়াল, কোথাও ঘষা লাগলে ইটের লাল ধূলিকণা পড়ে। লতাগুল্মে ঢাকা পড়েছে বাড়িটি। দেয়াল ভেদ করেছে পাকুড় গাছের শিকড়। বাড়িটি এখন নিশ্চিহ্নের পথে।
এখানে ছিল একটি শিব মন্দির। মন্দিরের শিব ঠাকুর মূর্তিটি অনেক আগেই চুরি হয়ে গেছে। যে মাঠটি আছে তার সামনে এমনভাবে দোকান তৈরি করা হয়েছে অতি পরিচিত লোকের কাছেও যেন অচেনা। এলাকাবাসীর কাছে এটি এখন স্মৃতি আর শ্রুতি।
জানা যায়, প্রায় ৩০০ বছর পূর্বে ভারত থেকে আগত জমিদার নব কুমার রায় ২ একর ২৫ শতক ভূমির ওপর এই বাড়িটি নির্মাণ করেন। তার মৃত্যুর পর দীর্ঘ ষাট বছর একমাত্র সন্তান পার্বতী চরণ রায় জমিদারি পরিচালনা করেন। তার চার সন্তানের মধ্যে তিনজন ভারত চলে যান। পার্বতী চরণ রায়ের মৃত্যুর পর তৃতীয় সন্তান শ্যামা চরণ রায় ১৯৪০ সালে দিকে এখানে থেকে জমিদারি দেখভাল করতেন। তিনি এই এলাকায় জনহিতৈষী, সমাজসেবক এবং বিদ্যানুরাগী হিসেবে সমাদৃত ছিলেন। তিনি সাঁথিয়া সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, কামিল মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে জমি দান করেছিলেন। সাঁথিয়া উন্নয়নের রূপকার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন।
পরবর্তীতে ১৯৬৯ সালে সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর এলাকার সন্ধ্যা রাণী, শ্যামা চরণের দুই ছেলে প্রদ্দুৎ কুমার রায় ও দিপক কুমার পার্বতী চরণ রায়ের কাছে থেকে চার আনা ক্রয় করেন বলে দাবি করেন। বর্তমানে সন্ধ্যা রাণীর চার পুত্র উত্তম কুমার, গৌতম কুমার, অরুণ কুমার, অলোক কুমার এখানে বসবাস করছেন। জমিদার বাড়িটি ক্রয়সূত্রে মালিকানা নিয়ে সরকারের সঙ্গে দীর্ঘ বছর মোকদ্দমা চলছে তাদের।
উত্তম কুমার তালুকদার জানান, ১৯৫৪ সালে সরকারের কাছে থেকে নিলামে এই সম্পিত্তি ক্রয় করেন, শ্যামা চরণের ছেলে সুশীল কুমার রায়, তারে মেয়ে জলাঞ্জলী রায় দাস্যা, উমা রাণী রায়, বুলবুলি রায় ও সোমনাথ রায়। পরে ১৯৭৪ সালে বাকি বারো আনা সম্পত্তি তাদের কাছে থেকে ক্রয় করেন আমার মা।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মনিরুজ্জামানের গত ২০২২ সালের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, ১৯৫৬ সালের এসএ রেকর্ডের প্রেক্ষিতে নালিশি সম্পত্তি পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশ কালেক্টর অর্থাৎ সরকারের ১নং খাস খতিয়ানভুক্ত সম্পত্তি হিসেবে রেকর্ডভুক্ত হয়। পরবর্তীতে আরএস রেকর্ডও সরকারের ১নং খাস খতিয়ানভুক্ত হয়। সুতরাং তাদের দাবিকৃত সার্টিফিকেট মোকদ্দমার মাধ্যমে নিলাম ক্রয়ের বিষয়টি সঠিক নয়।
এ সম্পত্তিতে ক্ষেতুপাড়া সরকারি ইউনিয়ন ভূমি অফিস এবং হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পূজা অর্চনার জন্য শিব মন্দিরের মঠের নিদর্শন রয়েছে। যা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষণের দাবি স্থানীয়দের। তাদের প্রত্যাশা সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে এটাকে পর্যটন শিল্পে রূপ দেওয়া গেলে সরকারের রাজস্ব বাড়বে।