× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সেন্টুর ১৭ বছরের ধান-সাধনা

শেরপুর প্রতিবেদক

প্রকাশ : ১০ মে ২০২৩ ১৪:১৬ পিএম

আপডেট : ১০ মে ২০২৩ ১৬:৫৮ পিএম

নিজের ধানক্ষেতে স্বশিক্ষিত গবেষক সেন্টু কুমার হাজং। প্রবা ফটো

নিজের ধানক্ষেতে স্বশিক্ষিত গবেষক সেন্টু কুমার হাজং। প্রবা ফটো

বাড়ির চারপাশে বিভিন্ন প্রজাতির গাছগাছালি। উঠানে একটি ছোট্ট কুটির। সেখানেই ধান নিয়ে গবেষণা করেন শেরপুরের সেন্টু কুমার হাজং। কুটিরের ভেতরে একপাশে ডজন তিনেক প্লাস্টিকের টব। অন্যপাশে বিভিন্ন জাতের ধানবীজের বস্তা। মেঝেতে প্লাস্টিকের বড় একটি ড্রামে ২৭০ ধরনের ধান (নমুনা)। কাগজের টুকরোয় সুন্দর করে লেখা ধানের জাত, উচ্চতা, সময় ও ধরন। সেন্টুর ১৭ বছর সাধনার ফসল।

কোনো ধরনের বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ছাড়াই নিজের হাতে পরাগায়নের মাধ্যমে নতুন জাতের ধান উদ্ভাবন করেন তিনি। বিভিন্ন দেশি জাতের মধ্যে সংকরীকরণ করে এসব জাত উদ্ভাবন করেন সেন্টু। সংকরীকরণ থেকে পাওয়া ধান চাষ করেন ক্ষেতে। শেষ হয় পরীক্ষা। এভাবে নতুন ধরনের ধান বের করে আনেন এই স্বশিক্ষিত গবেষক। তার উদ্ভাবিত কিছু জাতে দ্বিগুণ ফলন হয় বলে এলাকাবাসী জানিয়েছেন। তবে সরকারিভাবে তার ধানগুলো নিয়ে এখন পর্যন্ত মাঠপর্যায়ে কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়নি। জোটেনি কোনো স্বীকৃতি। তবে শেরপুরের নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটসহ আশপাশের বিভিন্ন উপজেলায় কয়েক হাজার একর জমিতে কৃষকরা সেন্টুর ধান চাষ করেছেন। সাধারণ ধানের চেয়ে বেশি ফলন হওয়ায় লাভবান হচ্ছেন এসব এলাকার কৃষক।

অভাবের সংসারে সেন্টুর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা-দীক্ষা বেশি দূর এগোয়নি। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, এসএসসি পাসের পর কৃষিকাজের মাধ্যমে সংসারের হাল ধরেন। তখন থেকেই নেশা কৃষিতে নতুন কিছু করার। সেন্টু শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার কতুবাকুড়া গ্রামের বাসিন্দা। ২০০৫ সালে বেসরকারি একটি সংস্থা দরিদ্র কৃষকদের ধানের সংকরীকরণ ও নতুন জাত উদ্ভাবনের প্রযুক্তি শেখায়। সেন্টু সেখানে তিন দিনের প্রশিক্ষণ নেন। এরপর ধানের নতুন জাত আবিষ্কারের জন্য গবেষণা শুরু করেন।

৫১ বছর বয়সি সেন্টু তার গবেষণার ব্যাপারে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, বিআর-১১ জাতের সঙ্গে চিনিশাইল ধানের সংকরীকরণ করেছেন তিনি। সাত বছরের চেষ্টায় ২০১৬ সালে এ গবেষণাটি সফল হয়। তিনি এ ধানের নাম দিয়েছেন সেন্টুশাইল। ফলন হয় একরপ্রতি ৪৫ থেকে ৫৫ মণ। সেখানে সাধারণ ধানের ফলন হয় ৩০ থেকে ৩৫ মণ। গাছের উচ্চতা সাড়ে তিন থেকে চার ফুট। গাছ শক্ত থাকায় সহজে বাতাসে হেলে পড়ে না। ধানটি উৎপাদনে সময় লাগে ১৪০ দিন। এই ধান চাষে অতিরিক্ত কোনো পরিচর্যা লাগে না। পোকামাকড়ের আক্রমণ তুলনামূলক কম। ২০১৯ সালে ধানের আরেকটি নতুন ধরন নিয়ে আসেন সেন্টু। পাঁচ বছরের চেষ্টায় দেশি পাইজাম ধানের সঙ্গে রঞ্জিত ধানের সংকরীকরণ করে তিনি নতুন একটি ধরন (সেন্টু-২১) উদ্ভাবন করেন। এ ধানের চাল অনেকটা পাইজামের মতো চিকন হয়। ফলনও পাওয়া যায় দ্বিগুণ। পাইজাম প্রতি একরে ৩৫ থেকে ৪০ মণ ফলন হয়। আর সেন্টুর ধান একরপ্রতি হয় ৬০ থেকে ৭০ মণ। উৎপাদনে সময় লাগে ১৫০ দিন, আর পাইজামের সময়কাল ১৬০ দিন।

নালিতাবাড়ী উপজেলার আন্ধারপাড়া গ্রামের কৃষক হাবিল উদ্দিন বলেন, ‘আমি এ বছর ১ একর ৫০ শতাংশ জমিতে সেন্টু পাইজাম (সেন্টু-২১) জাতের ধান আবাদ করেছিলাম। শুকিয়ে একরপ্রতি ৫০-৬০ মণ হারে ফলন পেয়েছি, যা সাধারণ পাইজামের প্রায় দ্বিগুণ। এ জাতের ধানের চাহিদা বেশি। দামও ভালো।’

সেন্টু পাইজাম ও সেন্টুশাইল বেশ সুনাম পেয়েছে বলে জানিয়েছেন নালিতাবাড়ী ট্রাইব্যাল ওয়েল ফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান কোপিন্দ্র নকরেক। তিনি বলেন, ‘সেন্টু আমাদের এ অঞ্চলের একজন সফল কৃষক। তার উদ্ভাবিত সেন্টু পাইজাম ও সেন্টুশাইল জাতের ধান বেশ সুনাম পেয়েছে। আবাদ করে চাষিরাও লাভবান হচ্ছে।’ সরকারি ও বেসরকারিভাবে তার উদ্ভাবনগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষার দাবি জানান তিনি।

স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা সেন্টুর ধান সম্পর্কে ওয়াকিবহাল রয়েছেন। বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম বলেন, ‘সেন্টু হাজং হাতের মাধ্যমে ধান পরাগায়ন ও নির্বাচন করে থাকেন। তার ধানের ফলন যদি ভালো হয়, তাহলে ধানের দানা, গাছের ধরন, ফলন, স্বাধ কেমন, সেটা আগে দেখতে হবে। আমরা যেহেতু ধানের গবেষণা করি, সেন্টু হাজংয়ের ধানও আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখব। স্থানীয় পর্যায়ের কৃষকদের উদ্ভাবিত ধান আমাদের মূল্যায়ন করার প্রয়োজন রয়েছে।’

স্বীকৃতি পাওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক শাহজাহান কবির বলেন, বিভিন্ন স্থানে পরীক্ষামূলক চাষ করার পর বীজ ‘প্রত্যয়ন এজেন্সিতে’ দিতে হয়। তারা এ জাত দেশের ১০টি অঞ্চলে পরীক্ষামূলক চাষ করে দেখে। এ ধান প্রচলিত জাতের চেয়ে ভালো কি না তা যাচাই করা হয়। সেখানে ভালো হলে পরে ন্যাশনাল টেকনিক্যাল কমিটিতে পাঠানো হয়। সেখানে পর্যালোচনা শেষে জাতীয় বীজ বোর্ডে পাঠানোর পর তা অনুমোদিত হলে ধানের নামসহ সরকারি গেজেটে অন্তর্ভুক্ত হবে। সেন্টু হাজং চাইলে তার ধান নিয়ে স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য আবেদন করতে পারেন।

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা