ঈশ্বরদী (পাবনা) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৮ মে ২০২৩ ১১:৩০ এএম
ঈশ্বরদী রেল ইঞ্জিন মেরামত কারখানায় নিরাপত্তা ঝুঁকি নেয়েই প্রতিনিয়ত কাজ করতে হয় শ্রমিকদের। প্রবা ফটো
শত বছরের পুরোনো জরাজীর্ণ কারখানায় প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার আশঙ্কা, স্বাস্থ্যঝুঁকি, শ্রমিক-কর্মচারীদের পদোন্নতি স্থগিতসহ নানা অসন্তোষ নিয়ে চলছে ঈশ্বরদীর রেল ইঞ্জিন মেরামত কারখানা।
সম্প্রতি আব্দুল্লাহ আল মামুন নামে একজন সিনিয়র উপসহকারী প্রকৌশলী এখানে দুর্ঘটনায় পড়ে পা হারিয়েছেন। পুরোনো দুটি ডকপিটে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন শ্রমিক-কর্মচারীরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বৃহৎ এ কারখানায় ১২টি ইঞ্জিন দাঁড়িয়ে রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটির মেরামতকাজ চলছে। ছয়টি মেরামতের অপেক্ষায়। আর একটি ইঞ্জিন জ্বালানি সংগ্রহের জন্য অবস্থান করছে। এখানে পাঁচটি ডকপিট রয়েছে। এর মধ্যে দুটি ব্রিটিশ আমলে (১৯২৯ সালে) নির্মিত অত্যন্ত জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। এসব ডকপিটে একসঙ্গে আটটি ব্রডগেজ ও একটি মিটারগেজ ইঞ্জিন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও মেরামত করা যায়।
পুরোনো আমলের যন্ত্রপাতি দিয়ে ইঞ্জিন মেরামতের কাজ চলছে। লিফট, ক্রেন, হাইড্রোলিক জ্যাক বা অন্য কোনো যন্ত্রপাতি নেই। পুরোনো দুইটি ডকপিটের ভেতরে দেখা গেছে, দুটি ডকপিটই জরাজীর্ণ ও ভাঙাচোরা। ডকপিটের মেঝে ইঞ্জিনের তেল-কালিতে পিচ্ছিল, কর্দমাক্ত। মাঝেমধ্যেই পিচ্ছিল ডকপিটে শ্রমিকরা পড়ে আহত হন। বৃষ্টির দিনে হাঁটুপানি জমে থাকে। তখন ইঞ্জিন মেরামত করতে গিয়ে দুর্ভোগে পড়তে হয়।
কারখানাটির ফিটার মিস্ত্রি মো. রওশন আলী বলেন, ‘এখানে এত বেশি সমস্যা, কোনটি রেখে কোনটি বলব বুঝে পাচ্ছি না। এখানে আধুনিক কোনো যন্ত্রপাতি নেই। যা কিছু আছে সবই ব্রিটিশ আমলের। ২০১৫ সালের পর কোনো শ্রমিক-কর্মচারীর পদোন্নতি হয়নি। বেতন-ভাতাও বাড়েনি। লোকবল সংকটের কারণে প্রতিটি শ্রমিকের প্রায় প্রতিদিনই ওভারটাইম করতে হয়। ৮ ঘণ্টার ডিউটি কখনও কখনও ১৬ ঘণ্টা এমনকি বেশি চাপের কারণে দিন-রাত টানা ডিউটি করতে হয়। সাপ্তাহিক ছুটি বলে এখানে কিছুই নেই। প্রতিদিনই কাজ করতে হয়। লোকবলসংকট, অধিক পরিশ্রম ও পদোন্নতি বন্ধ থাকায় শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ বেড়েই যাচ্ছে।
আর এখানকার শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কারখানার চেয়ে করুণ। মেকানিক্যাল ফিটার জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘আমরা যারা ডকপিটে কাজ করি তারা সব সময়ই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকি। ধোঁয়া, কালি, ডিজেল, কাদা-পানির দূষিত পরিবেশের মধ্যেই দিন-রাত কাজ করতে হয়। এ ছাড়া নিরাপত্তাঝুঁকি তো রয়েছেই। আমাদের সুচিকিৎসার তেমন ব্যবস্থা নেই। রেলের হাসপাতালগুলোর ভগ্নদশা। ওখানে চিকিৎসা পাওয়া যায় না। দূষিত পরিবেশে কাজ করতে গিয়ে শ্রমিকদের শেষ জীবনে জটিল রোগে আক্রান্ত হতে হয়। সর্বশেষ এখানকার তিনজন অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে। দূষিত ও নোংরা পরিবেশে কাজ করে আমাদের জীবনের শেষ পরিণতিও হয়তো এমনই হবে।’
কারখানা সূত্র বলছে, পশ্চিমাঞ্চল রেলের ১০৮টি ইঞ্জিন রয়েছে। এখানে ইঞ্জিনগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও মেরামত করা হয়। ১০৮টি ইঞ্জিনের মধ্যে ৭৪টি সচল রয়েছে। ঈশ্বরদীসহ পশ্চিমাঞ্চলের মোট ছয়টি কারখানায় ২১টি ইঞ্জিন মেরামত চলছে। মেরামতের অপেক্ষায় আরও ১৩টি ইঞ্জিন। নষ্ট হলে মেরামত ছাড়াও নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয় সব ইঞ্জিন। কোনো যন্ত্রাংশ সম্পূর্ণ নষ্ট হওয়া বা ভাঙার আশঙ্কা দেখা দিলেই মেরামত বা পরিবর্তন করতে হয়।
সব সমস্যার মধ্যে প্রধান সমস্যা লোকবলের অভাব বলে মনে করেন কারখানার ইনচার্জ ও সিনিয়র উপসহকারী প্রকৌশলী শারেক ইকবাল। তিনি বলেন, ছুটির দিনে কাজ করে ও ওভারটাইম করে কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে। এখানে লোকবল নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন। লোকবল নিয়োগ হলে সমস্যা অনেকাংশে সমাধান হয়ে যাবে।
সূত্র বলছে, ঈশ্বরদী কারখানায় মোট ৪৯৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকের মধ্যে কর্মরত রয়েছেন ২৪২ জন। ২৫২টি পদ খালি রয়েছে। ২৪ জন উপসহকারী প্রকৌশলী এখানে কর্মরত থাকার কথা থাকলেও রয়েছেন মাত্র ৪ জন।
শ্রমিকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে, কিন্তু লোকবলের অভাবে তা ব্যাহত হচ্ছে। নতুন লোকবল নিয়োগ না হওয়ায় এবং পুরোনোদের অবসরের কারণে শ্রমিক-কর্মচারীর সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। কারখানা আধুনিকায়নের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে রয়েছে বলে জানিয়েছেন পাকশী বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী আশিষ কুমার মণ্ডল। তবে কবে নাগাদ কী হবে সে বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারেননি।