রিকোর্স চাকমা, রাঙামাটি
প্রকাশ : ০৭ মে ২০২৩ ১২:৫৮ পিএম
আপডেট : ০৭ মে ২০২৩ ১৪:০২ পিএম
রাঙামাটির কুতুকছড়ির মোনতলা পাড়ার লক্ষ্মী কুমার চাকমা নিজ বাগান থেকে সংগ্রহ করছেন রক্তগোটা ফল। প্রবা ফটো
দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে আঙুর ঝুলছে। আসলে তা নয়। এটি পাহাড়ি বুনো ফল। কাঁচা অবস্থায় দেখতে আঙুরের মতো হলেও পাকা অবস্থায় একেবারে লাল টকটকে। সাধারণত কাঁচা অবস্থায় এ ফলটি খাওয়া যায় না, পাকলে খেতে হয়।
পাকা ফলটি খোসা ছাড়ানোর পর ভেতরের বিচিসহ মাংসল অংশটুকু জমাট বাধা রক্তের মতো দেখায়। এ অবস্থায় এটি এত লাল হয় যে শরীরের কোনো স্থানে লাগলে মনে হবে কেটে রক্ত বের হয়েছে। তাই এ ফলটিকে রক্তগোটা বা রক্তফল বলে। স্বাদ ও ঘ্রাণের কারণে এটি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি সম্প্রতি বাঙালিদের কাছেও জনপ্রিয় হচ্ছে।
বুনো এই ফলটিকে ইংরেজিতে ব্লাড ফ্রুট এবং বাংলায় রক্তগোটা বা রক্ত লাল বলা হয়। তবে পাহাড়িদের কাছে ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। চাকমা ভাষায় রসকো, ত্রিপুরা ভাষায় থাইটাক ও মারমা ভাষায় লস্কর নামেই ডাকা হয়। তবে যে যে নামেই ডাকুক না কেন এটি রক্তগোটা নামেই সর্বাধিক পরিচিত। খেতে সাধারণত টক ও মিষ্টি হওয়ায় বেশ জনপ্রিয় এই ফলটি। সাধারণত পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় এই রক্তগোটাগাছ দেখা যায়।
গাছটি বিরুৎ জাতীয় উদ্ভিদ। কাণ্ড একেবারে নরম। অন্য গাছের ওপর ভর করে ওপরে ওঠে। একটি কাষ্টযুক্ত গাছের চারপাশ দখল করে শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত হয় রক্তগোটাগাছের। এ গাছে ফেব্রুয়ারি থেকে থোকায় থোকায় ফুল আসতে শুরু করে এবং এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়। পেকে লাল হওয়ার পরই খাওয়ার উপযোগী হয়। একটি প্রাপ্তবয়স্ক গাছে কমপক্ষে ২০-২৫ হাজার ফল ধরে।
ভারতের পরিবেশ, বিজ্ঞান ও প্রকৃতি নিয়ে কাজ করা ডাউন টু আর্থ সাময়িকীর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রক্তগোটা মূলত প্রাকৃতিক বনে উৎপন্ন হয়। বনাঞ্চল কমে যাওয়ায় এ ফল দুর্লভ হয়ে পড়েছে। কারেন্ট সায়েন্স সাময়িকীর এক নিবন্ধে এ ফলের জাত চাষের মাধ্যমে সংরক্ষণ করা সম্ভব বলে মত দেওয়া হয়।
বর্তমানে ফলটির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের কৃষকদের মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে এ ফল চাষ করার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। বীজ ও কলম উভয় পদ্ধতিতে এ গাছের বংশ বিস্তার করা যায়।
সরেজমিনে রাঙামাটি সদর উপজেলার ৪ নম্বর কুতুকছড়ি ইউপির মোনতলা পাড়ায় স্থানীয় লক্ষ্মী কুমার চাকমার সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, তার বাগানে একটি রসকো (রক্তগোটা) ফলের লতা (গাছ) রয়েছে। গত বছরের তুলনায় এ বছর ফলন যথেষ্ট ভালো হয়েছে। প্রথম ধাপে পাকা ফলগুলো ২৫-২৬ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। আর গাছে যেগুলো আছে সেগুলো বিক্রি হলে আনুমানিক ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা হবে।
তিনি আরও বলেন, ফলের লতাটির বয়স আনুমানিক ২০-২২ বছর হবে। প্রথম ৫ বছর হওয়ার পর থেকে ফলন দেওয়া শুরু হয়েছে। এখন পর্যন্ত ভালো ফলন দিচ্ছে। লতাটি কত বছর পর্যন্ত বাঁচবে তার কোনো হিসাব নেই। আগে ফলটির চাহিদা না থাকায় সস্তা দামে কেজি ৪০-৫০ টাকায় বিক্রি করতাম। কিন্তু আস্তে আস্তে ফলটির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় মৌসুমের শুরুতে কেজি ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
পার্বত্য অঞ্চল কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক তপন কুমার পাল বলেন, রসকো নিয়ে এখনও কোনো গবেষণা হয়নি। তবে ফলটিতে ভিটামিন সি ও আয়রন উপাদান থাকতে পারে। এটিতে টক ও মিষ্টতা রয়েছে। রসকোর রস পুরোটাই রক্তের মতো লাল।
পার্বত্য চট্টগ্রামের আবহাওয়া রসকো চাষে উপযোগী হওয়ায় এটি বাণিজ্যিকভাবে চাষ করে লাভবান হওয়া যাবে। জেলা কৃষি বিভাগের প্রচলিত ফলের তালিকায় রসকো বা রক্তগোটা ফলটির নাম নেই।