ফেনী প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৫ মে ২০২৩ ১৬:৫৩ পিএম
বৃষ্টি না থাকা ও ভারতের উজান থেকে পানি না আসায় শুকিয়ে যাচ্ছে ফেনীর মুহুরী নদী। ছবিটি ফুলগাজীর দেড়পাড়া এলাকা থেকে তোলা। প্রবা ফটো
বৃষ্টি না থাকা ও ভারতের উজান থেকে পানি না আসায় শুকিয়ে যাচ্ছে ফেনীর মুহুরী ও সিলোনিয়া নদী। ফলে চাষাবাদের সেচ নিয়ে বিপাকে পড়েছে কৃষক। বেড়ে যাচ্ছে তাদের উৎপাদন খরচ। হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় প্রজাতির মাছ, সংকটে পড়ছে মৎস্যজীবীরাও। তা ছাড়া নদীর জলজ প্রাণ-প্রকৃতির ওপরও পড়েছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া। তাই দ্রুত খননের দাবি স্থানীয়দের।
জেলা কৃষি অফিসের তথ্য মতে, পরশুরাম উপজেলায় চলতি বছর ৩ হাজার ৩৭০ হেক্টর আর ফুলগাজীতে ৪ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। পানি সংকটে অন্তত ১ হাজার হেক্টর জমিতে চাষাবাদ ব্যাহত হয়েছে। সেচের অভাবে ফসল উৎপাদন কম হয়েছে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, মুহুরী নদীর ফুলগাজীর দেড়পাড়া গ্রাম থেকে পরশুরাম পর্যন্ত পানি শুকিয়ে গেছে। নদীর কিছু অংশ মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে সিলোনিয়া নদীর ফুলগাজীর বন্দুয়া সেতু অংশের পূর্ব-পশ্চিম পাশে দেড় কিলোমিটার এলাকা ছাড়া বাকি অংশে পানি নেই। নদীর দুপাশে নিলক্ষ্মী, গোসাইপুর, করইয়া, শ্রীবউরা, নোয়াপুর, কামাল্লা, রাজেশপুর, মনতলা, গাবতলা, মান্দারপুর ও পৈথারা গ্রামের হাজারও কৃষক চাষাবাদ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ছেন। এ ছাড়া গভীরতা কমে যাওয়ায় এবং খনন না হওয়ায় নদীর পানি ভূগর্ভে যেতে পারছে না। ফলে নিচে নেমে গেছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও। এতে কয়েকটি গ্রামের কৃষক চাষাবাদ নিয়ে বিপাকে পড়েছে।
পলি মাটি, বালি ও ময়লা পড়ে ভরাট হয়ে যাওয়ায় নদীগুলো মরা খালে পরিণত হয়েছে। বর্ষাকাল সামান্য বৃষ্টিতেই নদীর পানি উপচে আশপাশের এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। পরশুরাম পৌর এলাকার কোলাপাড়া গ্রামের কৃষক আবুল খায়ের জানান, মুহুরী নদীর উজানের অংশে ভারত সীমান্তে পানি আটকে দিচ্ছে। এদিকে বাংলাদেশ অংশে বাজারের পোল্ট্রি খামারের ময়লা আবর্জনা ফেলাসহ নানা কারণে নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে। যে কারণে নদী শুকিয়ে গেছে।
ফুলগাজী উপজেলার নোয়াপুর গ্রামের কৃষক রবিউল হক টিটু বলেন, ‘দীর্ঘ ৫০ বছর কৃষিকাজ করে আসছি। পাঁচ বছর আগেও সিলোনিয়া নদীর পানি দিয়ে সেচ দিতাম। এবার মাঠের কৃষিজমির ধান শুকিয়ে গেছে। দুই একর জমিতে বোরো চাষ করেছি। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ফলন হয়নি।’
আবু মিয়া নামে আরেকজন কৃষক জানান, নদী মরুভূমি হয়ে গেছে। মাটিতে গর্ত করে শ্যালো মেশিন দিয়ে পানি উত্তোলন করে সেচ দিতে হয়। তাও ঠিকমতো পানি ওঠে না। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
এদিকে নদীতে পানি না থাকায় মৎস্যজীবীরাও সংকটে পড়ছেন। দেশি প্রজাতির মাছের স্বাদ বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয়রা। জমির হোসেন নামে একজন মৎস্যজীবী বলেন, ‘বাড়ির পাশেই সিলোনিয়া নদী। কয়েক বছর আগেও এই নদী থেকে মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করে সংসার চালিয়েছি। এখন আর নদীতে পানি নেই। ফলে মাছও পাওয়া যায় না। তাই মাছ শিকার বাদ দিয়ে অটোরিকশা চালাই। আমার মতো অনেকেই পেশা বদল করেছে।’
ফুলগাজী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাসুদ রানা বলেন, ‘বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় নদীর পানি শুকিয়ে গেছে। আবার নদীতে নাব্যতাও কম, খনন জরুরি।’
মির্জানগর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান ভুট্টু বলেন, ‘কৃষকের পানি সংকটের বিষয়টি জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জানিয়েও কোনো সুরাহা হয়নি। সংকটের ফলে চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে।’
জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আখতার হোসেন বলেন, ‘মুহুরী নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়ার ঘটনা এর আগে কখনও ঘটেনি। পানি সংকটে এবারের চাষাবাদ ব্যাহত হয়েছে। আপাতত নদী খননের কোনো প্রকল্প নেই। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাসহ খননে প্রকল্প নেওয়া হবে।’