মেরিনা লাভলী, রংপুর
প্রকাশ : ০৫ মে ২০২৩ ১৫:১৪ পিএম
নারী দলকে নকশীকাঁথা ও থ্রি-পিসের নকশা তোলার কাজ দেখিয়ে দিচ্ছেন রংপুরের তারাগঞ্জের শিল্পী বেগম। সম্প্রতি তোলা ছবি। প্রবা ফটো
কাপড়ে নকশা তুলে ভাগ্য বদলেছেন রংপুরের তারাগঞ্জের শিল্পী বেগম। আশপাশের গ্রামের আরও দুই হাজার নারীকেও আয়ের পথ দেখিয়েছেন তিনি। আর এ পথপরিক্রমার মধ্য দিয়ে শিল্পী হয়ে উঠেছেন সফল উদ্যোক্তা। প্রতিকূলতার পাহাড় পেরিয়ে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ায় উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ জয়িতার পদক অর্জন করেছেন এ নারী।
শিল্পী বেগমের বাড়ি রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার কুর্শা ইউনিয়নের জিগাতলা গ্রামে। দশম শ্রেণিতে উঠে ১৯৯৬ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সেই তার বিয়ে হয়ে যায় পাশের ঝাঁকুয়াপাড়া গ্রামের নান্নু চৌধুরীর সঙ্গে। কিন্তু তখন তার স্বামীও ছিলেন কর্মহীন। এ কারণে অভাব-অনটন নিত্যসঙ্গী হয়ে ওঠে তাদের। এ অবস্থার কথা জানতে পেরে শিল্পীকে তার বাবা বাড়িতে নিয়ে আসেন। কিন্তু শিল্পী স্বপ্ন দেখেন ক্ষুধা-দারিদ্র্য দূর করে সংসারে সুখ নিয়ে আসার। তাই তিনি বাবার বাড়ি থেকে আবারও চলে আসেন স্বামীর কাছে। ১৯৯৭ সালে তারাগঞ্জ ও/এ বালিকা স্কুল ও কলেজ থেকে এসএসসি পাস করেন তিনি। এরপর নেমে পড়েন চাকরির সন্ধানে। পাশাপাশি স্বামীকেও চাকরির ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন। ডিগ্রি পাস স্বামী বেসরকারি সংস্থায় একটি চাকরি পেয়ে যান। যদিও কর্মহীনই থাকতে হয় শিল্পীকে।
এরপর আসে ২০০৪ সালের জুন মাসের সেই দিন। পাশেই জুম্মাপাড়া গ্রামে শিল্পী সেদিন বেড়াতে গিয়েছিলেন ননদ রাজিয়া খাতুনের বাড়িতে। সেখানে মইনুল হক নামের এক ব্যক্তিকে তিনি কয়েকজন নারীকে শাড়িতে নকশা তোলার কাজ করাতে দেখেন। কাজটি তার মনে ধরে যায়। তাই প্রায় ১০ দিন ধরে আট কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দিয়ে ননদের বাড়িতে গিয়ে প্রশিক্ষণ নেন নকশা করার। সিদ্ধান্ত নেন, মেয়েদের পোশাক তৈরির একটি দোকান দেবেন। প্রাথমিক পর্যায়ে বাড়িরই একটি কক্ষে শুরু করেন সেলাই ও হাতের কাজ। সুনাম, আয় ও ব্যবসার পরিধি বেড়ে যাওয়ায় এরপর তারাগঞ্জ বাজারে তিনি পোশাক বিক্রির একটি দোকান করেন। নিজের মেয়েদের নামে সেটির নামকরণ করেন ‘নেহা-নিম্মী ফ্যাশন এন্ড ফেব্রিক্স’। কয়েক বছর পর ২০০৯ সালে ঢাকার কাপড় ব্যবসায়ীর সঙ্গেও যোগাযোগ গড়ে ওঠে তার। শুরু করেন শাড়ির পাশাপাশি পাঞ্জাবি ও থ্রি-পিসেও নকশা করা।
এরপর গ্রামের দরিদ্র ও অভাবী পরিবারের নারীদেরও এ কাজে যুক্ত করেন শিল্পী বেগম। ২০১০ সালে গ্রামের ৫০ জন দরিদ্র নারীকে নিয়ে গঠন করেন ‘হতদরিদ্র কর্মজীবী মহিলা উন্নয়ন সমিতি’। তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে নকশা ও কারচুপির কাজে লাগিয়ে দেন। গ্রামের অন্য গৃহবধূরাও প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন শিল্পীর কাছে। বর্তমানে ১৫টি গ্রামের দুই হাজার নারী কাজ করছেন শিল্পীর সঙ্গে। কারুপণ্যসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও কাজ করছেন তিনি। সংসারে ফিরেছে সচ্ছলতা। মেয়ে নুসরাত নাহার নিম্মী ও নওশীন নাহার নেহা এবং স্বামীকে নিয়ে সুখের সংসার করছেন তিনি। পাকা বাড়ি করেছেন, কিনেছেন আবাদি জমি, এমনকি মোটরসাইকেলও। পাশাপাশি পালন করছেন হাঁস-মুরগি ও গাভি।
হাজীপুর, ইকরচালী, শিকারপাড়া, জিগাতলা, বাছুরবান্দা গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে নারীরা দল বেঁধে পাঞ্জাবি, থ্রি-পিস, কাঁথায় নকশা তোলার কাজ করছেন। বাছুরবান্ধা এলাকায় গিয়ে দেখা গেল, দুটি নারী দলকে কাঁথা ও থ্রি-পিসে নকশা তোলার কাজ দেখিয়ে দিচ্ছেন শিল্পী।
সেখানে কথা হলো ওই গ্রামের গৃহবধূ সাবিত্রী রানীর (২৫) সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘আগোত ভাত রান্না করা ছাড়া কোনো কাম আছলো না। শিল্পী আপা হামাক সেলাইয়ের কাজ দিছে। অ্যালা অবসর সময় শিল্পী আপার নকশার কাজ করি। অ্যালা আয়ও করি।’
জিগাতলা গ্রামের মনছুরা আক্তার (২৬) ও শিকারপাড়া গ্রামের খোতেজা খাতুন (৩৭) বলেন, ‘শিল্পী আপার পরামর্শে বাড়িতে শাড়ি, পাঞ্জাবি, থ্রি-পিসে নকশা ও কারচুপির কাজ করছি। এতে প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা আয় হচ্ছে।’
শিল্পীর শাশুড়ি নুরনাহার বলেন, ‘বউয়ের জন্যে গ্রামোত মাথা উচা করি চলবার পাই। ওয় খালি হামার সংসারের চাকা ঘুরায় নাই, গ্রামের অন্য মানুষেরও সংসারের চাকা ঘুরি দিচে।’
শিল্পী বেগম বলেন, ‘অভাব আর কষ্ট দিয়ে আমার জীবন শুরু হয়েছিল। এখন আমি নিজ প্রচেষ্টায় স্বাবলম্বী। নারীরা যদি চেষ্টা করে তবে তারা নিজের ও পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে। ধীরে ধীরে শাড়িতে নকশার কাজে অন্য সব গ্রামের নারীদেরও যুক্ত করব।’
উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা নুরেশ কাওসার জাহান বলেন, ‘শিল্পীর ঝুড়িতে শ্রেষ্ঠ জয়িতার পুরস্কার রয়েছে। তিনি গ্রামের নারীদের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করে চলেছেন।’
উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান লিটন বলেন, ‘শিল্পীর মতো আত্মনির্ভরশীল নারী সমাজে এখন খুবই প্রয়োজন। তার হাত ধরে গ্রামের নারীরা জীবন-মানের উন্নয়ন ঘটিয়েছে। স্বাবলম্বী হওয়ার পথ খুঁজে পেয়েছে।’