বরিশাল সিটি নির্বাচন
মঈনুল ইসলাম সবুজ, বরিশাল
প্রকাশ : ০৪ মে ২০২৩ ০৯:৩৮ এএম
আপডেট : ০৪ মে ২০২৩ ১৫:৪১ পিএম
আবুল খায়ের আবদুল্লাহ ও তার ভাতিজা সাদিক আবদুল্লাহ।
আসন্ন বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদের জন্য বর্তমান মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ্ ও তার চাচা আবুল খায়ের আবদুল্লা ওরফে খোকন সেরনিয়াবাতসহ আটজন দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন।
মনোনয়নযুদ্ধে সাদিককে হারিয়ে শেষ হাসি হাসেন তার চাচা খোকন সেরনিয়াবাত। কেন্দ্র থেকে গত ১৫ এপ্রিল মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকে বরিশাল জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে। দলে সাদিকবিরোধীদের বাদ দিয়ে নির্বাচনের সব ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এতে সিটি নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন দলীয় নেতাকর্মীরা।
তবে স্থানীয় কয়েকজন শীর্ষ নেতা বলেছেন, ব্যক্তি নয়; নৌকা প্রতীক হলো আওয়ামী লীগের প্রাণ। প্রধানমন্ত্রী যাকে মনোনয়ন দিয়েছেন, তার বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। নৌকার প্রশ্নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরি বলে মনে করেন তারা।
বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট তালুকদার মো. ইউনুস প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আওয়ামী লীগ একটি বৃহত্তম দল। এ দলে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো একাধিক ব্যক্তি রয়েছেন। বরিশালে আবদুর রব সেরিনয়াবাতের ছোট ছেলে খোকন সেরনিয়াবাতকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। ব্যক্তি কে সেটা বড় কথা নয়, দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যার হাতে নৌকা দিয়েছেন, তার বিরুদ্ধে যাওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না।
তিনি আরও বলেন, আমাদের রাজনৈতিক অভিভাবক জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ শিগগিরই বরিশালে আসবেন। সবাইকে সঙ্গে নিয়েই নৌকার বিজয় নিশ্চিত করার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ব আমরা।
এদিকে আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ ও বর্তমান মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহর অনুসারীদের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ না করে গত রবিবার মেয়রপ্রার্থী খোকন সেরনিয়াবাত তার নির্বাচন পরিচালনা কমিটি ঘোষণা করেন। ওই কমিটিতে মহানগর আওয়ামী লীগের শীর্ষপর্যায়ের কাউকে রাখা হয়নি। নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতে যে ১৬ জনকে রাখা হয়েছে, তারা সবাই সাবেক মেয়র প্রয়াত শওকত হোসেন হিরন ও সদর উপজেলা এলাকার সংসদ সদস্য পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুকের অনুসারী।
একাধিক নেতাকর্মী বলেন, মনোনয়ন ঘোষণার পর জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের কিছু না জানিয়ে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান করা, মেয়রপ্রার্থীর নির্বাচনী কার্যালয় উদ্বোধন, অনুষ্ঠানের দলগত আমন্ত্রণ না দিয়ে ব্যক্তিগতভাবে আমন্ত্রণ জানানো, ওই অনুষ্ঠানে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য তালুকদার মো. ইউনুস এবং মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট একেএম জাহাঙ্গীর হোসেনকে চেয়ার না দেওয়া, মে দিবসের অনুষ্ঠান পৃথকভাবে পালন করা, শিক্ষার্থীদের মধ্যে ট্যাব বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রীর অনুরোধে খোকন সেরনিয়াবাতকে মনোনয়ন দেওয়া হয় জানিয়ে বক্তব্য রাখা, সাবেক ও বর্তমান ছাত্রলীগ নেতাদের মতবিনিময় সভায় প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুকের দেওয়া বক্তব্য আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব আর বিভক্তিই প্রকাশ পায়। নির্বাচনী মাঠে এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে বলে ওই সব নেতা মনে করেন।
তারা আরও বলেন, বহু বছর ধরে এই নগরে আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করা মেয়র সাদিক ও তার বাবার বড় বলয় রয়েছে। তাদের দূরে রেখে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া কখনোই সম্ভব হবে না।
মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক অ্যাডভোকেট গোলাম সরোয়ার রাজিব প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বর্তমান মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আদুল্লাহবিরোধীদের আচার-আচারণ ও বক্তব্য দলের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করছে। এভাবে চলতে থাকলে সিটি নির্বাচনে কিছুটা হলেও প্রভাব পরবে।
তিনি বলেন, মহানগর আওয়ামী লীগের ৩০টি ওয়ার্ড কমিটি, ছাত্রলীগ, যুবলীগের বৃহত্তর একটি অংশ, অন্যান্য সহযোগী সংগঠনের অধিকাংশ নেতাকর্মীই সাদিক আবদুল্লাহর অনুসারী। তাকে দূরে সরিয়ে রাখার চিন্তা যথাযথ হবে না।
খোকন ঘোষিত নির্বাচন পরিচালনা কমিটির অন্যতম সদস্য ও শহর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মীর আমিন উদ্দিন মোহন বলেন, ১৬ জনের কমিটিতে মেয়র সাদিক কিংবা তার বাবা আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর ঘনিষ্ঠ কোনো অনুসারীকে রাথা হয়নি। এ কাজ করে খোকন সেরনিয়াবাত নিজের রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন। নৌকার মনোনয়ন না পাওয়ার পর থেকেই খোকন সেরনিয়াবাতের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। কীভাবে নৌকার প্রার্থীকে হারানো যায় তার ছক আঁকছেন সাদিক এবং তার অনুসারীরা। তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে নৌকাকে হারাতে হবে। এ অবস্থায় নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার কোনো অর্থ নেই। সেটা করলে খোকন সেরনিয়াবাত নিজের পায়ে কুড়াল মারার মতো হতো। আমরা শওকত হোসেন হিরনের নির্বাচনের সময় দেখেছি কীভাবে তাকে হারানো হয়েছে।
জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বাদ দিয়ে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি ঘোষণার বিষয়টিকে দলে বিভক্তি তৈরির চেষ্টা হিসেবে অভিহিত করে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট একেএম জাহাঙ্গীর বলেন, ‘এটা যারা করছেন তারা ঠিক করছেন না। এখন সবার ঐক্যবদ্ধভাবে ভোটের মাঠে নামার সময়। এরকম একটি অবস্থায় একপেশে কোনো কমিটি করা মানে ভোটের মাঠে অনৈক্যের সৃষ্টি করা। হতে পারে এটা প্রার্থীর নিজস্ব কোনো সিদ্ধান্ত। কিন্তু যেখানে প্রশ্ন নৌকার মানসম্মানের, সেখানে আমরা দলীয়ভাবেই সিদ্ধান্ত নিয়ে মাঠে নেমেছি। জননেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ মাথায় নিয়ে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ যৌথভাবে সভার মাধ্যমে ভোটযুদ্ধে জয়ী হওয়ার কর্মপরিকল্পনা নেবে। তা ছাড়া নির্বাচন পরিচালনার প্রশ্নে কেন্দ্র থেকেও একটি কমিটি অথবা কোনো না কোনো নেতাকে সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়া হবে। সে সিদ্ধান্ত পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেব আমরা।’