এস এম রানা ও হুমায়ুন মাসুদ
প্রকাশ : ০১ মে ২০২৩ ১২:১৫ পিএম
আপডেট : ০১ মে ২০২৩ ১২:১৯ পিএম
শিপইয়ার্ডে লোহা কাটার কাজ করছেন শ্রমিকরা। প্রবা ফটো
শনিবার দুপুর। সীতাকুণ্ডের শীতলপুর এলাকার বঙ্গোপসাগরের তীরে শিপইয়ার্ড শ্রমিক রফিকুল ইসলামের মাথার ওপর বয়ে চলেছে মধ্য বৈশাখের তীব্র তাপপ্রবাহ। তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু অনুভূত হচ্ছে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো।
এমন লু হাওয়ার মধ্যেও স্ক্র্যাপ জাহাজে গ্যাস কাটিং করছেন মধ্যবয়স্ক রফিকুল। দরদর করে ঘাম ঝরছে তার পুরো শরীর থেকে। কিন্তু সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই তার। গ্যাস-কাটার দিয়ে আস্ত জাহাজের লোহার পাত কেটে টুকরো করতে ব্যতিব্যস্ত তিনি।
বঙ্গোপসাগরের তীরে স্ক্র্যাপ জাহাজে গ্যাস কাটিংয়ের কাজ করে রফিকুল ঘণ্টায় আয় করেন মাত্র ৫০ টাকা; দিনে ১২ ঘণ্টা শ্রম বিক্রি করতে পারলে জোটে ৬০০ টাকা।
রফিকুল যখন সীতাকুণ্ডে জাহাজ কাটার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছেন, তখন সেখান থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে দেশের অন্যতম ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে পণ্য ওঠানামার কাজে ব্যস্ত মোহাম্মদ আকবর। রফিকুল ১২ ঘণ্টা শ্রম বিক্রি করে যে আয় করেন, আকবরও কম-বেশি সেরকম আয়ই করেন। দুজনের কাজে জীবনঝুঁকির মাত্রার দিক থেকে তারতম্য ব্যাপক। যদিও আয়ে তারতম্য সামান্যই। দুজনই দিনমান কাজ করে সংসারের হাল টানতে হিমশিম খান। মাছ-মাংসের মতো আমিষ-প্রোটিন বাদ দিয়ে ডাল-ভাতের সঙ্গে এখন সখ্য করতে হয়েছে তাদের। ৯০০ টাকা কেজি দরের গরুর মাংস আর ২৫০ টাকার ব্রয়লার মুরগির স্বাদ ভুলতেই বসেছে রফিকুল-আকবরের জিহ্বা।
ঝুঁকিপূর্ণ কাজের বর্ণনা দিতে গিয়ে বরগুনা জেলার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘২৫ বছর ধরে ইয়ার্ডে কাজ করছি। এখানে রয়েছে কাটিং গ্রুপ, ওয়্যার (তার) গ্রুপ, লোডিং গ্রুপ ও কাদা নিষ্কাশন গ্রুপ। এর মধ্যে কাটিং গ্রুপ ঘণ্টায় ৫০ টাকা এবং অন্য গ্রুপগুলো ঘণ্টায় ৪৫ টাকা হারে বেতন পায়। আট ঘণ্টা কাজ করলে ৪০০ টাকা বেতন ওঠে। এর সঙ্গে চার ঘণ্টা ওভারটাইম করলে পাওয়া যায় ২০০ টাকা। সব মিলিয়ে দিনে আয় ৬০০ টাকা।’
শ্রমিকরা জানান, সারা দিন এভাবে গাড়িতে পণ্য ওঠানামার কাজ করে ৫০০ থেকে সর্বোচ্চ ৭০০ টাকা আয় হয়।
প্রায় চার দশক আগে সীতাকুণ্ডে বঙ্গোপসাগরের তীরে শিপইয়ার্ড শিল্পের গোড়াপত্তন হয়। আগে শিপইয়ার্ড ছিল ১৬০টি। এখন এ সংখ্যা ৩২টিতে নেমে এসেছে। অতীতে শ্রমিক ছিলেন অন্তত ৩০ হাজার। ইয়ার্ড কমে যাওয়ায় কমেছে শ্রমিকের সংখ্যাও। চালু থাকা ইয়ার্ডগুলোয় কর্মরত শ্রমিকসংখ্যার ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য মেলেনি।
তবে চালু থাকা ইয়ার্ড শ্রমিক রফিকুল, সুব্রত, মতিলাল, শাহজাহান, তৈয়ুব, ফোরম্যান মো. রুবেল ও আবদুস সাত্তাররা শোনালেন জীবন-জীবিকার গল্প। রফিকুলের চার সন্তান। তাদের মধ্যে এক মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন, বাকি তিনজন বাড়িতে থাকে। দুই-তিন মাস পরপর বগুড়ায় গ্রামের বাড়িতে যান রফিকুল।
ফোরম্যান পদে দুই যুগের বেশি সময় পার করে দেওয়া আব্দুস সাত্তারের ভাগ্য কিছুটা সুপ্রসন্ন। মালিকপক্ষ তাকে মাসিক বেতন দেয়। কিন্তু রফিকুলরা কাজ না করলে বেতন পান না। আবদুস সাত্তারের পথে এগোচ্ছেন এক সময়কার শ্রমিক মো. রুবেল, এখন তিনি ফোরম্যান।
শ্রম আইন অনুযায়ী ওভারটাইম করলে মূল বেতনের দ্বিগুণ টাকা পাওয়ার কথা। সে সৌভাগ্য অবশ্য হয় না ইয়ার্ড শ্রমিকদের। তারা পান মূল কর্মঘণ্টার সমান বেতন।
শ্রমিকদের কর্ম-নিরাপত্তার বিষয় পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অধিকাংশ ইয়ার্ডে শ্রমিকদের কাজের সময় নিরাপত্তা সরঞ্জাম (পিপিই) সঠিকভাবে সরবরাহ করা হয় না। অথচ ২০২২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর শিল্প মন্ত্রণালয়ের জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ অধিশাখা প্রণীত বিধিমালার ১৭নং ধারায় শ্রমিকদের পিপিই সরবরাহসহ নিরাপত্তার বিষয়ে বিশদ নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু ইয়ার্ডগুলো সব নির্দেশনা মানছে না।
শ্রমিকরা বলছেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী দক্ষ শ্রমিকদের দিয়ে জাহাজভাঙা শিল্পের কার্যক্রম চালাতে হবে। কিন্তু পর্যাপ্ত দক্ষ শ্রমিক নেই ইয়ার্ডে। উত্তরাঞ্চলসহ বিভিন্ন স্থান থেকে নতুন অদক্ষ শ্রমিক এনে প্রায়ই এ শিল্পে যুক্ত করা হয়। এদের কোনো প্রশিক্ষণ না থাকায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে।
অভিযোগ রয়েছে, দুর্ঘটনায় কারও মৃত্যু হলে কোনো কোনো মালিকপক্ষ চেষ্টা করে সেটিকে সাধারণ মৃত্যু হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার। কারণ দুর্ঘটনায় শ্রমিকের মৃত্যু হলে শ্রম আদালতের মাধ্যমে দুই লাখ টাকার সঙ্গে আরও পাঁচ লাখসহ মোট সাত লাখ টাকা দিতে হয় নিহত শ্রমিকের পরিবারকে। এই ক্ষতিপূরণের টাকা না দিতেই এমন অপচেষ্টা চালানো হয়। এ ছাড়া শুরুতে মালিকপক্ষ আহত শ্রমিকের চিকিৎসা ব্যয় দিলেও পরে আর খোঁজখবর রাখে না।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা শিপইয়ার্ড প্ল্যাটফর্মের তথ্যমতে, ২০০৫ থেকে ২০২৩ সালের এপ্রিল পর্যন্ত এ শিল্পে ২৫০ জন শ্রমিক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। নিহত সব শ্রমিক আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ পাননি।
শ্রমিকদের ন্যূনতম বেতন ও নিরাপত্তা প্রসঙ্গে শিপব্রেকিং শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি সফর আলী বলেন, ‘শ্রমিকদের ন্যূনতম বেতন মাসিক ১৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু অনেক ইয়ার্ড মালিকই ন্যূনতম মজুরি দেন না।’ তিনি বলেন, ‘দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলে শ্রম আদালতের মাধ্যমে দুই লাখ টাকা দিতে হয় মালিকপক্ষের। এর বাইরে আরও পাঁচ লাখ টাকা প্রদানের একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে। বেশিরভাগ ইয়ার্ড মালিকই এটি বাস্তবায়ন করে থাকেন।’
শ্রমিকদের সমস্যা থেকে উত্তরণের বিষয়ে শিপইয়ার্ড শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইপসার প্রোগ্রাম ম্যানেজার মোহাম্মদ আলী শাহীন বলেন, ‘হংকং কনভেশন অনুযায়ী ২০২৪ সালের মধ্যে সবগুলো শিপইয়ার্ডকে গ্রিন ইয়ার্ডে রূপান্তর করার সরকারি ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগ আছে। ইতোমধ্যে মোট তিনটি গ্রিন ইয়ার্ডে রূপান্তরিত হয়েছে। সবগুলো ইয়ার্ড গ্রিন হলে শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত হবে।’
পিঠে বস্তা উঠলেই কেবল অন্ন জোটে
‘আমাদের অন্য কোনো আয় নেই। পিঠে বস্তা উঠলে আয় জোটে, না হলে অভুক্ত থাকতে হয়।’ জানালেন দেশের অন্যতম প্রধান ভোগ্যপণ্যের বাজার খাতুনগঞ্জের পণ্য লোড-আনলোডিং শ্রমিক মোহাম্মদ আকবর। এক যুগের বেশি সময় ধরে তিনি এ পেশায় যুক্ত।
আকবর বলেন, ‘খেতে হলে কাজ করতে হবে। এটা আমার নসিবে আছে। তাই কিছু করার নেই।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের আয় খাতুনগঞ্জের বেচাকেনার ওপর নির্ভরশীল। বেচাকেনা হলে আয়ও ভালো হয়। না হলে অলস বসে থাকতে হয়।’
শুধু আকবর নন, ভোগ্যপণ্যের অন্যতম পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের অন্তত পাঁচ হাজার শ্রমিকের আয় নির্ভর করে সেখানে পণ্য বেচাকেনার ওপর। এরাই খাতুনগঞ্জের প্রাণ। তারা কাজ না করলে থমকে যায় পণ্য সরবরাহ, স্থবির হয়ে পড়ে অর্থনৈতিক লেনদেন।
খাতুনগঞ্জের আড়তদারদের তথ্যানুযায়ী, একজন মাঝি বা সর্দারের অধীনে থাকেন পাঁচ-সাতজন লোড-আনলোডিং শ্রমিক। দলটি দুই-তিনটি আড়তের পণ্য ওঠানামা করে। সবাই মিলে সারা দিনে যা আয় করেন, দিন শেষে তা ভাগ করে নেন।
এক্ষেত্রে ৫০ কেজি ওজনের এক বস্তা মাল ট্রাক থেকে আড়তে নামানোর জন্য ৬-১০ টাকা নেওয়া হয়। আবার আড়ত থেকে ট্রাকে তোলার সময় ১০-১৫ টাকা পর্যন্ত নেয়া হয়। তবে কিছু নির্দিষ্ট পণ্যের ক্ষেত্রে মজুরি ভিন্ন। যেমন- দেশি হলুদের বস্তা নামানোর ক্ষেত্রে নেওয়া হয় ৮ টাকা। আবার ওই হলুদের বস্তা আড়ত থেকে ট্রাকে তোলার সময় নেন ২০ টাকা। ভারতীয় হলুদের বস্তা নামাতে নেওয়া হয় ১০ টাকা। একই হলুদের বস্তা আড়ত থেকে ট্রাকে তুলতে নেয়া হয় ২৫ টাকা। সবচেয়ে কম টাকা পাওয়া যায় ডাল লোড-আনলোডিংয়ে। শ্রমিকরা জানিয়েছেন, ডাল মিলে পণ্য নামাতে বস্তাপ্রতি ৩ টাকা নেওয়া হয়। মিল থেকে ট্রাকে ডেলিভারির সময় নেওয়া হয় ৬-৭ টাকা।
কুমিল্লা জেলার বাসিন্দা আব্দুল আওয়াল। গত ২০ বছর ধরে তিনি খাতুনগঞ্জে লোড-আনলোডের কাজ করছেন। দুই ছেলে, দুই মেয়ের জনক আব্দুল আওয়ালের বয়স প্রায় ৫০ বছর। তিনি বলেন, দুই দশকের বেশি সময় ধরে এখানে লোড-আনলোডের কাজ করছি। আগে যেমন কষ্টে ছিলাম, এখনও তেমনই আছি। কোনো দিন আয় হয় আবার কোনো দিন অলস বসে থাকতে হয়। শুরুর দিকে বস্তাপ্রতি দুই টাকা পেতাম। এখন পাই ছয়-সাত টাকা। কিন্তু এখন জিনিসপত্রের দাম অনেক বেশি। তাই সব মিলিয়ে দিন শেষে আমাদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি।
তিনি বলেন, কোনো দিন ৩০-৩৫ বস্তা লোড-আনলোড করি। আবার কোনো দিন ৯০ থেকে ১০০ বস্তাও হয়। তবে গড়ে প্রতিদিন ৩৫ থেকে ৪০ বস্তার বেশি হয় না।
বৃহত্তর খাতুনগঞ্জ লোডিং-আনলোডিং শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মোহাম্মদ ইব্রাহিম বলেন, ‘পেঁয়াজ, রসুন, আদা, হলুদের ধোলাই (লোড-আনলোড) ঠিক আছে। এসব আড়তে কাজ করে একজন শ্রমিক গড়ে প্রতিদিন ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা আয় করতে পারেন। কিন্তু ডাল মিলে শ্রমিকরা ধোলাই কম পান। ৫০ কেজি বস্তা মিলে নামালে ৩ টাকা, মিলের সামনে গাড়িতে ডেলিভারি দিলে ৬ থেকে ৭ টাকা পান। ওদের প্রতিদিন গড়ে আয় হয় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। তাদের চলতে অনেক কষ্ট হয়।’