মঈনুল ইসলাম সবুজ, বরিশাল
প্রকাশ : ২৯ এপ্রিল ২০২৩ ১১:২৩ এএম
আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০২৩ ১১:৫০ এএম
ফাইল ফটো
বরিশালের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে মেঘনা নদী। দেশের অন্যতম এ নদীতে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ধরেন হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জের জেলেরা।
প্রায় ১০ হাজারের বেশি জেলে স্থানীয় বিভিন্ন নদনদী ও জলাশয় থেকে মাছ শিকার করার কাজে জড়িত। কখনও এই মাছ হয়ে ওঠে তাদের বিপদের কারণ। রাতের বেলা জেলেদের কাছ থেকে মাছ লুট করতে হামলা করে মুখোশধারী ডাকাত দল। বর্তমানে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে প্রশাসনের অভিযানে ডাকাতরা গা-ঢাকা দিয়েছে। কিন্তু আসছে বর্ষায় তাদের হামলা আবার বেড়ে যাবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন জেলেরা। তাদের অভিযোগ, নদীতে প্রায় ২০টি ডাকাত দল সব সময় সক্রিয় থাকে।
জেলেরা জানান, মাছ ধরার মৌসুমে ডাকাতের আতঙ্ক নিয়েই মাঝনদীতে যাবেন তারা। কপাল খারাপ হলে ডাকাত দলকে সব দিয়ে সর্বস্বান্ত হতে হবে। আর ভালো হলে মাছ নিয়ে সুষ্ঠুভাবে ঘাটে ফিরে আসতে পারবেন। তারা আরও জানান, ডাকাতরা মাছ, মাছ বিক্রির টাকা, মাছ ধরার জাল, কোনো কোনো সময় নৌকার বৈঠা পর্যন্ত নিয়ে যায়। তাদের সঙ্গে বিরোধ করলে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে জখম করে। মুখোশ পরে থাকায় তাদের চেনা যায় না।
এলাকাবাসী জানান, ডাকাত দলগুলো নিয়ন্ত্রণ করে লক্ষ্মীপুরের অলতু, ভোলার বাহাদুর বেপারী, মেহেন্দীগঞ্জের সালাম দেওয়ান, শহীদ দেওয়ান, মোশারফ আকন বাচ্চু ও কাশেম। প্রায় ২০টি ডাকাত দল জেলেদের লুটপাট করতে সব সময় সক্রিয় থাকে। তারা গভীর রাতে ট্রলারে এসে জেলেদের ওপর হামলা চালায়। ওই সময় দেশীয় অস্ত্র দিয়ে পিটিয়ে ও কুপিয়ে আহত করে জেলেদের।
জেলেরা জানান, মেঘনা নদীটি বরিশালের অংশের হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার ৮২ কিলোমিটার লম্বা ও কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তীর্ণ। নদীর অপর প্রান্তে নোয়াখালী ও ভোলার কয়েকটি উপজেলা রয়েছে। ডাকাত সদস্যরা হামলা চালানোর আগে এসব এলাকার আশপাশে অবস্থান নেয়। তারা সাধারণত লক্ষ্মীপুর ও ভোলা এবং বরিশালের সীমান্তবর্তী এলাকায় ডাকাতি করে থাকে। সেখান থেকে লক্ষ্মীপুর কিংবা ভোলার দূরত্ব প্রায় ২০-২৫ কিলোমিটার।
মেহেন্দীগঞ্জের উলানিয়া এলাকার জেলে মো. জামাল উদ্দিন জানান, কয়েক বছর আগেও নদীতে প্রতিদিন ১৫-২০টি ডাকাতির ঘটনা ঘটত। ওই সময় জেলেদের পিটিয়ে ও কুপিয়ে আহত করে পালিয়ে যেত তারা। কিন্তু হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জে নৌপুলিশের ফাঁড়ি হওয়ার পর থেকে ডাকাতি কিছুটা কমেছে। গত বছর কোরবানি ঈদের দুই দিন আগে মেঘনা নদীতে ব্যবসায়ীদের গরু ও টাকা লুট করার পর ওই পথে আর কোনো ডাকাতির ঘটনা ঘটেনি।
গোবিন্দপুর এলাকার জেলে স্বপন মাঝি জানান, বর্তমানে ইলিশ ধরা বন্ধ। তাই জেলেরা মেঘনায় মাছ শিকারে যায় না। তবে এ নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে মেঘনায় নামবে তারা। ওই সময় ডাকাত দলের আনাগোনা বেড়ে যাবে। জেলেরা জীবিকার প্রয়োজনে ঝুঁকি নিয়েই মাছ ধরতে যাবে তখন।
নৌপুলিশের হিজলা ফাঁড়ির ইনচার্জ বিকাশ চন্দ্র দে জানান, হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় নৌপুলিশের ফাঁড়ি স্থাপন করায় জেলেদের ওপরে ডাকাত সদস্যদের হামলার ঘটনা কমেছে। তবে সীমান্তবর্তী এলাকায় কিছু ডাকাতির ঘটনা ঘটে। কিন্তু ডাকাতের কবলে পড়ে জেলেরা সর্বস্বান্ত হলেও অভিযোগ জানায় না। এ ছাড়া নদীতে নিরাপত্তা জোরদার করতে নৌপুলিশ ও কোস্টগার্ড নিয়মিত টহল দিয়ে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
বরিশাল মৎস্য অধিদপ্তরে সহকারী পরিচালক মো. নসিল উদ্দিন জানান, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার সমুদ্রগামী নৌযানের জেলেদের মধ্যে নিখোঁজের সংখ্যা ১৭২ জন, জলদস্যুদের হামলা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে আহত জেলেদের সংখ্য ১ হাজার ৬ জন। এ সময়ের মধ্যে নিহত হয়েছে ২৫৯ জন জেলে। ৬০৯টি নৌযান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে বেশিরভাগ জেলে আহত ও নিহত হয়েছে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে।
তিনি আরও জানান, ডাকাতের হাতে আক্রান্ত হয় সমুদ্রগামী ফিশিং বোর্ডগুলো। বিশেষ করে ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালীর জেলেরা বেশি বিপদে পড়েন। বঙ্গোপসাগরে নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড নিয়মিত টহল দিচ্ছে। এ ছাড়া জলদস্যু বা ডাকাত দলের সদস্যদের গ্রেপ্তারে র্যাব সদস্যরাও নিয়মিত কাজ করছেন।