তরিকুল ইসলাম মিঠু, যশোর
প্রকাশ : ২৬ এপ্রিল ২০২৩ ১২:০০ পিএম
কপোতাক্ষ নদ ভরাট করে তার বুকের ওপর সরু খাল খনন হচ্ছে। প্রবা ফটো
কপোতাক্ষ খননে সরকার ৫৩১ কোটি টাকায় যে প্রকল্প চালাচ্ছে সেখানে মূলত নদটাকে বুজিয়ে তার বুকের ওপর একটা সরু খাল খনন করা হচ্ছে বলে এলাকাবাসী অভিযোগ তুলেছে। ২০২০ সালে প্রকল্পটির কাজ শুরু, যা ২০২৪ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা।
সূত্র বলছে, খুলনা বিভাগের চারটি জেলার ভেতর দিয়ে বহমান কপোতাক্ষ খননে এই টাকা বরাদ্দ দেয় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। যশোর জেলার চৌগাছা, ঝিকরগাছা, কেশবপুর ও মনিরামপুর উপজেলায় নদের অংশবিশেষ, ঝিনাইদহের মহেশপুর ও কোটচাঁদপুর উপজেলার অংশবিশেষ, সাতক্ষীরার তালা ও কলারোয়ার অংশবিশেষ, খুলনার কয়রা ও পাইকগাছার অংশবিশেষ খননের জন্য এই প্রকল্প। কিন্তু এর সুফল নিয়ে আশাবাদী হতে পারছেন না এলাকাবাসী।
ঝিকরগাছা ব্রিজের নিচে খনন দেখতে আসা আইয়ুব হোসেন নামে এক ব্যক্তি অনুযোগ করে বলেন, ‘যেভাবে কপোতাক্ষ খনন হচ্ছে এটা সরকারি টাকা তছরুপ করা ছাড়া আর কিছুই না। এ যেন নদী বুজিয়ে খাল খননের উৎসবে মেতেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। নদের চর থেকে কিছু মাটি তুলে দুই পাশে রেখে দিলে কি আর খননকাজ হয়?’ সরকার চার থেকে ছয় ফুট গভীর করছে কপোতাক্ষকে। কিন্তু এলাকাবাসী অন্তত ২৫ ফুট গভীরতা দাবি করেন।
তা ছাড়া খননের আগে নদের দুই পারের দখলদারদের উচ্ছেদ করার দাবি জানান ঝিকরগাছার মুক্তিযোদ্ধা ইলিয়াস কবির।
তিনি বলেন, কপোতাক্ষ সঠিকভাবে খনন করতে হলে দখলদারদের উচ্ছেদ করা আবশ্যক। এরপর প্রকল্পের টাকা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে। অধিকাংশ সময়ে দেখা যায়, পুকুর খননের সক্ষমতা নেই, সেই ঠিকাদার দিয়ে নদ-নদী খনন করা হচ্ছে। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। তা ছাড়া ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের তদারক না থাকায় যেনতেন কাজ করে সরকারের টাকা আত্মসাৎ করছেন একশ্রেণির ঠিকাদার।
এই প্রকল্পে কপোতাক্ষ খনন করছেন ১০ জন ঠিকাদার। তারা ঠিকমতো কাজ করছেন না এবং সরকার ঠিকমতো নজরদারি করছে না বলে এলাকাবাসী অভিযোগ করেছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নদের মাঝখান থেকে এক্সকাভেটর দিয়ে কিছু পরিমাণ থোকা থোকা পলি তুলে নদীর দুই ধারে সাজিয়ে রাখা হচ্ছে। নদী পারের বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, একে নদী খনন বলা যায় না। বৃষ্টি আসার সঙ্গে সঙ্গে এই পলি আবার নদের বক্ষে পড়ে ভরাট হয়ে যাবে। ফলে সরকারের এই বিপুল অঙ্কের অর্থ অপচয় ছাড়া আর কিছুই হবে না।
ঠিকাদারদের একজন সাইদুজ্জামান বাদল। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, তিনি কার্যাদেশ অনুযায়ী কাজ করছেন। তার কাজ ইতোমধ্যে ৯০ শতাংশ শেষ হয়েছে বলে দাবি করেন।
কপোতাক্ষ বাঁচাও আন্দোলনের প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, এ অঞ্চলের নদনদী ভূমিদস্যুদের কবলে পড়ায় অনেক আগেই জোয়ার-ভাটার প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি, নৌ চলাচল, ব্যবসা-বাণিজ্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ। পানির অভাব ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেও দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলসহ ব্যাপক এলাকায় মরুকরণ হচ্ছে। শুরু হয়েছে প্রচণ্ড দাবদাহ।
বর্তমান সরকার নদী খননের গুরুত্ব দিয়ে যে বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করছে তা দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির কারণে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না। কপোতাক্ষ নদসহ দক্ষিণাঞ্চলের ছোটবড় নদী ও খাল রক্ষার জন্য সম্পূর্ণ দখলমুক্ত ও ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে আগের মতো নদীর প্রশস্ততা ও নাব্য ফিরিয়ে আনতে হবে। এজন্য সরকারকে আরও বেশি করে উদ্যোগী হতে হবে। বিপুল পরিমাণে অর্থ ব্যয় করে যেভাবে নদীর সংস্কারকাজ চলছে তাতে সরকারের মূল উদ্দেশ্য কখনও অর্জিত হবে না।
সরকারের যথাযথ তদারকের অভাবের যে অভিযোগ তুলেছেন এলাকাবাসী তা মানতে নারাজ পানি উন্নয়ন বোর্ডের যশোর আঞ্চলিক সহকারী ইঞ্জিনিয়ার সাইদুর রহমান।
তিনি বলেন, সিএস রেকর্ড অনুযায়ী কপোতাক্ষ নদের প্রশস্ততা রয়েছে ১৫০ থেকে ১৭০ ফুট পর্যন্ত। ১২০ থেকে ১৩০ ফুট প্রশস্ত করে নদ খননের কাজ চলছে। ৪ থেকে ৬ ফুট পর্যন্ত গভীরে খনন করা হচ্ছে। এভাবে খনন করলে কপোতাক্ষ পারের জলাবদ্ধতা দূর হবে এবং জোয়ার-ভাটা প্রবাহিত হবে। নদী প্রাণ ফিরে পাবে।