এসকে সোহেল, বাগেরহাট
প্রকাশ : ২৩ এপ্রিল ২০২৩ ১০:৫০ এএম
আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০২৩ ১২:০৪ পিএম
দুই দফায় জমি অধিগ্রহণ, মাটি ভরাট ও সীমানা প্রাচীর নির্মাণের পরও থমকে আছে বাগেরহাটের রামপালের খানজাহান আলী বিমানবন্দরের নির্মাণকাজ। প্রবা ফটো
দীর্ঘ ২৭ বছর ধীরগতিতে কাজ চলার পর দক্ষিণাঞ্চলের রামপালে বহুল কাঙ্ক্ষিত খানজাহান আলী বিমানবন্দর নির্মাণ নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপির) অধীনে বিনিয়োগকারী না পাওয়ায় নির্মাণ প্রকল্প স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে দুই দফায় ৬২৭ একর জমি অধিগ্রহণ, মাটি ভরাট ও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পর এ ধরনের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ বাগেরহাট অঞ্চলের মানুষ। বাগেরহাট শহর, মোংলা বন্দর ও বিভাগীয় শহর খুলনার সঙ্গে প্রায় ২৫ মিনিটের দূরত্বে নির্মিত হওয়ার কথা এই বিমানবন্দর।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, খুলনায় বিমানবন্দর স্থাপনের জন্য ১৯৬১ সালে মূল শহর থেকে ১৭ কিলোমিটার উত্তরে বর্তমান ফুলতলার মশিয়ালী গ্রামে স্থান নির্বাচন করা হয়। ১৯৬৮ সালে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে শহর থেকে ১৩ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে বিল ডাকাতিয়ার তেলিগাতী এলাকায় স্থান নির্ধারণ করে জমিও অধিগ্রহণ করা হয়। পরে সেই জমিও বাতিল করে আশির দশকে বাগেরহাট জেলার ফকিরহাট উপজেলার কাটাখালী এলাকায় স্থান নির্ধারণ করা হয়।
সর্বশেষ ১৯৯৬ সালে বর্তমান জায়গায় ৯৫ একর জমি অধিগ্রহণ করে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে প্রাথমিকভাবে স্টলপোর্ট হিসেবে তৈরি করা হয়। পরে আরও ৫৩৬ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। এ সময় প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৫৪৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ৪৯০ কোটি টাকা এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের ৫৪ কোটি টাকা দেওয়ার কথা। বিমানবন্দর নির্মাণে ভূমি অধিগ্রহণ বাবদ এখন পর্যন্ত ১৭০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
সরেজমিনে বিমানবন্দরে ঢুকতে চোখে পড়ে নামফলকের সাইনবোর্ড। বড় গেটটি অতিক্রম করে ভেতরে প্রবেশ করলে চোখে পড়বে বিস্তীর্ণ এলাকা। দেখে মনে হয় মরু অঞ্চল। স্থানীয়রা গোচারণভূমি হিসেবে ব্যবহার করছেন। আরেকটু ভেতরে গেলে দেখা যায় কিছু ইট, ইটের খোয়া ও একটি বালুর স্তূপ। একপাশে ফেলে রাখা বড় আকৃতির ঢালাই দেওয়া রিং।
বিমানবন্দরের মধ্যে গরু চরাচ্ছিলেন স্থানীয় কালাম মিয়া। বন্দরের মধ্যে গরু চরানোর কারণ জিজ্ঞেস করলে হেসে দিয়ে বলেন, ‘আগে তো বিমান আসুক তারপরে গরু চরানো বন্ধ দিবানি। এত বড় জায়গা, ফাঁকা পড়ে রইছে। সেই জন্যই তো আমরা এখানে আসি।’
বিমানবন্দরটির নির্মাণকাজ শেষ হলে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের ইকো ট্যুরিজম, হজরত খানজাহান আলীর মাজার ও বিশ্ব ঐতিহ্য ষাটগম্বুজ মসজিদকেন্দ্রিক পর্যটন শিল্পের দ্রুত বিকাশ, মোংলা সমুদ্রবন্দর, মোংলা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা, প্রক্রিয়াধীন মোংলা-ঢাকা ও মোংলা-খুলনা রেলপথ, চিংড়ি শিল্পসহ বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে বলে মনে করে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক অবস্থা ঘুরে দাঁড়াবে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ সূত্র জানায়, সম্প্রতি ভারতের একটি প্রতিষ্ঠান পিপিপির অধীনে খানজাহান আলী বিমানবন্দর নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই করে। তবে তাদের কাছে বিমানবন্দর নির্মাণ সম্ভবপর মনে হয়নি। এ কারণে প্রকল্পটি স্থগিত করা হয়েছে।
খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ উজ জামান বলেন, ‘বিমানবন্দর প্রকল্প স্থগিত হয়ে যাওয়া খুলনাবাসীর জন্য হতাশার একটা ব্যাপার। প্রয়োজনে সরকার নিজস্ব অর্থায়নে এটি বাস্তবায়ন করতে পারে। এটি বাস্তবায়ন হলে এই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন যেমন বাস্তবায়ন হবে, তেমনি অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বারও উন্মোচন হবে। এ ছাড়া বিমানবন্দর নির্মাণ না হলে, এরই মধ্যে খরচ হয়ে যাওয়া বিশাল অঙ্কের টাকা অপচয় হবে। অধিগ্রহণকৃত ভূমির অপচয় হবে।
ষাটগম্বুজ-সুন্দরবন ট্যুরিজম অপারেটরের পরিচালক মীর ফজলে সাঈদ ডাবলু জানান, বাগেরহাটে অনেক পর্যটন স্পট থাকলেও সুযোগ-সুবিধা খুবই কম। পদ্মা সেতু হওয়ার ফলে দেশীয় পর্যটক কিছুটা বাড়লেও বিমানবন্দর না থাকায় বিদেশি দর্শনার্থীরা খুব একটা আগ্রহী হচ্ছেন না আসতে।
বাগেরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি লিয়াকত হোসেন লিটন বলেন, ‘কোনো অঞ্চল উন্নয়নের প্রথম ধাপ উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা। বাগেরহাট অর্থনৈতিকভাবে দিনে দিনে সমৃদ্ধ হচ্ছে। আরও উন্নয়নের জন্য এখানে বিমানবন্দর অবশ্যই দরকার। কারণ বাইরের ব্যবসায়ীরা বিমান ছাড়া আসতে চান না। ফলে বিনিয়োগও খুব বেশি বাড়ছে না।’ বিমানবন্দর নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করার দাবি জানান এ ব্যবসায়ী নেতা।
জানতে চাইলে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আজিজুর রহমান বলেন, ‘খানজাহান আলী বিমানবন্দর নির্মাণকাজ ধীরগতিতে চলছে। আমরা এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছি। এ ছাড়া বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা চলছে। তবে বাগেরহাটের পর্যটন, বন্দর, শিল্পকারখানাসহ সার্বিক বিষয়কে আরও এগিয়ে নিতে সরকার সচেষ্ট রয়েছে।’