মাগুরা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২১ এপ্রিল ২০২৩ ১৬:৫৬ পিএম
মাগুরা শহরে দখল ও দূষণে নবগঙ্গা নদীটি এখন যেন সরু খালে পরিণত হয়েছে। ইসলামপুরপাড়া থেকে তোলা। প্রবা ফটো
মাগুরা শহরঘেঁষে বয়ে চলেছে নবগঙ্গা নদী। এই নদীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শহরবাসীর অতীতের নানান স্মৃতি ও গল্প। নদীতে এক সময় বড় বড় নৌকা, লঞ্চসহ ছোট-বড় স্টিমার চলত।
শহরের পুরাতন বাজারসংলগ্ন ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারিত করার লক্ষ্যে গড়ে উঠেছিল বাণিজ্যিক ঘাট। এ ঘাট দিয়ে ব্যবসায়ীরা কুমার-নবগঙ্গার বুক পেরিয়ে নৌপথে খুলনায় আাসা-যাওয়া করতেন। এসব এখ শুধুই ইতিহাস। দখল-দূষণে নদীটি এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে।
২০১৯ সালে খনন করেও শেষরক্ষা হয়নি। খরস্রোতা নদীটি বর্ষা মৌসুম ছাড়া সারা বছরই থাকে পানিশূন্য। এ ছ্ড়াও দুই পাড়ের বাসাবাড়ির স্যুয়ারেজ লাইনের সংযোগ ও বাজারের বর্জ্যে নদীটি এখন দূষণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। চুয়াডাঙ্গা সদরে মাথাভাঙ্গা নদী থেকে উৎপন্ন নবগঙ্গা ঝিনাইদহ সদর উপজেলার মধ্য দিয়ে মাগুরা সদর উপজেলায় প্রবেশ করেছে।
২১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ নবগঙ্গার ৫০ কিলোমিটার অংশ রয়েছে মাগুরায়। মাগুরা শহরে কুমার নদে মিলিত হওয়ার আগ পর্যন্ত নদীটি এখন সরু খালে পরিণত হয়েছে।
মাগুরা বণিক সমিতির আহ্বায়ক হুমায়ন কবির রাজা বলেন, নবগঙ্গা নদী ছিল মাগুরা শহরের প্রাণ। এই নদীকে কেন্দ্র করেই মাগুরা জেলার ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটে। আজকের যে জেটিসি রোড, এখানে জুট ট্রেডিং করপোরেশনের (জেটিসি) অফিসসহ গোডাউন ছিল।
জেটিসি পাট ক্রয় করে বড় বড় নৌকায় বোঝাই করে খুলনা এবং ঢাকায় পাঠাত। এখন নদীর বড় সমস্যা দখল-দূষণ। নদীর প্রবাহ যতটুকু ছিল সেটাও বন্ধ হয়েছে শহরের ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে। এখন আর নদীর পানি দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করা যায় না। এমনকি নদীতে গোসল করার মতো অবস্থাও নেই।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নদীতীরবর্তী শহরের পুরাতন বাজার এবং নতুন বাজারের মাংসপট্টি, পোলট্রি মুরগির দোকান এবং কাঁচা সবজির দোকানের বিপুল পরিমাণ বর্জ্য পলিথিন ব্যাগে ভরে ফেলা হচ্ছে নদীতে।
প্রতিদিন জবাই করা গরু-ছাগল-মুরগির বর্জ্য, পচা মাছ নদীতে পড়ে পানিদূষণের পাশাপাশি দুর্গন্ধের সৃষ্টি হচ্ছে। অন্যদিকে নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা বাড়ি ও দোকানের পেছনের অংশ দখল করায় দিন দিন সরু খালে পরিণত হচ্ছে নদীটি।
এ বর্জ্য ফেলা বন্ধে পৌরসভার তেমন কোনো কার্যক্রমই চোখে পড়ে না। তা ছাড়া প্রতিদিন কী পরিমাণ বর্জ্য উৎপন্ন হয় বা নদীতে ফেলা হয়, তাও জানাতে পারেনি পৌর কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরির্দশক পারভিন সুলতানা কথা বলতে রাজি হননি।
তবে তিনি বলেন, ‘নদীদূষণের মূল কারণ পলিথিন। পলিথিন বন্ধ না হলে দূষণ ঠেকানো যাবে না।’
সারা বছর নদীকে জলাধার হিসেবে ব্যবহারের লক্ষ্যে ২০১৯ সালে প্রায় ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নবগঙ্গা নদী পুনঃখননের একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ওই প্রকল্পের আওতায় শহরের পূর্বাশা ঘাট থেকে আলোকদিয়া সেতু পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার পুনঃখনন করা হয়।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, খননে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। ফলে নদীতে জল আনার টাকা অনেকটা জলে গেছে।
নদীর পাড়ের বাসিন্দা বারাসিয়া গ্রামের মো. বাবলু বলেন, নদীর গড় প্রস্থ যেখানে ৩০০ মিটার, সেখানে খনন হয়েছে মাত্র ৮০ মিটার। তারপর খনন করে যেখানের মাটি অনেকটা সেখানেই ফেলা হয়ছে। মাটি ফেলা হয়েছে নদীর মাঝেই।
ফলে নদীর মাঝে মাটির ঢিবি তৈরি হয়েছিল, যা বর্ষা মৌসুমে আবার ধুয়ে নদীতেই গেছে। এ কারণে নদী এখন খালে পরিণত হয়েছে। আসলে প্রকল্পের প্রকৃত সুফল পাওয়া যায়নি বলে তিনি দাবি করেন।
যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) প্রকৌশলী রেজাউল ইসলাম বলেন, মাগুরা অংশে শুষ্ক মৌসুমে (ফেব্রুয়ারি-এপ্রিল) নবগঙ্গা নদীর গড় প্রবাহ থাকে ১৭ ঘনমিটার আর গভীরতা ৩ ঘনমিটার।
অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে (আগস্ট) নদীর গড় প্রবাহ ১৭০ ঘনমিটার পর্যন্ত। এ সময় নদীর গভীরতা থাকে ১০ ঘনমিটার। তবে নদীতে আগে পানির যে প্রবাহ ছিল, খননের পর সে প্রবাহ কিছুটা কমেছে।
সারা বছর মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা পারনান্দুয়ালী গ্রামের আজমল বিশ্বাস বলেন, ‘এখন যে মাছ পাওয়া যায় তা বাজারে বিক্রি করে পরিবার চালানো কষ্টের। শুকিয়ে গেলেও নদীতে যে পানি ছিল তাতে মাছ পাওয়া যেত। এই নদী না বুঝে খনন করে আবাসস্থল ধ্বংস করায় মাছের পরিমাণ কমে গেছে। দেশীয় প্রজাতির অনেক মাছ এখন আর পাওয়া যায় না। ফলে অধিকাংশ জেলে পরিবার বেঁচে থাকার তাগিদে অন্য পেশায় যেতে বাধ্য হয়েছে। আমি বর্ষা মৌসুমে তিন থেকে চার মাস মাছ ধরি। বাকি আট মাস কাঠমিস্ত্রির কাজ করি।’
মাগুরা ‘নদী বাচাঁও’ আন্দোলনের নেতা এটিএম মহব্বত বলেন, নদী মানেই পানি আর এই পানিই মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন। নদী ধ্বংস হওয়ার কারণ সেতু নির্মাণে নদী শাসন। আন্তর্জাতিক নদী শাসন আইন না মেনে খামখেয়ালিভাবে নতুন নতুন সেতু নির্মাণে নদীগুলো নাব্যতা হারাচ্ছে। আর শহরকেন্দ্রিক নদীগুলো পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে দূষণ হচ্ছে।
জানতে চাইলে পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী এম মোহাম্মাদ সুজন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘নবগঙ্গা নদীটি দখল ও দূষণমুক্ত করতে প্রতি বছর মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। এ অভিযানের মাধ্যমে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতে এ পর্যন্ত ১০টি মামলা দেওয়া হয়েছে। নাব্যতা ফিরে পেতে ইতঃর্পূবে খনন করা হয়। তবে আশানুরূপ ফল না পাওয়ায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পুনরায় একটি প্রকল্প জমা দেওয়া হয়েছে। সেটি পাস হলে খনন করে নদীটির নাব্যতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।’