বেড়া (পাবনা) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২৩ ১৪:৪৩ পিএম
আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০২৩ ১৫:২৪ পিএম
বেড়া বাজারে মাঠা বিক্রি করছেন এক ব্যবসায়ী। প্রবা ফটো
বৈশাখের তীব্র দাবদাহে জনজীবন অতিষ্ঠ। ক্রমাগত তাপপ্রবাহে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন খেটে খাওয়া ও শ্রমজীবী মানুষজন। হাঁসফাঁস গরমে প্রাণ জুড়াতে মানুষজন পান করছেন নানা ধরনের পানীয়। আর পাবনার মানুষজন পানীয় হিসেবে অধিক পছন্দ করেন বেড়ার ঐতিহ্যবাহী মাঠা। সুস্বাদু পানীয় হিসেবে রোজাদারদের কাছে এর জুড়ি নেই। তাই স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের পছন্দের শীর্ষে আছে ভেজালমুক্ত মাঠা।
মাঠা হলো একধরনের ঘোল, যা গরুর দুধ থেকে তৈরি হয়। তবে স্বাদে ও বর্ণে কিছুটা আলাদা। বাণিজ্যিকভাবে মাঠা তৈরিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদনকারী ব্রান্ডগুলো। তবে স্থানীয় পর্যায়ে দেশের যেসব অঞ্চলে মাঠা তৈরি হয়, তার মধ্যে অন্যতম হলো পাবনার বেড়া ও সাঁথিয়া উপজেলা। এখানে প্রচুর গরুর দুধ উৎপাদিত হয় এবং মানের দিক দিয়ে এ এলাকার দুধের আলাদা সুনাম আছে সারা দেশেই।
স্থানীয়রা জানান, ভালো দুধের কারণেই এখানে ভালো মাঠা তৈরি হয়। তবে এ ক্ষেত্রে মাঠা তৈরির কারিগরদেরও আছে বিশেষ ভূমিকা। একসময় হাতে গোনা কয়েকজন ঘোষ মাঠা তৈরি করলেও এখন দুই উপজেলায় ৪০ থেকে ৬০ জন ঘোষ মাঠা তৈরির সঙ্গে জড়িত। সারা বছরই তারা মাঠা তৈরি করেন। তবে রমজান এলে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় মাঠা ব্যবসায়ীর সংখ্যাও বেড়ে যায়। বেড়া ও সাঁথিয়ায় তৈরি মাঠা এখন উপজেলার গণ্ডি পেরিয়ে পার্শ্ববর্তী অন্যান্য জেলা-উপজেলা এবং রাজধানী ঢাকায়ও বিক্রি হচ্ছে।
মাঠা তৈরির সঙ্গে জড়িত ঘোষরা জানান, গরুর দুধ জ্বাল দিয়ে মাঠা তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয় আগের দিন থেকেই। এরপর অনেকটা দইয়ের মতো করে সেই দুধ জমিয়ে রাত ৩টা থেকে ৪টার মধ্যে শুরু হয় মাঠা তৈরির কাজ। জমাট বাঁধা সেই দইকে একটি বড় পাত্রে রেখে ব্লেন্ড করা হয়। স্থানীয়ভাবে এটিকে টানা বলা হয়। এ কাজ বেশ পরিশ্রমের। সকাল ৭টার মধ্যেই বেশির ভাগ ঘোষের বাড়িতে তৈরি হয়ে যায় সুস্বাদু মাঠা।
অনেকেই আগেভাগে ফ্রিজে রাখবেন বলে বা দূরের কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে পাঠাবেন বলে সকালেই ঘোষদের বাড়ি থেকে মাঠা কিনে থাকেন। তবে মাঠার মূল বিক্রি শুরু হয় দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে বেলা ১টার মধ্যে। এ সময়ে মাঠা ব্যবসায়ীরা ভ্যানে মাঠা নিয়ে সিএন্ডবি চতুর বাজার, সাঁথিয়া বাজার, মাধপুর, আতাইকুলা, বেড়া বাজার, বেড়া বাসস্ট্যান্ড, হাটুরিয়া বাজার, নাকালিয়া বাজার, রাকশা বাজারসহ উপজেলার বিভিন্ন বাজারে ফেরি করে বিক্রি শুরু করেন।
অনেকে আবার বাজারের বিভিন্ন স্থানে মাঠার পাত্র এনে অস্থায়ী দোকান বসিয়ে বিক্রি শুরু করেন। বেলা ২টা থেকে ৩টা বাজতে না বাজতেই বেশির ভাগ ব্যবসায়ীর মাঠা শেষ হয়ে যায়। তাই বিকালের অপেক্ষায় না থেকে লোকজন এ সময়ের মধ্যেই ভিড় করে মাঠা কেনেন। কোনো কোনো মাঠার দোকানের সামনে লাইন ধরে দাঁড়িয়েও মাঠা কিনতে দেখা যায়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এক লিটার মাঠা ৫০ টাকা থেকে শুরু করে ১৪০ টাকা দরে বিক্রি হয়। মাঠা যত বেশি ঘন, এর দামও তত বেশি। এ ছাড়া বিশেষ কয়েক ঘোষের মাঠার আলাদা সুনাম রয়েছে। তাদের মাঠা বেশি দাম দিয়ে কিনতে লোকজন ভিড় করেন।
তার মধ্যে রয়েছে বেড়া পৌর এলাকার বনগ্রাম এলাকার বিশু ঘোষ ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে মাঠা তৈরি করে বাজারে বিক্রি করেন। তার তৈরি মাঠার আলাদা সুনাম আছে। প্রতিদিন ৮০০ থেকে ১ হাজার লিটার মাঠা তৈরি করে বেড়া বাজারে রাস্তার পাশে বসে বিক্রি করেন তিনি। মানভেদে তিনি ৬০ থেকে ১০০ টাকা লিটার দরে মাঠা বিক্রি করেন।
সোনাতলা গ্রামের চতুর বাজারে মাঠা ব্যবসায়ী মহাদেব ঘোষ বলেন, 'প্রতিদিন শুধু মাত্র সিএন্ডবি বাজারেই ৫০ মণেরও বেশি মাঠা বিক্রি হচ্ছে, দুই উপজেলায় তাহলে কত মণ মাঠা বিক্রি হয় বোঝেন। আমি প্রতিদিন ৩ থেকে ৪ মণ মাঠা বিক্রি করি, তা থেকে আমার ৮০০ থেকে হাজার টাকা থাকে। কিন্তু যদি একবার বৃষ্টি আসে তাহলে ২০ টাকা লিটারেও বিক্রি হবে না। এবার রোজায় যেমন গরম পড়েছে , বেচাকেনা অনেক ভালো হচ্ছে।'
সিএন্ডবি বাজারে মাঠা বিক্রি করছিলেন অখিল ঘোষ। তিনি বলেন, রমজান মাসে মাঠার চাহিদা এমনিতেই বেশি। এর ওপর প্রচুর গরম পড়ায় চাহিদা আরও বেড়ে গেছে। আমি প্রতিদিন প্রায় ২০০ লিটার মাঠা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বিক্রি করি। মাঠার চাহিদা এত বেড়েছে যে, এর চেয়ে আরও ৫০০ লিটার বেশি বানালেও তা বিকেলের আগেই শেষ হয়ে যাবে।
পাটগাড়ি গ্রামের আব্দুল রউফ শেখ বলেন, 'প্রতি লিটার দুধের দাম ৬০ টাকা। অথচ ভালো মানের মাঠা বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকা লিটার দরে। কিন্তু আমরা এ দামে মাঠা কিনেও খুশি। ইফতারে শীতল মাঠা দিয়ে বানানো শরবতের স্পর্শ ছাড়া মন ভরে না।'