কক্সবাজার অফিস
প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৩ ১৬:৪৩ পিএম
আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২৩ ১৭:০৬ পিএম
রোহিঙ্গা ক্যাম্প। ফাইল ফটো
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিশ্ব খাদ্য সংস্থা (ডব্লিউএফপি) পরিচালিত খাদ্য সরবরাহ কর্মসূচিতে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে নিয়মানুযায়ী স্থানীয় জনগোষ্ঠী থেকে রিটেইলার (খুচরা বিক্রেতা) নিয়োগে সরকারি নির্দেশনা থাকলেও তা অনুসরণ করা হচ্ছে না। বেশিরভাগ রিটেইলারের ক্ষেত্রে জেলার বাইরের ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠানকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে খোলা বাজার থেকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে চাল, ডাল, সাবান, তেল, চিনিসহ বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী কিনে রোহিঙ্গাদের সরবরাহ (রিসাইকেল) করা হচ্ছে। এতে খাদ্যের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। খাদ্য কর্মসূচিতে রিসাইকেলের এই অনিয়মে বারবারই আইল্যান্ড ট্রেডিং ও এইচএমএস কর্পোরেশনসহ কয়েকটি রিটেইলারের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, রিটেইলারদের এ ধরনের অনিয়মে সংস্থাটির রিটেইল সাপ্লাই চেইন ইউনিটের অ্যাসোসিয়েট মো. আসাদুজ্জামান পলাশ ও কামরুল হাসান নাদিমের সম্পৃক্ততা রয়েছে। এই দুই কর্মকর্তা রিটেইলারদের সংস্থাটির গোপন সিদ্ধান্ত এবং বিভিন্ন সময়ে আউটলেট (বিক্রয় কেন্দ্র) পরিদর্শনের খবর আগাম জানিয়ে দেন। বিষয়টি নিয়ে ডব্লিউএফপি কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান পলাশ ও কামরুল হাসান নাদিমের অনিয়ম-দুর্নীতিতে ভুক্তভোগী রিটেইলাররাও চুক্তি বাতিলের ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে চান না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন রিটেইলার জানিয়েছেন, মো. আসাদুজ্জামান পলাশ ডব্লিউএফপিতে যোগ দেওয়ার আগে মহেশখালীতে আইল্যান্ড ট্রেডিংয়ের মালিক শাহাদাত হোসেনের একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। ওই সুবাদে আইল্যান্ড ট্রেডিংসহ কয়েকজন রিটেইলার মালিকের সঙ্গে পলাশের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। এ সুযোগে আইল্যান্ডসহ কিছু রিটেইলারকে রিসাইকেল করা ও নিম্নমানের পণ্য বিক্রির সুযোগ করে দেন পলাশ ও নাদিম।
উখিয়ার বালুখালী ৭নং আশ্রয় শিবিরের একটি আউটলেটের কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, কক্সবাজার শহরের তারকামানের হোটেলে বসে পলাশ ও নাদিম রিটেইলারের সঙ্গে বৈঠক ও অর্থ লেনদেন করেন। তাদের বৈঠকের চিত্র হোটেলগুলোর সাম্প্রতিক সিসি ক্যামেরার ফুটেজ যাচাই করলেই কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত হতে পারবে।
বালুখালী ৭ নং ক্যাম্প ইনচার্জ (সিআইসি) রবীন্দ্র ত্রিপুরা বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আউটলেট থেকে বিতরণ করা পণ্য রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে পুনরায় রোহিঙ্গাদের বিতরণের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ তদন্তে গেলে বারবারই আইল্যান্ড ট্রেডিংয়ের নাম চলে আসে। রিসাইকেল পণ্য বেচাকেনার খবর পেয়ে কয়েকদিন আগে আইল্যান্ড ট্রেডিংয়ের লোকজনকে সতর্ক করা হয়েছে। এ সময় ডব্লিউএফপির কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।’
সম্প্রতি রিসাইকেল পণ্য বিতরণের সময় অভিযান চালিয়ে জব্দ করা হয়েছিল বলে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এতে কিছুদিন এ তৎপরতা কমে এসেছিল। এখন আবার শুরু হয়েছে।’
অভিযোগ রয়েছে, যেসব রিটেইলারের কাছ থেকে পলাশ ও নাদিম সুযোগ-সুবিধা আদায় করতে পারে না তাদের হয়রানি করা হয়। তখন কোয়ালিটি কন্ট্রোলের অজুহাতে আউটলেটের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পণ্য সরবরাহকারীর সঙ্গে কারণে-অকারণ দুর্ব্যবহার করেন তারা। পলাশের দুর্ব্যব্যবহারের শিকার হয়ে একটি আউটলেটের কর্মকর্তা ডব্লিউএফপি কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেছেন।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী কর্মকর্তা মো. শাহাজাহানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘এক সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন সমস্যা হয়।’ তবে কোম্পানির স্বার্থে এসব বিষয় নিয়ে তিনি বাইরে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান।
অনিয়মের বিষয়ে জানতে আইল্যান্ড ট্রেডিংয়ের মালিক শাহাদাত হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্পে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা মানবিক সহায়তা দিয়ে আসছে। এককভাবে ডব্লিউএফপি রোহিঙ্গাদের চাল, ডাল, শুটকি, তেল, কাঁচা মাছ, মাংসসহ বিভিন্ন ধরনের খাদ্য সহায়তা দিয়ে আসছে। সংস্থাটিতে বর্তমানে ১২টি চুক্তিবদ্ধ রিটেইল প্রতিষ্ঠান খাদ্য সরবরাহের কাজে নিয়োজিত রয়েছে। চুক্তিবদ্ধ রিটেইলারদের মধ্যে ছয় তারা ও আইল্যান্ড ট্রেডিং ছাড়া বাকি রিটেইলার জেলার বাইরের। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো সমতা ট্রের্ডাস, এইচ.এম.এস. কর্পোরেশন, সরোবর, পদ্মা স্টোর, চালডাল, কিবরিয়া ট্রেডার্স, শামসুল আলম, ডিরেক্ট ফ্রেশ, হাসান এন্টারপ্রাইজ ও হক এন্টারপ্রাইজ।
অভিযোগ রয়েছে, এ সকল প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগ অস্তিত্বহীন। শুধুমাত্র একটি ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে চুক্তি করা হয়।
কক্সবাজার পিপলস সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ ইকবাল বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের কারণে স্থানীয় জনগোষ্ঠী নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এতে রোহিঙ্গা শিবিরে মানবিক সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর বিভিন্ন কর্মসূচিতে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও ব্যবসায়ীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার সরকারি নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু দেশি-বিদেশি সংস্থাগুলো এসব নির্দেশনা মানছে না।’
উখিয়ার হলদিয়া পালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইমরুল কায়েস চৌধুরী বলেন, ‘রোহিঙ্গা শিবিরে ডব্লিউএফপিসহ দেশি-বিদেশি সংস্থায় স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্তদের চাকরিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু সংস্থাগুলোর কর্মকর্তাদের আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনেরা অগ্রাধিকার পাচ্ছেন। সংস্থার কর্মকর্তারা মনে করেন, স্থানীয়দের নিয়োগ করা হলে অনিয়ম চাপা থাকবে না। এ ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদেরও চাকরি দেওয়া হচ্ছে।’
অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে মো. আসাদুজ্জামান পলাশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি। এ ব্যাপারে ডব্লিউএফপির কমিউনিকেশন ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি। এ ছাড়া কামরুল হাসান নাদিমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। তার মুঠোফোনে খুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে বিশ্ব খাদ্য সংস্থার (ডব্লিউএফপি) মিডিয়া কমিউনিকেশন বিভাগে ইমেইল যোগাযোগ করা হলেও অভিযোগের জবাব পাওয়া যায়নি। তবে ফিরতি মেইলে বলা হয়েছে, ‘আমাদের মেইলটি সংশ্লিষ্ট বিভাগে ফরোয়ার্ড করা হয়েছে। ওখান থেকে আপডেট পেলেই তা জানানো হবে।’
খাদ্য কর্মসূচির পণ্য রোহিঙ্গাদের খোলা বাজার থেকে কিনে আবার রোহিঙ্গাদের সরবরাহ করা একটা বড় অনিয়ম বলে মনে করেন কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, ‘পুলিশ অভিযান চালিয়ে এ ধরনের বেশ কিছু পণ্য উদ্ধার করেছে। এই অনিয়মের সঙ্গে ডব্লিউএফপির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজস থাকতে পারে। আমার বিশ্বাস ডব্লিউএফপি অসাধু কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে।’
জেলার বাইরে থেকে অধিকাংশ রিটেইলার নিয়োগের বিষয়ে আরআরআরসি বলেন, ‘আমি যোগদানের পর ডব্লিউএফপির কাছে রিটেইলারদের বিষয়ে জানতে চেয়েছিলাম। তাদের তথ্য অনুযায়ী, রিটেইলারদের মধ্যে একজন কুতুপালংয়ের (উখিয়া), দুই কি তিনজন কক্সবাজারের এবং বাকিগুলো ঢাকা ও চট্টগ্রামের। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’