নুপা আলম, কক্সবাজার
প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১৭:৩৬ পিএম
আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১৮:০৮ পিএম
জিওটিউব ব্যাগ ফেলেও রক্ষা করা যাচ্ছে না কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের ভাঙন। সোমবার লাবনী পয়েন্টে
গভীর নিম্নচাপের কারণে সৃষ্ট জোয়ারের সময় সাগরের বিশাল ঢেউ আঘাত হানছে উপকূলে। জিওটিউব ব্যাগও রক্ষা করতে পারছে না কক্সবাজার সৈকতের বালিয়াড়ির ভাঙন।
সোমবার দুপুরে সরেজমিন কক্সবাজার সৈকতের লাবণী পয়েন্টে গিয়ে দেখা যায়, জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে তিন-চার ফুট উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে। আর সাগরের বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়ছে উপকূলে। সৈকতের ভাঙন ঠেকাতে দেওয়া জিওটিউব ব্যাগও রক্ষা করতে পারছে না বালিয়াড়ির ভাঙন। তীব্র ঢেউয়ে জিওটিউব ব্যাগও ফেটে যাচ্ছে, তছনছ হয়ে গেছে সমুদ্রপাড়ের রাস্তাঘাট।
পর্যটকদের চলাফেরার জন্য সৈকতের কিটকট (ছাতা-চেয়ার) ব্যবসায়ীদের বালুভর্তি বস্তা বসানোর কাজ করতে দেখা গেছে। আর পর্যটকদের নিরাপত্তায় হাঁটুপানির নিচে না নামতে মাইকিং করছেন বিচকর্মী, লাইফ গার্ড ও ট্যুরিস্ট পুলিশের সদস্যরা।
সৈকতের লাবণী পয়েন্টে বেড়াতে আসা পর্যটক হুয়ামুন কবির বলেন, ‘দুদিন ধরে কক্সবাজার বেড়াতে এসেছি। কিন্তু সৈকতে নামতে পারছি না। বিশাল ঢেউ আঘাত হানছে উপকূলে। ইচ্ছে থাকলেও ভয়ে পরিবার নিয়ে সাগরে গোসলে নামছি না।’
আরেক পর্যটক ইব্রাহীম খালেদ বলেন, ‘সাগরে এত বড় ঢেউ আগে কখনও দেখিনি। জিওটিউব ব্যাগে দাঁড়িয়ে উত্তাল সাগর উপভোগ করতে গিয়ে ঢেউয়ের আঘাতে পুরো শরীর ভিজে গেছে। তাই এখন সৈকত থেকে চলে যাচ্ছি হোটেলে। সাগর শান্ত হলে আবার আসব।’
জেলা প্রশাসনের বিচকর্মীদের সুপারভাইজার মোহাম্মদ বেলাল বলেন, সাগর উত্তাল। ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত বহাল রয়েছে। তাই পর্যটকদের সমুদ্রস্নানে নিরাপত্তার জন্য বালিয়াড়িতে টহল দিয়ে দিয়ে মাইকিং করছি। সাগরের উচ্চ জোয়ারের কারণে বালিয়াড়ির ভাঙন তীব্র হয়েছে। ভাঙনের ফলে পর্যটকদের চলাফেরা করতেও সমস্যা হচ্ছে।
এদিকে সোমবার আবহাওয়া অফিসের বুলেটিনে বলা হয়েছে, ভারতের দক্ষিণ মধ্য প্রদেশ এবং এর পার্শ্বর্বর্তী এলাকায় অবস্থানরত স্থলনিম্নচাপটি আরও পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে দুপুর ১২টার দিকে লঘুচাপে পরিণত হয়েছে। এটি স্থলভাগের ওপর দিয়ে আরও পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে ক্রমান্বয়ে দুর্বল হতে পারে। এর প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় গভীর সঞ্চরণশীল মেঘমালার সৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে। এতে করে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। পূর্ণিমা ও বায়ুচাপ পার্থক্যের আধিক্যের প্রভাবে উপকূলীয় জেলাগুলোর নিম্নাঞ্চলে স্বাভাবিকের জোয়ারের চেয়ে এক থেকে দুই ফুট অধিক উচ্চতার বায়ুতাড়িত জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে।
ট্রলার মালিকদের ক্ষতি ৬০০ কোটি টাকা
নিম্নচাপের কারণে সাগর উত্তাল থাকায় মাছ শিকারে যেতে পারছেন না জেলেরা। তিন দিন ধরে কক্সবাজারের বাঁকখালী নদীতে নোঙর করে আছে সাড়ে ৫ হাজারের বেশি মাছ ধরার ট্রলার। এতে ট্রলার মালিকদের সাড়ে ৬০০ কোটি টাকার লোকসান হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেলা মৎস্যসম্পদ কার্যালয়ের তথ্যমতে--কক্সবাজারে নিবন্ধিত যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক নৌযান রয়েছে প্রায় ৬ হাজার ৮০০। আর নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৬৫ হাজারের মতো। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে সাড়ে ৫ হাজার ট্রলার বাঁকখালী ঘাটে ফিরে এসে নোঙর করেছে।
এফবি মায়ের দোয়া ট্রলারের মাঝি ইয়াকুব বলেন, ‘আগস্ট মাসে ৩টি দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে সাগরে মাছ শিকার করতে পারিনি। চলতি মাসের শুরুতে কয়েক দিন সাগরে মাছ শিকারের পর আবারও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় উপকূলে ফিরতে হয়েছে। এখন টাকা-পয়সা নেই, ট্রলার মালিকও টাকা দিচ্ছেন না। খুবই বিপদে রয়েছি।’
ট্রলার মালিক নাছির উদ্দিন বলেন, ‘লোকসান দিতে দিতে আর পারছি না। সর্বশেষ ৪ লাখ টাকা খরচ করে সাগরে ট্রলার পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া কারণে গত তিন দিন উপকূলে অবস্থান করতে হচ্ছে। সাগর থেকে ফিরে আসার সময় মাত্র ১ লাখ টাকার মাছ নিয়ে আসছিল জেলেরা। এখন লোকসান হয়েছে ৩ লাখ টাকা। গত মাসেও লোকসান হয় ১০ লাখ টাকা। এভাবে আর চলা যাচ্ছে না।’
কক্সবাজার অবতরণ কেন্দ্র মৎস্য ব্যবসায়ী ঐক্য সমবায় সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে কক্সবাজারের বিভিন্ন উপকূলে নোঙর করেছে সাড়ে ৫ হাজারের বেশি মাছ ধরার ট্রলার। পাশাপাশি চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলার আরও এক হাজার ট্রলারের অবস্থান এখন কক্সবাজারে। সবার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে ৬০০ কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে ট্রলার মালিকদের। একই সঙ্গে দুর্দশায় পড়েছেন ট্রলারের লক্ষাধিক জেলে।’