শেরপুর প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১১ এপ্রিল ২০২৩ ১২:০৯ পিএম
আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০২৩ ১২:৪৭ পিএম
বাঁধের ভাঙন অংশে নদীতে ১৬০টি গাছের গুঁড়ি পুঁতে পাইলিং করার পরেই বন্ধ হয়ে গেছে কাজ। নালিতাবাড়ী পৌর শহরের উত্তর গড়কান্দা। প্রবা ফটো
শেরপুরের নালিতাবাড়ীর ভোগাই নদে শহররক্ষা বাঁধের সংস্কার কাজ ১০ মাস ধরে বন্ধ। বাঁধের কাজ ফেলে রেখে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান লাপাত্তা। এতে আসন্ন বর্ষায় পাহাড়ি ঢলে নদীর ভাঙন নিয়ে আতঙ্কে রয়েছেন স্থানীয়রা।
এরই মধ্যে নদীগর্ভে চলে গেছে পৌর শহরের উত্তর গড়কান্দার বেশ কয়েকটি বসতবাড়ি। বাঁধ রক্ষার কাজ বন্ধ থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জনপ্রতিনিধিসহ এলাকাবাসী। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) পক্ষ থেকে একাধিকবার চিঠি দেওয়ার পরও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি অসমাপ্ত কাজ শুরু করেনি।
সম্প্রতি নালিতাবাড়ী পৌর শহরের উত্তর গড়কান্দায় গিয়ে দেখা যায়, বাঁধের ভাঙন অংশে নদীতে ১৬০টি গাছের গুঁড়ি পুঁতে পাইলিং করা হয়েছে। ৪ হাজার ৩৫০টি জিও ব্যাগ ফেলার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। কিন্তু বাঁধের ভাঙন অংশের পাড়ের পাশে, বাজারের পেছনে খোলা মাঠে জিও ব্যাগ ফেলে রাখায় ব্যাগগুলো বৃষ্টিতে নষ্ট হচ্ছে। এতে ছিঁড়ে গেছে বেশিরভাগ ব্যাগ।
এলাকাবাসী জানায়, ২০২১ সালে ভোগাই নদের ঢলে শহরের উত্তর গড়কান্দা এলাকায় ১০০ মিটার বাঁধ ভেঙে যায়। এই ভাঙন অংশ দিয়ে চারটি মহল্লার প্রায় ৭৫০ পরিবারের বাড়িঘরে ঢলের পানি ঢুকে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। এতে বাগানবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ভুক্তভোগী অনেক পরিবার স্কুলের বারান্দায় ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় আশ্রয় নেয়।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্যমতে, ২০২২ সালে ভোগাই নদে শহররক্ষা বাঁধ সংস্কারে পাউবোর পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর জন্য ১১০ মিটার বাঁধ নির্মাণে ৩৮ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়। এ কাজের দায়িত্ব পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রিফাত এন্টারপ্রাইজ।
ভুক্তভোগীরা জানান, বাঁধ সংস্কারে গত বছরের ৪ মে কাজ শুরু করার কথা ছিল। কিন্তু সময়মতো কাজ শুরু না করায় গত বছরের ১৭ জুন ফের পাহাড়ি ঢলে ভাঙন অংশ দিয়ে পানি প্রবেশ করে। এতে উত্তর গড়কান্দা, গড়কান্দা, গুনাপাড়া ও শিমুলতলা মহল্লায় ব্যাপক জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। প্রায় ৭৫০ পরিবারের বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ে। উত্তর গড়কান্দা এলাকার ৫০০ মিটার সড়ক পানিতে ডুবে যায়। পরে গত বছরের ২৩ জুন সংস্কারের কাজে পাইলিং এবং জিও ব্যাগ প্রস্তুত করা হয়। তারপর ঠিকাদারের লোকজন চলে যায়। এ নিয়ে এলাকাবাসী, স্থানীয় পৌর কাউন্সিলর ও মেয়র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
গত বছর কাজ বন্ধ থাকায় ঢলের পানিতে নদীগর্ভে চলে গেছে চাতাল শ্রমিক খোদেজা বেগমের বসতঘরসহ ভিটেমাটি। শেষ সম্বল হারানো ৫২ বছর বয়সি এ নারী বলেন, ‘চাতালে কাম কইরা দিনে ২০০ ট্যাহা (টাকা) পাই। স্বামীডারও অসুখ, কামে যাইবার পায় নাহ। কত কষ্ট কইরা দিন চালাইতাছি। বাড়ি ভিডাটাও এর আগেরবার নদীত ভাইঙ্গা নিয়া গেছে গা। বহুত কষ্ট কইরা থাকবার এডা (একটা) চাল (ছোট্ট ঘর) তুলছি। বান্ধন (বাঁধ) না দিলে তো এইবারও ভাইঙ্গা চাল নিয়া যাবো গা। এইবার চাল ভাইঙ্গা নিয়া গেলে আর কই থাকমু। বেডারা (ঠিকাদার) গাছের গুঁড়ি আর ব্যাগগুলা কতদিন থাইক্কা (থেকে) ফেলাই রাইখা পলাই গেছে গা। এহন কাম তো করেই না আরও ব্যাগ গুইল্লা (গুলো) নষ্ট অইতাছে।’
খোদেজার মতো বাড়িঘর হারিয়েছেন ইউসুফ আলীও। তিনি বলেন, ‘মেলাদিন থাইক্কা ঠিকাদার আধান (অর্ধেক) কাম কইরা আর কোনো খোঁজখবর নেই না বেডারা (ঠিকাদার)। তহন যদি জিও ব্যাগ ফালাইয়া বান্ধন দিত, তাইলে আমগর বাড়িঘর নদীত ভাঙতো না। অহন মাইনষের বাড়িতে বাড়িতে রাইত কাটাইতে অইতাছে। এইবার পাহাড়ি ঢল আইলে কই থাকমু কই যামু। বাঁধ ঠিক না হওয়ায় আমরা বহুত চিন্তায় আছি।’
বাগানবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রিফাত মিয়া জানায়, ‘আমাদের বাড়ি হতে স্কুলে আসতে রাস্তাটার এ মাথা (কিছু অংশ) ভাইঙা গেছেগা নদীতে। বর্ষাকালে নদীর পানি বাড়লে ভাঙনও বাড়ে। তখন আমরা স্কুলে আসতে পারি না।’
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রিফাত এন্টারপ্রাইজের মালিক মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘ইতোমধ্যে বাঁধ সংস্কারের ৮০ শতাংশ কাজ শেষ করা হয়েছে। স্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে জিও ব্যাগে ভরা বালুর দরদাম নিয়ে কিছুটা ঝামেলা হয়েছে। আর এই ঝামেলার কারণে কাজটি শেষ করতে দেরি হয়েছে। আশা করছি আগামী সাত দিনের মধ্যে কাজ শুরু করতে পারব।’
পৌরসভার মেয়র আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, ‘শহররক্ষা বাঁধের কাজটা তাড়াতাড়ি করার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমি একাধিকবার যোগাযোগ করেছি। সামনে বর্ষা, তাই দ্রুত কাজ শেষ না করা হলে ওই এলাকার মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়বে।’
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. শাহজাহান বলেন, ‘ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির কারণে কাজটি বন্ধ রয়েছে। তাকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে কাজ শেষ করার জন্য। গত বছরের জুন মাসে বাঁধ সংস্কার কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল।